Headlines

৮৫ সাব-রেজিস্ট্রার বদলি: ঢাকায় ফিরলেন কারা, রাজধানী ছাড়লেন কারা; অনিয়মের অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন

বদলী

বিশেষ প্রতিবেদন | ফলোআপ নিউজ

ঢাকায় ১৮টি কার্যালয়ে পদায়ন, বাকি ৬৭ জনের বদলিতে লটারি হয়নি বলে প্রতিবেদন | নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন, দলিলপ্রতি অর্থ আদায় ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্তের দাবি।

দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করেছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ। ২৬ অক্টোবর জারি করা এ আদেশে প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনস্বার্থের কথা বলা হলেও বদলির তালিকা, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নতুন পদায়ন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ঢাকার ১৮টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়নের জন্য ৬ অক্টোবর লটারি অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর নতুন আদেশ জারি হয়েছে। সময়ের আলো-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ১৮টি পদে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে বাকি ৬৭ জনকে লটারি ছাড়াই বদলি করা হয়েছে। ফলে বদলির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, অভিন্ন নীতিমালা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে পদায়ন পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে কিনা— এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৬ থেকে জারি করা আদেশে স্বাক্ষর করেছেন উপসচিব (রেজিস্ট্রেশন) মো. মাসুদ আলী। আদেশ অনুযায়ী, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। প্রজ্ঞাপনে জনস্বার্থে আদেশটি জারি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকায় পদায়ন: জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে রাজধানীতে ফিরলেন যারা

ঢাকার ১৮টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নতুন পদায়নের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে রাজধানীতে আসছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—

কর্মকর্তা আগের কর্মস্থল ঢাকায় নতুন কর্মস্থল
অজয় কুমার সাহা চুয়াডাঙ্গা সদর গুলশান
মণিষা রায় পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও তেজগাঁও
টিনু চাকমা সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম ধানমন্ডি
উম্মে সালমা নাগরপুর, টাঙ্গাইল উত্তরা
আলী আজগর সুজানগর, পাবনা বাড্ডা
নাজনীন জাহান শ্যামনগর, সাতক্ষীরা সূত্রাপুর
ফরিদা আক্তার চিতলমারী, বাগেরহাট ডেমরা
শর্মিলা আহমেদ শম্পা ঘিওর, মানিকগঞ্জ পল্লবী
গোবিন্দ সাহা আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন ঢাকা সদর
রাসেল মল্লিক আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন কেরানীগঞ্জ
এস এম আবু সূফী আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন শ্যামপুর
মোহাম্মদ হানিফ আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন মোহাম্মদপুর
অমিত মোদক চাকমা আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন নবাবগঞ্জ
জাহিদুর রহমান আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন দোহার
রাজীব মজুমদার আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ
সিং মং থোয়াই আগের কর্মস্থলের বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন আশুলিয়া
অমায়িক বাবু
সাবরেজিস্টার অমায়িক বাবু।

এ তালিকাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পদায়নসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। পূর্ণাঙ্গ সরকারি আদেশের সঙ্গে প্রতিটি কর্মকর্তার আগের কর্মস্থল ও নতুন পদায়ন মিলিয়ে চূড়ান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।

ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়গুলোতে দলিল নিবন্ধনের পরিমাণ, জমির বাজারমূল্য, সরকারি ফি-রাজস্ব এবং সেবাগ্রহীতার চাপ বিবেচনায় পদায়নের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কার্যালয়ে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, অভিযোগের নিষ্পত্তির অবস্থা এবং কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা করা হয়েছে কিনা, তা জানা প্রয়োজন।

রাজধানী থেকে বাইরে গেলেন যারা

একই বদলি আদেশে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কার্যালয় থেকে কর্মকর্তাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—

কর্মকর্তা ঢাকায় আগের কর্মস্থল নতুন কর্মস্থল
মো. নোয়াজ মিয়া ঢাকা সদর নরসিংদী সদর
মো. আবরার ইবনে রহমান সূত্রাপুর শিবচর, মাদারীপুর
মুহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন খান মিরপুর ঘিওর, মানিকগঞ্জ
আবদুল্লাহ আল মামুন গুলশান ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ
আবদুল কাদির মোহাম্মদপুর সিলেট সদর
মোহাম্মদ মিরাজ উদ্দিন উত্তরা উখিয়া, কক্সবাজার
মো. আরিফুর রহমান ধানমন্ডি ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ
মো. জাহিদুল হক পল্লবী রাজনগর, মৌলভীবাজার
মো. খায়রুল বাশার আশুলিয়া রায়পুরা, নরসিংদী

