ধানমন্ডি বিভাগে যুগ্ম কমিশনার, পশ্চিম কমিশনারেটে ৩ অতিরিক্ত কমিশনার; চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জনবল ঘাটতি— পদায়ন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন।
নিজস্ব প্রতিবেদক
কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, ও মাঠপর্যায়ের কাস্টমস দপ্তরে যখন প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যাচ্ছে না, তখন রাজধানীর বিভিন্ন কমিশনারেট ও দপ্তরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘনত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রশ্নটি শুধু কর্মকর্তা কম-বেশির নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়— কাস্টমস-ভ্যাটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি অংশ কি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক পদায়নে থাকতে আগ্রহী?
সরকারি নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালজুড়েই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, উপকমিশনার ও সহকারী কমিশনার পর্যায়ে একের পর এক বদলি, পদায়ন, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চলতি দায়িত্বের আদেশ দিয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের সংযুক্তির মেয়াদ বাড়ানো এবং নতুন করে কর্মকর্তা সংযুক্তির আদেশও হয়েছে।
পশ্চিম কমিশনারেটেই তিন অতিরিক্ত কমিশনার
ঢাকা পশ্চিম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সরকারি কর্মকর্তার তালিকায় বর্তমানে কমিশনারের সঙ্গে তিনজন অতিরিক্ত কমিশনার রয়েছেন।
তালিকায় কমিশনার হিসেবে কাজী ফরিদ উদ্দীনের নামের পাশাপাশি অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে সিফাত-ই-মরিয়ম, নির্ঝর আহমেদ ও মো. শাকিল খন্দকারের নাম রয়েছে। একই তালিকায় একজন যুগ্ম কমিশনার ও তিনজন সহকারী কমিশনারের নামও রয়েছে।
একই কমিশনারেটের অধীনে পল্লবী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, সাভার, হেমায়েতপুর, ধামরাই, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জসহ একাধিক বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের দায়িত্বে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নামও সরকারি তালিকায় রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে— একটি কমিশনারেটের সদর দপ্তরে তিনজন অতিরিক্ত কমিশনার থাকা প্রয়োজনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বিভাগগুলোতে কর্মকর্তার প্রয়োজনের তুলনা কীভাবে করা হয়?
ধানমন্ডি বিভাগেও যুগ্ম কমিশনার
ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে ধানমন্ডি একটি বিভাগীয় কার্যালয়। সরকারি তালিকায় ধানমন্ডি বিভাগীয় কার্যালয়ের ঠিকানা ৪৬, রোড ৯/এ, ধানমন্ডি আর/এ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের বিভিন্ন নথিতেও ধানমন্ডিকে একটি বিভাগীয় দপ্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটের প্রশাসনিক কাঠামোয় অতিরিক্ত ও যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তারা সদর দপ্তরের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ:
ধানমন্ডির মতো একটি ভ্যাট বিভাগের নিয়মিত বিভাগীয় কাজ পরিচালনায় যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তা রাখার প্রয়োজনীয়তা কী?
এটি এমন নয় যে যুগ্ম কমিশনার সেখানে থাকতেই পারেন না। কিন্তু এনবিআরের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে— কোন সাংগঠনিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি বিভাগীয় পর্যায়ের দপ্তরে কোন স্তরের কর্মকর্তা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা হয়?
কারণ একই সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস হাউসগুলোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসেও বাইরে থেকে জনবল
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরভিত্তিক কাস্টমস হাউস চট্টগ্রামেও জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এনবিআরের ২০২৬ সালের নথিতে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের সংযুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আদেশ হয়েছে ৫ জুলাই। এরপর ৩০ আগস্ট আবার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের সংযুক্তির প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও এ পর্যায়ের বদলি-পদায়নের আদেশ হয়েছে।
অর্থাৎ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বকেন্দ্রে নিয়মিত জনবল কাঠামোর পাশাপাশি অন্য জায়গা থেকে কর্মকর্তা এনে কাজ চালানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
একই এনবিআর নথিভাণ্ডারে ২০২৬ সালে কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার ও উপকমিশনার পর্যায়েও একাধিক বদলি-পদায়ন ও অতিরিক্ত দায়িত্বের আদেশের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
তাহলে সমস্যা কোথায়?
