Headlines

একজন নজরুল ইসলাম মজুমদার: যিনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কওমী মাদ্রাসা দু’টৌই প্রতিষ্ঠা করেছেন

এক্সিম ব্যাংজ
সংবাদ থেকে সংবাদ

বাংলাদেশের আর্থিক খাত ও শিল্পোদ্যোগের ইতিহাসে নজরুল ইসলাম মজুমদার কোনো সাধারণ নাম নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মাফিয়াতন্ত্রের প্রতীক। দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের আড়ালে ব্যাংকিং খাতকে জিম্মি করে, রাষ্ট্রীয় নীতিকে পকেটে পুরে এবং হাজার কোটি টাকার পুজি বিদেশে পাচার করে তিনি নিজেকে এক অপরাজেয় ‘কর্পোরেট গডফাদার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তৎপরবর্তী আইনি তদন্তের পর এই লুটেরা সাম্রাজ্যের যে অন্ধকার রূপ উন্মোচিত হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত অধ্যায়।

অবৈধ সম্পদের পাহাড়
প্রকাশিত সংবাদ থেকে নেওয়া।
শিল্পের আড়ালে লুণ্ঠনের ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। 
১৯৫৬ সালে কুমিল্লার লাকসামে জন্ম নেওয়া নজরুল ইসলাম মজুমদারের ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল সাধারণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ১৯৯০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাসা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’। বিজিএমইএ-র সদস্যভুক্ত এজে সুপার গার্মেন্টস লিমিটেড সহ পোশাক খাতের একাধিক কারখানাকে ফ্রন্টলাইন হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দ্রুত বিত্তের পাহাড়ে চড়েন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তার এই পোশাক শিল্প ছিল মূলত একটি বৈধ ঢাল, যার আড়ালে তিনি দেশের ব্যাংকিং খাতকে গ্রাস করার এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছিলেন।

ব্যাংকিং খাতের একনায়ক ও নীতিনির্ধারণী জিম্মিদশা
১৯৯৯ সালে এক্সিম ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর, ২০০৯ সালে তিনি এর চেয়ারম্যানের পদ দখল করেন। এরপর টানা ১৫ বছর ব্যাংকটির পর্ষদকে নিজের একক ইশারায় পরিচালিত করেন। তবে তার মাফিয়াতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস’ (বিএবি)। দীর্ঘ ১৭ বছর বিএবি-র চেয়ারম্যান পদে ল্যাপটপ-প্রথার মতো চেপে বসে তিনি পুরো বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টরের অলিখিত ডন হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক শীর্ষ মহলের সঙ্গে অতি-ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি ব্যাংকিং আইন নিজের মতো করে সংশোধন করাতেন, যা দেশের সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ লুটের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদা আদায়ের মূল সিন্ডিকেট প্রধান ছিলেন এই মজুমদার।


বিদেশে টাকা পাচার

দাতব্য মুখোশ: কালো টাকা ও অপরাধ আড়ালের সামাজিক বৈধতা

জনমানসে নিজের আগ্রাসী ও কলঙ্কিত ইমেজ আড়াল করতে নজরুল ইসলাম মজুমদার বেছে নেন সুপরিকল্পিত ‘দাতব্য ও সামাজিক ছদ্মবেশ’। চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেশের প্রথম বেসরকারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (ইবিএইউবি)’ প্রতিষ্ঠা এবং ২০০২ সালে নিজ এলাকায় দাওরায়ে হাদিস সমমানের কওমি মাদ্রাসা স্থাপন এর অন্যতম উদাহরণ। তবে অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, মাফিয়া ডনদের চিরাচরিত কৌশলের মতোই এই শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মূলত তার লুণ্ঠিত কালো টাকাকে সাদা করার এবং সমাজের চোখে নিজেকে পুণ্যবান প্রমাণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার।
এক্সিম ব্যাংক

পতন, কারাগার ও আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের জাল

২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই গডফাদারের সুরক্ষিত দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের ১লা অক্টোবর দিবাগত রাতে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ দল গুলশানের গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। এরপরই তাকে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ থেকে লাঞ্ছিতভাবে অপসারণ করা হয় এবং তার পুরো পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
তদন্তের গভীরে প্রবেশ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেখতে পায়, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে নজরুল ইসলাম মজুমদার দেশেই প্রায় ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন, যার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু তার অপরাধের পরিধি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। যুক্তরাজ্য ও হংকং সহ ৪টি দেশে তার বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অকাট্য প্রমাণ মেলে। হংকংয়ে তার বেনামি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না সুপ্রিম লিমিটেড’ এবং আইল অব ম্যান-এ থাকা তার সমস্ত বিদেশি সম্পত্তি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশে অবরুদ্ধ (ক্রোক) করা হয়েছে।


নজরুল ইসলাম মজুমদার
পোশাক শিল্পের মালিক থেকে ব্যাংকিং খাতের ত্রাস এবং পরিশেষে একজন আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারকারী ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে নজরুল ইসলাম মজুমদারের এই পতন প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা কর্পোরেট মাফিয়াতন্ত্রের আয়ু শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতে ভেঙে যেতে পারে।

সম্পর্কিত সংবাদ