এ ছাড়া ফতুল্লার সাব-রেজিস্ট্রার এস এম আদনান নোমানকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে গাজীপুরের টঙ্গীতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই রদবদলের ফলে রাজধানীর কয়েকটি কার্যালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। তবে কোনো কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে বদলি হয়েছেন বলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, কিংবা ঢাকায় পদায়ন পেয়েছেন বলেই তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বদলির কারণ এবং পদায়নের নীতিমালা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের তালিকায় যেসব কর্মকর্তা: কী অভিযোগ, কোথায় বদলি

বদলির খবরের পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। সময়ের আলো-এর ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জমির দলিল নিবন্ধন, নিষিদ্ধ মৌজার জমি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং অর্থ আদায়সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর ক্ষেত্রে বিভাগীয় তদন্ত, দুদকের অনুসন্ধান, আদালতের রায় বা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ প্রতিবেদনে উল্লেখিত অবস্থা
জাহিদ হাসান ময়মনসিংহে সরকারিভাবে বিক্রি নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন এবং প্রতিটি দলিলের বিপরীতে ৪০–৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ময়মনসিংহ সদর থেকে নেত্রকোনার বারহাট্টায় বদলি
আনোয়ারুল ইসলাম ময়মনসিংহের ভালুকায় বনের জমি হিসেবে চিহ্নিত কিছু জমির দলিল নিবন্ধনে আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ অভিযোগের নিষ্পত্তি ও নতুন কর্মস্থল সম্পর্কে আরও যাচাই প্রয়োজন
ওমর ফারুক ত্রিশালে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন একই জেলার বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে
এইচ এম মিরাজ সৌরভ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সরকারি বনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ বদলি আদেশে তার নতুন কর্মস্থল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন
মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ পটিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মের অভিযোগ প্রতিবেদনে হাটহাজারীতে পদায়নের কথা বলা হয়েছে
বুলবুল আহমেদ নোয়াখালী সদরে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রতিবেদনে জেলা রেজিস্ট্রারের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ রয়েছে
শফিকুল ইসলাম দলিলপ্রতি টাকা, নকলপ্রতি টাকা এবং বিয়ের সনদ যাচাইয়ের জন্য অর্থ আদায়ের অভিযোগ ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে

সূত্র: সময়ের আলো, ২৭ অক্টোবর ২০২৬। এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন: জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ সদরের সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে বিক্রি নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন এবং দলিলপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাকে নেত্রকোনার বারহাট্টায় বদলি করা হয়েছে।

এ অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মৌজার সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা বিক্রয়সংক্রান্ত আদেশ, নিবন্ধিত দলিলের নম্বর ও তারিখ, দলিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি এবং সরকারি ফি জমার রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থ আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এবং বিভাগীয় তদন্তের নথি ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

ময়মনসিংহের ভালুকার সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল ইসলাম এবং ত্রিশালের সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে জমির শ্রেণি ও দলিল নিবন্ধনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

ভালুকার ক্ষেত্রে অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু জমিকে বনের জমি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হতো। ত্রিশালের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

এ ধরনের অভিযোগ যাচাই করতে জমির শ্রেণি নির্ধারণকারী সরকারি নথি, বন বিভাগের রেকর্ড, দলিলের বিবরণ, নির্ধারিত ও পরিশোধিত নিবন্ধন ফি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমোদন পরীক্ষা করা জরুরি। শুধু অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়ী করা যায় না।

চট্টগ্রামে পদায়ন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার এইচ এম মিরাজ সৌরভের বিরুদ্ধে সরকারি বনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে পটিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে হাটহাজারীর গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে দুটি পৃথক প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, অভিযোগগুলোর পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে এবং সেগুলোর বিষয়ে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের আগে কর্তৃপক্ষ কোনো ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছে কিনা।

তবে মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন, অভিযোগের প্রমাণ এবং বদলির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত পদায়নকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।

দলিলপ্রতি অর্থ আদায়ের অভিযোগ: ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব

সময়ের আলো-এর প্রতিবেদনে ফরিদপুরের জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে দলিলপ্রতি ৩০০ টাকা, নকলপ্রতি ২৫০ টাকা এবং বিয়ের সনদ যাচাইয়ের জন্য কমিশন নেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে তার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী শিহাবের মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য কোন সেবা নিতে কত টাকা সরকারি ফি নির্ধারিত ছিল, প্রকৃতপক্ষে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, অর্থ আদায়ের রসিদ রয়েছে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য কী— এসব তথ্য সংগ্রহ জরুরি।

অভিযোগের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল ছাড়া অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

ঢাকায় পদায়নে লটারি, বাকি বদলিতে ভিন্ন পদ্ধতি— প্রশ্ন কোথায়?

