বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) মতো দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্ন ফাঁস, অর্থের বিনিময়ে চাকরির নিশ্চয়তা এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্ভাব্য যোগসাজশের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা সরকারি নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ৩১তম ও ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া, কাস্টমস, প্রশাসন (এডমিন) ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ এবং নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথিপত্রের যথার্থতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পিএসসির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে সিআইডির অভিযান, একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর গ্রেপ্তার এবং আদালতে ছয় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির খবর প্রকাশিত হয়। দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএসসির ডিসপ্যাচ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান আদালতে দাবি করেছিলেন, তিনি ৩৩তম বিসিএসের ১০ জন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন সরবরাহ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত তিনজন বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পান বলে তার জবানবন্দির বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn986343view0″,”turn986343view1”]}/>
অন্যদিকে, ৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ৯৮ কর্মকর্তার সম্পূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়া পরীক্ষা, ফলাফলপত্র ও ওএমআর শিট পুনরায় ফরেনসিক যাচাই এবং ৩১তম ও ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রের সঙ্গে সরকারি গেজেট মিলিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। তবে ৯৮ কর্মকর্তার কোন নির্দিষ্ট কোনো অংশ জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যাচাইযোগ্য প্রামাণ্য নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি অভিযোগ ও তদন্তের দাবি হিসেবে বিবেচ্য, প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে নয়।

৩১তম বিসিএস: কাস্টমস ক্যাডারের ৯৮ কর্মকর্তার নিয়োগপ্রক্রিয়া কি পুনরায় যাচাই করা হবে?
৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ৯৮ কর্মকর্তার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষ তদন্তের দাবি তুলতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন হবে ওই ব্যাচের চূড়ান্ত সুপারিশ, নিয়োগসংক্রান্ত গেজেট, ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগসংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার মূল নথিপত্র যাচাই করা।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নিয়োগের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম হয়ে থাকলে শুধু প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা অনুসন্ধান করে পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত, নম্বর সংরক্ষণ, চূড়ান্ত সুপারিশ এবং নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তালিকার প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ওএমআর ও ফলাফলপত্রে কারসাজির অভিযোগ
কিছু প্রার্থীর ফলাফলপত্র বা ওএমআর শিটে কারসাজি করে নিয়োগের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে তা প্রশ্ন ফাঁসের চেয়ে ভিন্ন ধরনের অপরাধের ইঙ্গিত দেবে। কারণ প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে পরীক্ষার্থী আগাম প্রশ্ন বা উত্তর পেতে পারেন, কিন্তু ফলাফলপত্রে জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে পরীক্ষার ফলাফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের অখণ্ডতা।
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন হবে—
- প্রার্থীদের মূল ওএমআর শিট এবং স্ক্যান করা কপির তুলনামূলক পরীক্ষা।
- পরীক্ষার মূল নম্বরপত্র ও ডিজিটাল ডেটাবেজের সংরক্ষিত সংস্করণ পর্যালোচনা।
- ফলাফল প্রস্তুত ও সংশোধনের সময়কার লগ, অনুমোদন এবং পরিবর্তনের ইতিহাস পরীক্ষা।
- লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্রের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফল মিলিয়ে দেখা।
- পিএসসির সুপারিশ করা তালিকার সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নথি তুলনা করা।
এসব নথিতে অসংগতি পাওয়া গেলে তা কারসাজির অভিযোগ যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। তবে কোনো ফলাফলে অসংগতি থাকলেই সেটিকে ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি বলা যাবে না; তার কারণ, দায়ী ব্যক্তি এবং সংশোধনের অনুমোদিত প্রক্রিয়াও অনুসন্ধান করতে হবে।
৯৮ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কী কী প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন?
৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ৯৮ কর্মকর্তাকে নিয়ে তদন্তের দাবি যাচাই করতে হলে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রথমত, ওই ব্যাচে কাস্টমস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ও গেজেটভুক্ত কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত তালিকা কী ছিল? দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক প্রার্থীর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর এবং চূড়ান্ত মেধাক্রমের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কিনা? তৃতীয়ত, মূল সুপারিশের তালিকা এবং প্রকাশিত গেজেটের মধ্যে কোনো অমিল পাওয়া যায় কিনা? চতুর্থত, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁস, অর্থ লেনদেন, জাল সনদ ব্যবহার কিংবা ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগ থাকলে তার সমর্থনে কী নথি রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কিছু কর্মকর্তাকে একসঙ্গে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন তথ্যগতভাবে দুর্বল হবে, তেমনি প্রকৃত অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটি শনাক্ত করাও কঠিন হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ ও ব্যক্তিগত দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করাই হওয়া উচিৎ তদন্তের ভিত্তি।
৩৩তম বিসিএস: খলিলুর রহমানের জবানবন্দিতে ১০ পরীক্ষার্থীর প্রসঙ্গ
৩৩তম বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলোতে পিএসসির ডিসপ্যাচ কর্মকর্তা খলিলুর রহমানের জবানবন্দি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৯ জুলাই ২০২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, খলিলুর রহমান আদালতে দাবি করেন, তিনি ৩৩তম বিসিএসের ১০ জন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন সরবরাহ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাদের তিনজন মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়েন এবং বাকি তিনজন বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পান বলে তার জবানবন্দির বরাতে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। <Cite refs={[“turn986343view1″,”turn537892search7”]}/>
এই তথ্য নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই তিন কর্মকর্তার নাম, তাদের সুনির্দিষ্ট ক্যাডার এবং বর্তমান পদপরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তারা প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা— এমন দাবি ওই প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত করা যায় না।
একইভাবে, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও সেটিই সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের চূড়ান্ত বিচারিক প্রমাণ নয়। জবানবন্দির বক্তব্য, অন্য সাক্ষ্য, নথিপত্র এবং আদালতের সিদ্ধান্ত মিলিয়ে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা কি শুধু ৩৩তম বিসিএসেই সীমাবদ্ধ ছিল?
