Headlines

চুল কাটার বকেয়া টাকা ও মেয়েকে উত্যক্ত করার পূর্ব ইতিহাস: ভালুকায় সেলুন ব্যবসায়ী রবীন্দ্র ঋষিকে তিন দফায় ছুরিকাঘাতে হত্যা

রবীন্দ্র ঋশি

নেশার টাকা নেওয়া ও হত্যার হুমকির অভিযোগ স্ত্রীর; মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় হয়েছিল সালিশ।

ফলোআপ নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদন

ময়মনসিংহের ভালুকায় রবীন্দ্র ঋষি (৪৩) নামে এক সেলুন ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে তিন দফায় ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সাদ্দাম হোসেন (২২) নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া মোড় এলাকার নোমান কম্পোজিট মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে একাধিক স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি রবীন্দ্র। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ, চুল কাটিয়ে টাকা না দেওয়া, নেশার জন্য টাকা চাওয়া এবং সেলুনে চুল কাটতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাদ্দামের সঙ্গে তার স্বামীর বিরোধ চলছিল। এর আগেও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। পরিবারের আরেকটি অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে রবীন্দ্রের মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে সাদ্দামের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে সালিশ হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা তদন্তের বিষয়।

সেলুন ব্যবসায়ী হত্যা
জামিরদিয়া এলাকায় রবীন্দ্র ঋষির মরদেহ দেখতে লোকজনের ভিড়। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েও রক্ষা হয়নি

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রবীন্দ্রের সেলুনে গিয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করেন সাদ্দাম। হামলা থেকে বাঁচতে রবীন্দ্র সেলুন থেকে বেরিয়ে দৌড়ে অভিযুক্তের বাবার দোকানে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তার ওপর হামলা চালানো হয়।

পরে প্রাণ বাঁচাতে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সেখানকার উঠানেও তাকে ফেলে আবার ছুরিকাঘাত করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, একাধিক স্থানে পালানোর চেষ্টা করেও হামলাকারীর হাত থেকে রক্ষা পাননি রবীন্দ্র। জনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে হামলার সময় ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন, কেউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিনা এবং হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর সুযোগ ছিল কিনা— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।

চুল কাটার টাকা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ

নিহত রবীন্দ্র ঋষির স্ত্রী সূচিত্রার অভিযোগ, সাদ্দাম নেশার জন্য প্রায়ই তার স্বামীর কাছ থেকে টাকা নিতেন। এ ছাড়া সেলুনে চুল কাটিয়ে টাকা পরিশোধ না করার ঘটনাও ঘটত। সম্প্রতি টাকা না দেওয়া এবং সাদ্দামকে চুল কাটতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ বাড়ে।

সূচিত্রার দাবি, এর আগেও সাদ্দাম তার স্বামীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, এসব বিরোধের জেরেই রবীন্দ্রকে হত্যা করা হয়েছে।

মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে হয়েছিল সালিশ

হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরেকটি পুরোনো বিরোধের কথা জানিয়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে রবীন্দ্রের মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে সাদ্দামের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে সালিশ হয়েছিল। পরিবারের ধারণা, ওই ঘটনার জেরেও রবীন্দ্রের ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

যদি সালিশের ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র থেকে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে— আগের বিরোধের পর দুই পক্ষের মধ্যে পরিস্থিতি কীভাবে এগিয়েছে, কোনো পক্ষ নতুন করে হুমকি দিয়েছিল কিনা এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার পরও বিরোধ কেন থামেনি।

তবে সালিশের বিষয়টি এখনো পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে জানা গেছে। সালিশে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং এ নিয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ বা নথি রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নিহতের পরিচয় ও পুলিশের বক্তব্য

নিহত রবীন্দ্র ঋষি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার উত্তরপাড়া এলাকার রঞ্জিত ঋষির ছেলে। তিনি ভালুকার জামিরদিয়া তরিফ মুন্সী মোড় এলাকায় কাশেম মিয়ার বাসায় ভাড়া থাকতেন এবং সেখানে সেলুনের ব্যবসা করতেন। অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন একই এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে।

ঘটনার খবর পেয়ে ভালুকা মডেল থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

২৭ অক্টোবর রাতে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে একরকম তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সাদ্দাম হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন কিনা, তা পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি

রবীন্দ্র ঋষি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

১. আগের হুমকি: নিহতের স্ত্রী যে হত্যার হুমকির অভিযোগ করেছেন, সে বিষয়ে আগে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল কিনা।

২. স্থানীয় সালিশ: মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে তিন মাস আগে অনুষ্ঠিত সালিশের সিদ্ধান্ত কী ছিল এবং সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন।

৩. হামলার ধারাবাহিকতা: প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রবীন্দ্র একাধিক স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে হামলার ধারাবাহিকতা ধরা পড়েছে কিনা।

৪. হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র: ছুরিটি উদ্ধার হয়েছে কিনা এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আঘাতের ধরন সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।

৫. অভিযুক্তের অবস্থান: সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা এবং তার বক্তব্য কী।

৬. সাক্ষীদের বক্তব্য: দোকান ও আশপাশের বাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে কিনা।

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের বিরোধ, হামলার পূর্বপরিকল্পনা ছিল কিনা এবং অপরাধের দায় নির্ধারণে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ঢাকা পোস্ট, আজকের পত্রিকা, কালবেলা ও যুগান্তরের ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন।