FollowUpNews রিপোর্ট
বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারের কর আদায় বাড়ছে না। আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের Tax-to-GDP ratio নেমে এসেছে মাত্র ৬.৭ শতাংশে। অর্থাৎ ১০০ টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে রাষ্ট্রের কর রাজস্ব আসে প্রায় ৬ টাকা ৭০ পয়সা।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) প্রকাশিত Revenue Statistics in Asia and the Pacific 2026 প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩৮টি অর্থনীতির গড় Tax-to-GDP ratio ছিল ১৯.৭ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের হার ছিল ৬.৭ শতাংশ।
ভারতসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা
| দেশ/অঞ্চল | Tax-to-GDP ratio | বছর |
|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ৬.৭% | ২০২৪ |
| ভারত | ১৮.০% | FY2023/24 |
| পাকিস্তান | ১২.৩% | ২০২৪ |
| শ্রীলঙ্কা | ১২.৫% | ২০২৪ |
| ভিয়েতনাম | ১৭.২% | ২০২৪ |
| থাইল্যান্ড | ১৭.১% | ২০২৪ |
| এশিয়া-প্যাসিফিক গড় | ১৯.৭% | ২০২৪ |
| OECD গড় | ৩৪.১% | ২০২৪ |
OECD-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তথ্য একই আন্তর্জাতিক তুলনামূলক কাঠামোর আওতায় রয়েছে। ভারত OECD-এর এই ৩৮ অর্থনীতির তালিকায় নেই; ভারতের ক্ষেত্রে IMF-এর General Government হিসাব অনুযায়ী FY2023/24-এ মোট কর রাজস্ব ছিল GDP-এর ১৮.০ শতাংশ। ফলে ভারতের সংখ্যাটি সরাসরি OECD-এর সংখ্যাগুলোর সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যবধান কত?
এশিয়া-প্যাসিফিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের Tax-to-GDP ratio প্রায় ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ভারতের IMF হিসাবের তুলনায় ব্যবধান প্রায় ১১.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অর্থাৎ প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলোর অনেক দেশ তাদের GDP-এর তুলনায় বাংলাদেশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কর রাজস্ব সংগ্রহ করছে।
১০০ টাকার অর্থনীতিতে কর আসে ৬ টাকা ৭০ পয়সা
Tax-to-GDP ratio বলতে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) তুলনায় সরকার কত কর আদায় করছে, সেটি বোঝায়। ফলে বাংলাদেশের ৬.৭ শতাংশ হারকে সহজ ভাষায় বললে—অর্থনীতিতে ১০০ টাকার সমপরিমাণ উৎপাদন ও আয় সৃষ্টি হলে তার বিপরীতে রাষ্ট্রের কর রাজস্ব আসে গড়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সার সমপরিমাণ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের আয়ের ৬.৭ শতাংশ কর দেয়। এটি পুরো অর্থনীতির আকারের সঙ্গে মোট কর রাজস্বের একটি অনুপাত।
দুই দশকেও বড় পরিবর্তন নেই
OECD-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের Tax-to-GDP ratio ছিল প্রায় ৫.৪ শতাংশ। ২০১০ সালে তা বেড়ে ৭.২ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৭.৫ শতাংশে উঠলেও ২০২৪ সালে আবার নেমে আসে ৬.৭ শতাংশে।
অর্থাৎ দুই দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও GDP-এর তুলনায় কর আদায়ের সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি।
কর আসে মূলত পণ্য ও সেবার ওপর
OECD-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট কর রাজস্বের মধ্যে পণ্য ও সেবার ওপর কর থেকে এসেছে GDP-এর প্রায় ৪.৩ শতাংশ, আর আয় ও মুনাফার ওপর কর থেকে এসেছে প্রায় ২.৩ শতাংশ।
এতে বাংলাদেশের কর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—রাজস্ব সংগ্রহে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা এখনো বেশি।
কেন এত কম কর?
বাংলাদেশের কম Tax-to-GDP ratio-এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। OECD-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনানুষ্ঠানিক ও কর-আহরণে কঠিন খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কার্যকর রাজস্ব আহরণের জন্য করদাতার নিবন্ধন, compliance এবং বেশি রাজস্ব সম্ভাবনাময় করদাতাদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি তাই শুধু করের হার কত—তা নয়। বরং কত বড় করভিত্তি বাস্তবে করের আওতায় রয়েছে, কত রাজস্ব সম্ভাবনা অব্যবহৃত থাকছে এবং কর প্রশাসন কতটা কার্যকরভাবে তা সংগ্রহ করতে পারছে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
মূল প্রশ্ন
বাংলাদেশের Tax-to-GDP ratio মাত্র ৬.৭ শতাংশ—এই সংখ্যা শুধু রাজস্বের পরিমাণের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের কর আহরণ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বড় হয়েছে, তখন GDP-এর তুলনায় কর রাজস্ব কেন একই গতিতে বাড়েনি?
এর উত্তর খুঁজতে সামনে আসে কয়েকটি প্রশ্ন—
- কতজন সম্ভাব্য করদাতা করের আওতায় আছেন?
- নিবন্ধিত করদাতার কতজন নিয়মিত রিটার্ন দেন?
- আয় ও মুনাফার তুলনায় কত রাজস্ব আদায় হচ্ছে?
- VAT নিবন্ধনের বিপরীতে প্রকৃত লেনদেন কতটা করের আওতায় আসছে?
- বছরে কত টাকার কর-ছাড় দেওয়া হচ্ছে?
- বড় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের কাছ থেকে সম্ভাব্য রাজস্বের কতটা আদায় হচ্ছে?
- Customs, VAT ও Income Tax-এর তথ্যের মধ্যে কোথায় সবচেয়ে বড় ফাঁক রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই স্পষ্ট হতে পারে—বাংলাদেশের সমস্যা কর কম থাকার, নাকি যতটা কর আদায় করার সুযোগ রয়েছে, তার তুলনায় আদায় কম হওয়ার।
উৎস: OECD, Revenue Statistics in Asia and the Pacific 2026; IMF, India: 2024 Article IV Consultation।