২০২৪ সালের ১০ জুলাই প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়, প্রশ্ন ফাঁসের চক্রটি অন্তত ১২ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ওই প্রতিবেদনে বিসিএসসহ অন্তত ৩০টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়। <Cite refs={[“turn986343view0″,”turn537892search4”]}/>
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, চক্রটির সঙ্গে পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদেরও এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ সামনে আসে।
এ থেকে বোঝা যায়, প্রশ্ন ফাঁসের তদন্ত কেবল একজন কর্মচারী বা একটি পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। তবে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের সঙ্গে ৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারে কথিত ফলাফলপত্র জালিয়াতির অভিযোগকে একই অপরাধচক্রের কাজ বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলে পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
প্রশ্ন ফাঁসের বাইরে ফলাফল ও সুপারিশের তালিকায় জালিয়াতির অভিযোগ
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চূড়ান্ত ফলাফল ও সুপারিশের তালিকা। কোনো প্রার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও অথবা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন না করেও নিয়োগ পেয়েছেন— এমন অভিযোগ উঠলে তা যাচাইয়ের জন্য শুধু প্রশ্নপত্রের উৎস অনুসন্ধান যথেষ্ট নয়।
এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখার নথি, প্রার্থীদের ফলাফল, পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের গেজেটের মধ্যে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ফলাফলপত্রে নম্বর পরিবর্তন হয়েছিল কিনা
৩৩তম বিসিএসের প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে সরাসরি ফলাফলপত্রে নম্বর বাড়িয়ে প্রার্থীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এই অনুসন্ধানে এমন কোনো যাচাইযোগ্য মূল নথি, ফরেনসিক প্রতিবেদন কিংবা আনুষ্ঠানিক তদন্ত-ফল পাওয়া যায়নি, যা ওই দুই ক্যাডারে এ ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
তাই অভিযোগটি যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পরিচয় ও রোল নম্বর, পরীক্ষার নম্বরপত্র, চূড়ান্ত মেধাক্রম, সুপারিশপত্র এবং গেজেটের মধ্যে কোনো অসংগতি আছে কিনা, তা পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ডিজিটাল ডেটাবেজ ও মূল নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
সুপারিশের তালিকা বদলে সরকারি গেজেট প্রকাশের সুযোগ ছিল কি?
পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশের তালিকা এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশিত নিয়োগের তালিকা এক কিনা, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
এ ধরনের ঘটনা সত্য হলে তা কেবল পরীক্ষার অনিয়ম নয়; বরং সুপারিশ থেকে নিয়োগ পর্যন্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা নির্দেশ করবে। তবে পিএসসির সুপারিশ ছাড়া কোনো প্রার্থীর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সুপারিশপত্র, মন্ত্রণালয়ের নথি এবং গেজেটের সত্যায়িত কপি সরাসরি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একইভাবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কোনো কর্মকর্তা জেনেশুনে জালিয়াতিতে সহায়তা করেছিলেন— এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব, অনুমোদন ও নথি প্রক্রিয়াকরণের ভূমিকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা জরুরি।
নেপথ্যে সাবেক ও বর্তমান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট
প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মচারী বা মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের দায়ী করে তদন্ত শেষ করা হলে সম্ভাব্য সহযোগী ও সুবিধাভোগীদের ভূমিকা অজানা থেকে যেতে পারে। এ কারণেই পিএসসির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
দ্য ডেইলি স্টারের ১০ জুলাই ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র পিএসসির আরও কিছু বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা জানিয়েছিল। প্রতিবেদনে একাধিক কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা বলা হলেও কিছু ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। <Cite refs={[“turn986343view0″,”turn986343view4”]}/>
এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠতে পারে, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, নম্বরপত্র, ফলাফল প্রস্তুত এবং সুপারিশের তালিকা সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ অনিয়মে সহায়তা করেছিলেন কিনা। একইভাবে, কোনো কর্মকর্তা যদি জালিয়াতির মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে থাকেন, তবে তার ভূমিকা শনাক্ত করাও জরুরি।
তবে পিএসসি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা এনবিআরের সাবেক ও বর্তমান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কেউ সরাসরি নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন— এমন অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করার আগে সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য, নথি এবং তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যাচাই করতে হবে।
৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র: তদন্তে কী উঠে এসেছে?
