একই জমির দুই দলিল, যোগসাজশ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ; প্রশ্নের মুখে রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়া।
কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজারের টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার অভিজিৎ করকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই জমি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দুই ব্যক্তির কাছে দলিল ও রেজিস্ট্রি করার ঘটনায় তার কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী। অভিযোগকারীর দাবি, প্রথম দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর এবং পরবর্তীতে নামজারি ও খতিয়ান সম্পন্ন হওয়ার পরও একই জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাব-রেজিস্ট্রার অভিজিৎ কর, কয়েকজন দলিল লেখক এবং একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশের অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো কোনো আদালতের রায় বা চূড়ান্ত সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অভিজিৎ কর অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, অনলাইনে পূর্বের দলিলের তথ্য না থাকলে একই জমি আগে হস্তান্তর হয়েছে কিনা তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পক্ষে সবসময় জানা সম্ভব নয়।
৪৬ দিনের ব্যবধানে একই জমির দুই দলিল
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের গোদার বিল এলাকায় জমি নিয়ে এ বিরোধের সূত্রপাত। অভিযোগকারী মো. আব্দুল হাশিমের দাবি, ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল হেবা দলিলের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট জমির মালিক হন। পরে সরকারি নিয়মে জমির নামজারি ও খতিয়ানও সম্পন্ন করেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এর মাত্র ৪৬ দিন পর—২৩ মে—একই জমি গফুর আলমের নামে বিক্রয় দলিল করা হয়। ফলে একই জমির ওপর দু’টি পৃথক দলিলের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুই দলিলের চিত্র
| বিষয় | প্রথম দলিল | দ্বিতীয় দলিল |
|---|---|---|
| তারিখ | ৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩ মে ২০২৬ |
| দলিলের ধরন | হেবা দলিল | বিক্রয় দলিল |
| দাতা/বিক্রেতা | রহিম উল্লাহ | রহিম উল্লাহ |
| গ্রহীতা/ক্রেতা | মো. আব্দুল হাশিম | গফুর আলম |
| এলাকা | গোদার বিল, টেকনাফ সদর ইউনিয়ন | একই জমি বলে অভিযোগ |
| অভিযোগের মূল প্রশ্ন | হেবার পর নামজারি হয়েছিল কি না | আগের দলিলের পরও কীভাবে পুনরায় রেজিস্ট্রি হলো |
এই তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসেছে। মূল দলিল, নামজারি খতিয়ান ও রেজিস্ট্রি রেকর্ড সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগের কেন্দ্রে অভিজিৎ কর
আব্দুল হাশিমের অভিযোগ, তার নামে জমি হস্তান্তর ও নামজারি হওয়ার পরও একই জমি অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার প্রক্রিয়ায় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল। তার দাবি, সাব-রেজিস্ট্রার অভিজিৎ কর, কয়েকজন দলিল লেখক ও একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দ্বৈত রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
তবে অর্থ লেনদেন বা যোগসাজশের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো ব্যাংক নথি, লেনদেনের রেকর্ড, আদালতের রায় বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
অভিজিৎ করের বক্তব্যে উঠছে নতুন প্রশ্ন
অভিযোগের বিষয়ে অভিজিৎ করের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সিসি ক্যামেরা নেই এবং অনলাইনে পূর্বের দলিলের তথ্য না থাকলে একই জমি আগে বিক্রি হয়েছে কিনা তা অফিসের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দলিল লেখকের দেওয়া তথ্য এবং সর্বশেষ খতিয়ান যাচাই করেই দলিল সম্পন্ন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ খতিয়ানে যার নাম রয়েছে, তিনি সেই খতিয়ানের ভিত্তিতে জমি বিক্রি করতে এলে তাকে রেজিস্ট্রি করতে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—৭ এপ্রিলের হেবা দলিলের পর যদি সত্যিই নামজারি ও খতিয়ান পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে ২৩ মে ২০২৬-এর দলিলের সময় সর্বশেষ খতিয়ানে কার নাম ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট দুই দলিল, নামজারি খতিয়ান ও রেজিস্ট্রি রেকর্ড পাশাপাশি পরীক্ষা করলে।
দলিল লেখকদের ভূমিকা কতটা?