সময়ের আলো-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ঢাকার ১৮টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়নের জন্য লটারি অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ঢাকায় পদায়নে স্বচ্ছতা আনার কথা জানিয়েছিলেন। কর্মকর্তাদের দক্ষতা, কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতা এবং কার্যালয়ের প্রয়োজন বিবেচনায় পদায়নের কথাও বলা হয়েছিল।

কিন্তু ২৬ অক্টোবরের আদেশে ৮৫ জনের মধ্যে ঢাকার ১৮টি পদে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের পদায়নের বিপরীতে অন্য ৬৭ জনের বদলি লটারি ছাড়া হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, সব বদলির ক্ষেত্রে একই ধরনের স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কিনা।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লটারি ছাড়া বদলি হওয়াই অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন, জনবল সংকট, দক্ষতা, শূন্য পদ এবং শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিবেচনায় বদলি হতে পারে। কিন্তু পদায়নের মানদণ্ড, সিদ্ধান্তের কারণ এবং অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থা প্রকাশ করা হলে বিতর্ক কমতে পারে।

জনবল সংকটের মধ্যে ৮৫ বদলি: সেবাগ্রহীতার স্বার্থ কতটা বিবেচনায়?

সময়ের আলো-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত রয়েছেন এবং ১৩৯টি পদ শূন্য। গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে জনবল সংকটের কারণে জমি কেনাবেচা ও দলিল নিবন্ধনের মতো সেবা ব্যাহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে একযোগে ৮৫ জনকে বদলি করার ফলে কোন কার্যালয়ে জনবল বাড়ল, কোথায় কমল এবং কোন এলাকায় নিবন্ধন কার্যক্রমে চাপ বাড়তে পারে— তার মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বদলির আদেশ জারি করাই যথেষ্ট নয়; নতুন কর্মস্থলে কর্মকর্তারা সময়মতো যোগ দিয়েছেন কিনা এবং নাগরিক সেবা স্বাভাবিক রয়েছে কিনা, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রারের শূন্য পদ পূরণে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগ রয়েছে। নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান জনবল দিয়েই নিবন্ধন কার্যক্রম চালাতে হবে। তাই বদলির সঙ্গে জনবল বণ্টনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মন্ত্রীর বক্তব্য: প্রমাণ থাকলে জমা দেওয়ার আহ্বান

সময়ের আলো-এর প্রতিবেদনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। গণমাধ্যমের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এ বক্তব্যের আলোকে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তাকে আগাম অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা উচিত।

ফলোআপ নিউজের পরবর্তী অনুসন্ধান

৮৫ সাব-রেজিস্ট্রারের বদলি শুধু প্রশাসনিক আদেশের বিষয় নয়; জমির দলিল নিবন্ধন, সরকারি রাজস্ব, সেবাগ্রহীতার ব্যয় এবং সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে ফলোআপ নিউজ পরবর্তী অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয় যাচাই করবে—

১. ঢাকার ১৮টি সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে লটারির ফলাফল ও চূড়ান্ত আদেশের মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না।

২. বাকি ৬৭ জনের বদলির ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনের লিখিত ব্যাখ্যা রয়েছে কি না।

৩. যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত, অভিযোগ নিষ্পত্তি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।

৪. নিষিদ্ধ মৌজার জমি নিবন্ধন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলিল ও সরকারি নথিতে কী তথ্য রয়েছে।

৫. দলিল নিবন্ধন, নকল সরবরাহ ও সনদ যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি কত এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী।

৬. বদলির পর কোন কার্যালয়ে জনবল সংকট বাড়ল বা কমল এবং নাগরিক সেবার ওপর এর প্রভাব কী হলো।

৭. ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড ও অভিযোগের অবস্থা কী।

ফলোআপ নিউজের অবস্থান: অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনকালে গুরুতর অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে আনা প্রশাসনের দায়িত্ব। একইভাবে বদলির আদেশের স্বচ্ছতা, সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তথ্যসূত্র: আইন ও বিচার বিভাগের ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর বদলি আদেশ; সময়ের আলো-এর ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন; যুগান্তরের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত বদলির তালিকা।