Headlines

ধর্মের অপব্যবহারে ধর্মের দোষ নেই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর প্রতীক ধ্বংস কেন? — বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বৈততার গভীর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি বিষয় কখনোই কেবল রাজনৈতিক ছিল না—একটি ধর্ম, অন্যটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একটি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত, অন্যটি একটি জাতির জন্মের ইতিহাস। এই দুটি বিষয় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার শক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, ক্ষমতার রাজনীতিতে এই দুই শক্তিকেই বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।

ধর্ম মানুষের আত্মিক বিশ্বাসের বিষয়। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অংশ। একটি বিশ্বাসের প্রতীক, অন্যটি জাতীয় ইতিহাসের প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুটি বিষয়কে ঘিরে যে আচরণ গড়ে উঠেছে, সেখানে একটি বড় ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার নতুন নয়

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কয়েক শতাব্দীর পুরোনো। বিশেষ করে উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পেছনে “দুই জাতি তত্ত্ব” ছিল প্রধান রাজনৈতিক ভিত্তি। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, একই ধর্ম অনুসরণ করলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার হয়। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।

এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র ভিত্তি ধর্ম হতে পারে না। ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সমতা এবং নাগরিক অধিকার—এসব  বরং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা

১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের আদর্শেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সংবিধানে “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” সংযোজন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি—এসব পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।

এর ফলে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নির্বাচনী প্রচারণা, রাজনৈতিক বক্তব্য, জনমত গঠন এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হয়েছে।

ধর্ম কি রাজনীতিতে ব্যবহার হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি গবেষণারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের ধর্মের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং প্রতিপক্ষকে ধর্মবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। কখনও মসজিদ, কখনও ওয়াজ মাহফিল, কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।

এটি শুধু বাংলাদেশের ঘটনা নয়। ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল—বিশ্বের বহু দেশেই ধর্ম রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে religious mobilization বলে অভিহিত করেন।

কিন্তু ধর্মের দোষ কি?

এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যখন কোনো ব্যক্তি ধর্মের নাম ব্যবহার করে দুর্নীতি করে, সহিংসতা করে, সন্ত্রাস করে কিংবা মানুষকে বিভক্ত করে, তখন সমাজের অধিকাংশ মানুষ একটি কথাই বলেন—

“ধর্মের কোনো দোষ নেই; দোষ সেই ব্যক্তির।”

এই যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ খুব কম। কারণ ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম কিংবা খ্রিস্টধর্ম—কোনোটিই দুর্নীতি, অন্যায় বা সহিংসতার শিক্ষা দেয় না। মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করতে পারে; কিন্তু ধর্ম মানুষকে অপরাধ করতে বলে না।

এই কারণেই একজন দুর্নীতিবাজ যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, তাহলে দুর্নীতির দায় ইসলামের ওপর বর্তায় না। একজন অপরাধী যদি ধর্মীয় পোশাক পরেন, তাহলেও অপরাধের দায় ধর্মের নয়।

তাহলে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে ভিন্ন বিচার কেন?

এই প্রশ্নটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বগুলোর একটি।

যদি কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে দুর্নীতি করে থাকে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকে কিংবা জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করে থাকে, তাহলে সেই অপরাধের বিচার হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। কিন্তু সেই অপরাধের দায় কি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ইতিহাসের ওপর বর্তাতে পারে?

রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে পূর্ববর্তী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

কিন্তু একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়।

যদি কোনো ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে অন্যায় করে থাকেন, তাহলে সেই ব্যক্তির বিচার হবে। কিন্তু কেন ইতিহাসের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের প্রতীক ধ্বংস করা হবে?

যদি ইসলামের অপব্যবহারের জন্য ইসলামকে দোষী না করা হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর নামের অপব্যবহারের জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রতীককে দোষী করার যুক্তি কোথায়?

প্রতীক ধ্বংস ইতিহাস বদলায় না

বিশ্ব ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণ করা হয়েছে কিংবা ইতিহাস নতুনভাবে লেখার চেষ্টা হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর অনেক জায়গায় লেনিনের মূর্তি সরানো হয়েছিল। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে দাসপ্রথার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তির ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও ইতিহাসবিদরা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন—প্রতীক অপসারণ ইতিহাসকে মুছে দেয় না। বরং ইতিহাসকে বুঝে, সমালোচনা করে এবং দলিলভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমেই একটি সমাজ পরিণত হয়।

বাংলাদেশেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

ব্যক্তি, দল ও ইতিহাস—তিনটি এক জিনিস নয়

বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম সমস্যা হলো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল এবং জাতীয় ইতিহাসকে প্রায়ই এক করে দেখা হয়।

কোনো রাজনৈতিক দল যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে, তার অর্থ এই নয় যে সেই দলের প্রতিটি কাজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে।

আবার কোনো ব্যক্তি যদি ইসলামের কথা বলে, তার অর্থ এই নয় যে তার প্রতিটি কাজ ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী।

এই পার্থক্যটি আমরা যতদিন না বুঝব, ততদিন দ্বৈত মানদণ্ড চলতেই থাকবে।

বিচার হওয়া উচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের

একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হয় অপরাধীর, প্রতীকের নয়।

কোনো দুর্নীতিবাজ যদি জাতীয় পতাকা হাতে ছবি তোলেন, তাহলে পতাকা অপরাধী হয়ে যায় না।

কোনো সন্ত্রাসী যদি ধর্মের নাম নেয়, তাহলে ধর্ম সন্ত্রাসী হয়ে যায় না।

কোনো দুর্নীতিবাজ যদি বঙ্গবন্ধুর ছবি অফিসে টাঙিয়ে রাখেন, তাহলে বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির প্রতীক হয়ে যান না।

এই সহজ নৈতিক নীতিটি যদি আমরা সমানভাবে প্রয়োগ করতে না পারি, তাহলে বিচার নয়, প্রতিশোধই রাজনীতির নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি নয়; বরং ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সমান মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।

একই ঘটনার ক্ষেত্রে এক রকম বিচার এবং অন্য ঘটনার ক্ষেত্রে অন্য রকম বিচার একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ব্যক্তি, দল, ধর্ম এবং ইতিহাস—সবকিছুর ক্ষেত্রে একই নৈতিক নীতি প্রয়োগ করা হয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে ধর্মকে যেমন রাজনৈতিক অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতে হবে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুকেও দলীয় প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনো ধর্ম, কোনো জাতীয় ইতিহাস বা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

কারণ সভ্য সমাজের মূলনীতি একটিই—অপরাধীর বিচার হবে, কিন্তু আদর্শ, ইতিহাস কিংবা বিশ্বাসের নয়।