প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই পল্টন থানায় মামলা করে সিআইডি। পরবর্তী সময়ে তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইডি ওই মামলায় ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অভিযোগপত্রে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে চক্রের কথিত মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। <Cite refs={[“turn986343view2″,”turn537892search10”]}/>
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তে নির্বাচিত পরীক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ, নির্দিষ্ট স্থানে তাদের উত্তর মুখস্থ করানো এবং এর বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। চক্রটির সঙ্গে সরকারি কর্মচারী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথাও অভিযোগপত্রের বরাতে প্রকাশ করা হয়। <Cite refs={[“turn986343view2″,”turn537892search2”]}/>
তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের তথ্য প্রশ্ন ফাঁসের মামলার অগ্রগতি নির্দেশ করে। দ্বিতীয়ত, এই অভিযোগপত্রের মাধ্যমে ৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারের ৯৮ কর্মকর্তার নিয়োগ জালিয়াতি কিংবা ৩৩তম বিসিএসের প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে সরাসরি ফলাফলপত্র বদলের অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। ওই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সঙ্গে মামলার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথির বিষয়বস্তু পরীক্ষা করতে হবে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ: কোন নথি যাচাই করা জরুরি?
৩১তম ও ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের জন্য অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন।
১. পিএসসির মূল নথিপত্র: প্রার্থীদের রোল নম্বরভিত্তিক ফলাফল, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, চূড়ান্ত মেধাক্রম এবং সুপারিশের মূল তালিকা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা।
২. ওএমআর ও ডিজিটাল ডেটাবেজ: মূল ওএমআর শিট, স্ক্যান করা কপি, নম্বর সংরক্ষণের ডেটাবেজ এবং পরিবর্তনের লগ পর্যালোচনা করে কোনো অননুমোদিত পরিবর্তন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
৩. সরকারি গেজেট: পিএসসির সুপারিশের তালিকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং প্রকাশিত গেজেটের মধ্যে কোনো অমিল আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা।
৪. অভিযুক্ত ও সুবিধাভোগীদের যোগসূত্র: প্রশ্ন ফাঁসের মামলার জবানবন্দি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নিয়োগের সম্পর্ক আছে কিনা, তা অনুসন্ধান করা।
৫. প্রশাসনিক দায় নির্ধারণ: কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কোন কর্মকর্তা নথি প্রস্তুত, যাচাই, অনুমোদন কিংবা প্রেরণের দায়িত্বে ছিলেন, তা নির্ধারণ করা।
এই পাঁচটি পর্যায়ে যাচাই সম্পন্ন হলে প্রশ্ন ফাঁস, ফলাফলপত্রে কারসাজি এবং নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় অনিয়ম— এসব পৃথক অভিযোগের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।
বর্তমান অবস্থা: প্রশ্ন ফাঁসের মামলা আছে, কিন্তু দুই ব্যাচের সব অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রশ্ন ফাঁসের মামলায় সিআইডি ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। একই মামলায় অভিযুক্ত পিএসসি কর্মকর্তা কৌশিক দেবনাথ ২০২৬ সালের আগস্টে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত তার আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার আইনজীবী অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন। <Cite refs={[“turn986343view2″,”turn537892search10”]}/>
এই অগ্রগতি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ৩১তম বিসিএসের কাস্টমস ক্যাডারের ৯৮ কর্মকর্তার সম্পূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে, কিংবা ৩১তম ও ৩৩তম বিসিএসের প্রশাসন, কাস্টমস ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে আরও অনেক কর্মকর্তা অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন— এমন দাবি নিশ্চিত করার মতো হালনাগাদ আনুষ্ঠানিক নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
সুতরাং এ ক্ষেত্রে পিএসসির মূল নথি, সিআইডির অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ এবং নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সংগ্রহ করা অপরিহার্য। এসব নথি পাওয়া গেলে কোন অভিযোগ ইতিমধ্যে তদন্তে এসেছে, কোনটি এখনো যাচাইয়ের অপেক্ষায় এবং কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ রয়েছে— তা নির্দিষ্ট করে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
নিয়োগের বৈধতা যাচাই হোক নথির ভিত্তিতে
বিসিএস নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথিত নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সরকারি নিয়োগব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অপরাধের প্রভাব শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের অধিকারেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশাসনের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ৩১তম ও ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। প্রশ্ন ফাঁসের মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পরিচয় ও নিয়োগের যোগসূত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি কাস্টমস ক্যাডারের নিয়োগসংক্রান্ত নথি, ফলাফলপত্র, ওএমআর শিট এবং সরকারি গেজেটের সত্যতা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রকৃত জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি যে পদেই থাকুন না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। একই সঙ্গে কোনো প্রমাণ ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ ব্যাচ কিংবা কোনো ক্যাডারের সব কর্মকর্তাকে সন্দেহের আওতায় না এনে প্রত্যেকের নিয়োগের বৈধতা ও ব্যক্তিগত দায় পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে।
কারণ, সরকারি নিয়োগব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো— অভিযোগ নয়, প্রমাণ; প্রভাব নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত; আর অনুমান নয়, নথিভিত্তিক জবাবদিহি।