দ্বৈত রেজিস্ট্রির ঘটনায় শুধু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় নয়, সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে এসেছে। অভিযোগকারীর দাবি, দলিল লেখকদের মাধ্যমে দ্বিতীয় দলিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
অন্যদিকে অভিজিৎ করের বক্তব্যে দলিল লেখকের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে তদন্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের নাম, তার প্রস্তুত করা দলিলের খসড়া, ব্যবহৃত খতিয়ান এবং পূর্ববর্তী দলিল সম্পর্কে তিনি কী তথ্য পেয়েছিলেন—এসব নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
গফুর আলমের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে গফুর আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দলিল লেখকের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই করে রহিম উল্লাহর কাছ থেকে জমি কেনেন। তার দাবি, আগের হেবা দলিলের বিষয়টি তিনি জানতেন না। ফলে একই জমি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে তার অবস্থানও সরাসরি নথি যাচাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ বিরোধের কেন্দ্রে এখন চারটি পক্ষের বক্তব্য রয়েছে—প্রথম গ্রহীতা আব্দুল হাশিম, জমিদাতা রহিম উল্লাহ, দ্বিতীয় ক্রেতা গফুর আলম এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা অভিজিৎ কর।
সাংবাদিকের সঙ্গে আচরণ নিয়েও অভিযোগ
আরেকটি স্থানীয় প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে অভিজিৎ কর সাংবাদিকের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন এবং নিজেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সমতুল্য দাবি করে সাংবাদিকের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়ার হুমকি দেন। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সমর্থনকারী নির্ভরযোগ্য নথি বা একাধিক স্বতন্ত্র সূত্র এখনো পাওয়া যায়নি। তাই এটিও অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাটুরিয়ায়ও সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন অভিজিৎ কর
অভিজিৎ করের পূর্ববর্তী কর্মস্থল হিসেবে সাটুরিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য একটি সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। সেখানে ২০২৫ সালের একটি জমি রেজিস্ট্রি-সংক্রান্ত ঘটনায় দাতাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে তৎকালীন সাটুরিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অভিজিৎ কর বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ওই ঘটনায় অভিজিৎ কর নিজে অভিযুক্ত ছিলেন না। তাই সাটুরিয়ার ঘটনাকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। বরং এটি তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও দায়িত্ব পালনের সময়কাল যাচাইয়ের একটি সূত্র।
এখন যে নথিগুলো সামনে আনা জরুরি
টেকনাফের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মূলত আটটি নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন—
১. ৭ এপ্রিল ২০২৬-এর হেবা দলিলের certified copy
২. ২৩ মে ২০২৬-এর বিক্রয় দলিলের certified copy
৩. দুই দলিলে উল্লেখিত দাগ ও খতিয়ান নম্বর
৪. আব্দুল হাশিমের নামে করা নামজারি খতিয়ান
৫. ২৩ মে-র আগে সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ খতিয়ান
৬. দুই দলিলের দলিল লেখকের নাম ও লাইসেন্সসংক্রান্ত তথ্য
৭. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও সূচি
৮. এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন বা অন্য কোনো সরকারি দপ্তরে দেওয়া অভিযোগ ও তার পরবর্তী কার্যক্রম
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: দায় কার?
একই জমি যদি সত্যিই প্রথমে বৈধভাবে হেবা করা হয়ে থাকে, পরবর্তীতে নামজারিও হয়ে থাকে এবং তারপর একই জমি আবার অন্য ব্যক্তির নামে বিক্রয় দলিল হয়ে থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হলো—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন কর্মকর্তা বা একজন দলিল লেখকের বক্তব্যে পাওয়া যাবে না।
প্রথম দলিলের পর নামজারি কীভাবে হলো, দ্বিতীয় দলিলের সময় কোন খতিয়ান ব্যবহার করা হলো, দলিল লেখক কী তথ্য পেয়েছিলেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগের দলিলের কোনো রেকর্ড ছিল কি না এবং দ্বিতীয় দলিল সম্পাদনের সময় কোনো আপত্তি বা অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল কি না—সবকিছু একসঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।
তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ অবস্থায় অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দুই দলিলের বৈধতা, নামজারি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকদের ভূমিকা এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।
একই জমির দুই দলিল সত্য হলে দায় শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার নয়; রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপও প্রশ্নের আওতায় আসবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও সরকারি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধান চলবে।
