ভালো ধার্মিক, শিক্ষিত ও সুখবাদীরা যেন নীরব দর্শক— উগ্রবাদের উত্থান, গণপিটুনি ও হত্যাযজ্ঞ শুধু পর্যবেক্ষণই করে যাচ্ছে তারা!
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে চুরির সন্দেহ— বিচারের আগেই জনতার হাতে মৃত্যু, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক উগ্রতা।
নিজস্ব অনুসন্ধান | FollowUpNews
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, চুরির সন্দেহ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো বক্তব্য— অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার আগেই একদল মানুষ কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে, কখনো শিল্পকারখানার এলাকায়, কখনো আবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে— গণপিটুনিতে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। এসব ঘটনায় মানসিকভাবে অসুস্থ বা বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের অসহায়ত্বও সামনে এসেছে।
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যুর ঘটনা সেই উদ্বেগকে আবারও সামনে এনেছে। পরিবারের দাবি, মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন শামীম। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রথমে মারধর, পরে হাসপাতালে গিয়ে আবারও হামলার শিকার হয়ে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেন হত্যা, কুষ্টিয়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীম রেজা হত্যা এবং ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড দেখিয়েছে, অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সহিংসতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সাতক্ষীরায় চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে দুই দফায় মারধর
টিবিএসের ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) গত ১৩ অক্টোবর কুলিয়া এলাকায় প্রথম দফায় গণপিটুনির শিকার হন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
অভিযোগ রয়েছে, রাত ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে তাকে আবারও মারধর করে। পরে মধ্যরাতে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেওয়া এবং লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানোর পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে শামীম ঠিক কী মন্তব্য করেছিলেন, তা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শামীমের ছোট ভাই সাগর হোসেনের দাবি, পারিবারিক সমস্যার কারণে তার ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল। দুই দিন আগে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার কথাবার্তা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের ধারণা। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঝগড়ার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথম দফায় মারধরের শিকার হন।
শামীম মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন বলে তার ভাই জানিয়েছেন। তার দুই সন্তান রয়েছে।
পরিবারের প্রশ্ন, কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে না দিয়ে কেন পিটিয়ে হত্যা করা হলো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল: চুরির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক যুবককে মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। তোফাজ্জলকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে মনে করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন— এমন তথ্যও মামলার বিবরণে উঠে এসেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১০ মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করেন। পলাতক ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
তদন্তের বিবরণে বলা হয়েছে, তোফাজ্জলকে প্রথমে চোর সন্দেহে মারধর করা হয়। পরে তার মোবাইল চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে কয়েকজন বুঝতে পারলেও তাকে আবার মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় অভিযোগের ভিত্তি যাচাই, নিরপরাধ ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে সংঘবদ্ধ সহিংসতা ঠেকানোর সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড—তোফাজ্জল হত্যা মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ
কুষ্টিয়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দরবারে হামলা, নিহত শামীম রেজা
২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে শামীম রেজা নামে ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তির দরবারে হামলা চালানো হয়। ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে কয়েক শ মানুষ সেখানে জড়ো হন বলে যমুনা টিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের সূত্র হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কথা বলা হয়। পরে দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শামীম রেজা ও তার দুই অনুসারীকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর শামীম রেজার মৃত্যু হয়; তার দুই অনুসারী আহত হন।
এখানেও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের আগে সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। কোনো বক্তব্য ধর্মীয়ভাবে আপত্তিকর মনে হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে হামলা ও হত্যা কোনোভাবেই বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
সূত্র: যমুনা টিভি—কথিত পীরকে পিটিয়ে হত্যা, দরবারে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ

ময়মনসিংহে দিপু দাস: অভিযোগের পর পিটিয়ে হত্যা, মরদেহে আগুন
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ১২ আসামিকে ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে দিপুর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাকে মিথ্যা অপবাদে হত্যা করা হয়েছে। তার বাবা উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগও তোলেন।
র্যাবের বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, দিপুকে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছিল। অর্থাৎ, শুধু হামলাকারী নয়, অভিযোগের সূত্র ধরে একজন মানুষ কীভাবে সংঘবদ্ধ জনতার নাগালে চলে গেলেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম—দিপু দাস হত্যা মামলার ১২ আসামি রিমান্ডে

সাভারেও মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
দ্য ডেইলি স্টারের গণপিটুনি-সংক্রান্ত সংবাদ তালিকায় ২০২৬ সালের ২১ জুলাই সাভারে আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৩০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগসংক্রান্ত খবর প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়।
ঘটনাটি শামীমের মৃত্যুর মতো ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নয়। কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষকে সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে জনতার সহিংসতার মুখে পড়তে হওয়ার বিষয়টি একই ধরনের সামাজিক বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
এ ধরনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্ত, পুলিশি তদন্ত এবং মামলার অগ্রগতি যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার—গণপিটুনি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনসমূহ
অভিযোগ কি এখন শাস্তি দেওয়ার লাইসেন্স?
ঘটনাগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সব ঘটনায় নিহত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন— এমন দাবি করা যাবে না। আবার সব ঘটনায় একই ধরনের উসকানি বা একই গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাও প্রমাণিত নয়। কিন্তু কয়েকটি ঘটনায় একটি উদ্বেগজনক মিল রয়েছে: অভিযোগ ছড়িয়ে পড়া, মানুষের জড়ো হওয়া, উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সহিংসতা।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ হোক বা চুরির সন্দেহ— অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। জনতার হাতে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই। মানসিক অসুস্থতা বা পারিবারিক সংকটে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, সুরক্ষা ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা আরও জরুরি।
সাতক্ষীরার ঘটনায় একটি বিশেষ প্রশ্ন সামনে এসেছে: পুলিশ একবার শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার পরও কীভাবে বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে গিয়ে আবার তাকে মারধর করতে পারল? হাসপাতালের নিরাপত্তা, পুলিশের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করার বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
আরেকটি প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে। কোনো বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তার প্রেক্ষাপট, সত্যতা ও সম্পাদনার বিষয় যাচাই না করেই যদি মানুষকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়, তবে তা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় কারা উসকানি দিয়েছে, কারা হামলায় অংশ নিয়েছে এবং কারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে— তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা দরকার।
বিচারবহির্ভূত শাস্তি বন্ধে জবাবদিহি জরুরি
গণপিটুনি শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার ওপরও আঘাত। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার, তদন্ত ও বিচারের মধ্য দিয়েই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযোগকারী বা উসকানিদাতার ভূমিকা তদন্তের বিষয় হতে পারে। আর হামলা ও হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশেষত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলার মতো ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশের দ্রুত সাড়া, হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ধর্মের নামে হোক কিংবা অপরাধের সন্দেহে— কোনো ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। অভিযোগের বিচার আদালত করবে, জনতা নয়। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে মানসিকভাবে অসুস্থ, সামাজিকভাবে অসহায় কিংবা জনরোষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া যেকোনো মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে থাকবে।
FollowUpNews-এর অনুসন্ধানী প্রশ্নঃ সাতক্ষীরায় শামীমকে প্রথমবার উদ্ধার করার পর হাসপাতালে দ্বিতীয় দফায় হামলা ঠেকানো গেল না কেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক আহ্বান ও হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? আর এ ধরনের ঘটনায় আগের মামলাগুলোর বিচার ও দণ্ড কার্যকরের অগ্রগতি কতটা?
