নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের একাংশের হিন্দু ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন এক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভ্যাট ও কর আদায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু রাজস্ব কর্মকর্তা মুসলিম মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় হিন্দু মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি কঠোরতা দেখাচ্ছেন। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে এমন বৈষম্যের কথা স্বীকার করেনি।
তবে রাজধানী থেকে জেলা শহর—বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মরণ চাঁদের অভিযোগ
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান মরণ চাঁদ-এর কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে পরিচালিত হলেও প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভ্যাট পরিশোধ করতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবসার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় না নিয়েই নিয়মিত ভ্যাট আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
ফার্মগেটের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
ফার্মগেট এলাকার একটি পুরোনো হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মালিকও অভিযোগ করেছেন, ভ্যাট ও ট্যাক্স সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা এবং কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্য, একই ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে কম নজরদারির মধ্যে থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
খুলনার ইন্দ্রমোহন সুইটসের অভিযোগ
খুলনার ঐতিহ্যবাহী ইন্দ্রমোহন সুইটস-এর বর্তমান কারিগর অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন মূলত ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য চালু রাখা হয়েছে। লাভজনক ব্যবসা না হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত ভ্যাট সংক্রান্ত চাপ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ঘুষ দাবি করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ তিনি করেননি। তবে ফলোআপ নিউজ-এর অনুসন্ধান বলছে— রাজস্ব কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবী করার বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক। ঢাকার নাজিরাবাজারের বোখারী রেস্টুরেন্টের মালিক এ বিষয়ে বলেন, ঘুল না দেওয়া পর্যন্ত তারা হুমকি দিতেই থাকে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
কয়েকজন হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, তাদের তুলনায় কিছু মুসলিম মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি বিক্রি করেও কম ভ্যাট ও কর পরিশোধ করছে।
তাদের দাবি, খুলনার নিউমার্কেট এলাকার আল আমীন জুয়েলার্স তুলনামূলক কম ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং সরকারি নথিপত্র দিয়ে দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, যদি একই খাতে সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ না হয়, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং সংখ্যালঘু উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
তথ্য কী বলছে?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সত্যতা সরকারি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কাস্টসম্ কমিশনারেট ফলোআপ নিউজকে ভ্যাট সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছে। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চে্য়েও কোনো সুফল আসেনি। ট্যাক্স সংক্রান্ত তথ্যের দাবীও গোপনিয়তা রক্ষার নামে নাকচ হয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর কর্মকর্তা যদি ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি, ঘুষ দাবি বা বৈষম্যমূলক আচরণ করেন, তবে সেটি শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়, বরং আইনের শাসনেরও পরিপন্থী। এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তদন্তের দাবি
হিন্দু ব্যবসায়ী সংগঠনের কয়েকজন প্রতিনিধি মনে করেন, যদি সত্যিই কোনো কর্মকর্তা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেন, তবে তা সংবিধানের সমঅধিকারের নীতির পরিপন্থী।
অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়ীরই মত, বিষয়টি শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের নয়; বরং ভ্যাট ও কর প্রশাসনের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হয়রানি, অতিরিক্ত কড়াকড়ি এবং ঘুষের সংস্কৃতির সঙ্গেও এটি জড়িত হতে পারে। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে—তাদের বক্তব্যও সংগ্রহ করে একই প্রতিবেদনে যুক্ত করা উচিত। এতে প্রতিবেদনটি সাংবাদিকতার ভারসাম্য, ন্যায্যতা এবং আইনি নিরাপত্তা—সব দিক থেকেই আরও শক্তিশালী হবে।