সরকারি চাকরিতে একজন কর্মকর্তা কোথায় থাকবেন, সেটি প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। ঢাকায় পোস্টিং পাওয়া কোনো অপরাধ নয়। একইভাবে ঢাকার বাইরে পোস্টিং পাওয়াও কোনো শাস্তি নয়।
কিন্তু কাস্টমস প্রশাসনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
কারণ দেশের রাজস্বের বড় অংশ আদায় হয় বন্দর, বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয় থেকে।
সেখানে যদি প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা না থাকে, অথচ রাজধানীর বিভিন্ন কমিশনারেট ও দপ্তরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘনত্ব বাড়ে, তাহলে পদায়ন নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কেন ঢাকায় থাকতে চান কর্মকর্তারা?
কাস্টমসের অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘ চাকরিজীবনে রাজধানীর বিভিন্ন দপ্তর ও কমিশনারেটে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকায় থাকার সুবিধাও কম নয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, বড় হাসপাতাল, সন্তানদের শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক যোগাযোগ— সবকিছুর কেন্দ্র রাজধানী।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঢাকার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একাধিক হলেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র।
অতএব ঢাকার বাইরে পদায়ন হলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ অসম্ভব হয়ে যায়— এমন নয়। চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। কিন্তু রাজধানীর বিমান যোগাযোগের ব্যাপ্তি ও সংযোগের সুবিধা আলাদা।
একইভাবে দেশের অন্যান্য শহরেও ভালো হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব বেশি।
ফলে দীর্ঘদিন রাজধানীকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে ঢাকার বাইরে পোস্টিং তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধা আর রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন— দুটির মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
‘টাকা-পয়সা হয়ে গেছে’— জনমুখে যে প্রশ্ন
কাস্টমসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি অংশ সম্পর্কে জনপরিসরে নানা ধরনের সম্পদ ও দুর্নীতির আলোচনা রয়েছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা অবৈধ সম্পদের দাবি প্রমাণ ছাড়া সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যায় না।
তবে এই প্রশ্নটি অনুসন্ধানের বাইরে রাখা যায় না।
দীর্ঘদিন রাজধানীতে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদ কি তাদের আয় ও চাকরির ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এর উত্তর বের করার উপায়ও আছে।
একজন কর্মকর্তার—
- চাকরির পদায়ন ইতিহাস,
- আয়কর রিটার্ন,
- সম্পদ বিবরণী,
- ঘোষিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ,
- পরিবারের নামে থাকা সম্পদ,
- ঢাকায় দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান।
এসব তথ্য পাশাপাশি রাখলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
অর্থাৎ ‘ঢাকায় থাকতে চান’— এটি যদি কেবল জীবনযাত্রার সুবিধার কারণে হয়, সেটি এক ধরনের বিষয়। আর যদি রাজধানীকেন্দ্রিক অবস্থানের সঙ্গে অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত থাকে, তাহলে সেটি আরও গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্ন।
একজন কর্মকর্তা কত বছর ঢাকায়?
এই অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি এখনো প্রকাশ্যে নেই।
একজন অতিরিক্ত কমিশনার বা যুগ্ম কমিশনার গত ১০ বছরে—
কত বছর ঢাকায় ছিলেন?
কত বছর ঢাকার বাইরে ছিলেন?
ঢাকার বাইরে সর্বশেষ কবে পোস্টিং হয়েছিল?
একই কর্মকর্তা কতবার ঢাকার বিভিন্ন কমিশনারেট, কাস্টম হাউস বা এনবিআর সদর দপ্তরে ফিরেছেন?
এই হিসাব প্রকাশ করা হলে ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
কারণ একজন কর্মকর্তা দুই বছর ঢাকায় থাকার পর তিন বছর চট্টগ্রাম বা বেনাপোলে থাকলে সেটি এক ধরনের রোটেশন। কিন্তু ১০ বছরের চাকরিতে যদি অধিকাংশ সময়ই রাজধানীর বিভিন্ন দপ্তরে কাটে, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়।
‘মাঠের প্রয়োজন’ কি পদায়নের মাপকাঠি?
কাস্টমস প্রশাসনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ মাঠের প্রয়োজন।
যে কর্মকর্তা যেখানে প্রয়োজন, তাকে সেখানে থাকা উচিৎ— এটাই সরকারি প্রশাসনের স্বাভাবিক যুক্তি।
কিন্তু বাস্তবতা যাচাই করতে হলে এনবিআরকে প্রতিটি কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউসের ক্ষেত্রে প্রকাশ করতে হবে—
অনুমোদিত পদ কত, কর্মরত কত, শূন্য কত।
এর পাশাপাশি প্রকাশ করা প্রয়োজন—
কোন কর্মকর্তা কত বছর কোথায় ছিলেন।
তাহলেই বোঝা যাবে, ঢাকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রশাসনিক প্রয়োজনের ফল, নাকি দীর্ঘদিনের রাজধানীকেন্দ্রিক পদায়নের ফল।
এনবিআরের কাছে প্রশ্ন
১. ঢাকা পশ্চিম কমিশনারেটে তিনজন অতিরিক্ত কমিশনার রাখার প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা কী?
২. ধানমন্ডি বিভাগের মতো বিভাগীয় পর্যায়ের দপ্তরে যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তা রাখার অনুমোদিত কাঠামো কী?
৩. ঢাকা কাস্টম হাউসে সহকারী কমিশনারের ১০টি পদ শূন্য থাকার পরও এসব পদ পূরণ করা হচ্ছে না কেন?
৪. চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ২০২৬ সালে বারবার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সংযুক্ত করার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?
৫. বেনাপোল, মোংলা, পানগাঁওসহ গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস হাউসগুলোর উচ্চপদে বর্তমানে কতটি পদ শূন্য?
৬. অতিরিক্ত কমিশনার ও যুগ্ম কমিশনার পর্যায়ের প্রতিটি কর্মকর্তার গত ১০ বছরের পদায়ন ইতিহাস কি প্রকাশ করা হবে?
৭. একজন কর্মকর্তা কত বছর ঢাকায় থাকতে পারবেন— এমন কোনো রোটেশন নীতি আছে কি?
৮. ঢাকার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমস হাউসে পদায়নকে কি প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক রোটেশনের আওতায় আনা হয়?
ঢাকায় থাকা কোনো কর্মকর্তার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কথা কেউ বলছে না।
ভালো চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, পরিবার, যোগাযোগ কিংবা আন্তর্জাতিক যাতায়াত— এসব মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন।
কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজন বড়।
বিশেষ করে কাস্টমসের মতো রাজস্ব আদায়ের প্রতিষ্ঠানে প্রশ্নটি আরও সরল—
যেখানে কোটি কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি ও রাজস্বের কার্যক্রম হয়, সেখানে প্রয়োজনীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নেই কেন?
আর যেখানে সেই মাত্রার মাঠপর্যায়ের চাপ নেই, সেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদায়নের প্রয়োজনীয়তা কী?
ঢাকা পশ্চিমে তিন অতিরিক্ত কমিশনার, ধানমন্ডি বিভাগে যুগ্ম কমিশনারের উপস্থিতি এবং অনেক জায়গায় পদ শূন্য— এই তিনটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কর্মকর্তা কোথায় আছেন’— সেখানে আটকে থাকে না।
প্রশ্নটি হয়ে যায়—
কাস্টমসের পদায়ন কি রাজস্বের প্রয়োজন অনুযায়ী হচ্ছে, নাকি ঢাকায় থাকার সুবিধা অনুযায়ী?
এর উত্তর এখন এনবিআরের কাছ থেকেই আসা উচিৎ।
