Headlines

ক্যাশ-আউট ফিতে বাংলাদেশ কোথায়, অন্য দেশে কত?

ক্যাশ আউট

বিকাশে সাধারণ এজেন্টে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা; কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় অঙ্কভেদে বদলায় ফি।মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে টাকা পাঠানো এখন যতটা সহজ, সেই টাকা নগদে হাতে নেওয়ার খরচও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিকাশের সাধারণ এজেন্ট থেকে ক্যাশ-আউটে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা, অর্থাৎ ১.৮৫ শতাংশ চার্জ দিতে হয়। নির্দিষ্ট ‘প্রিয় এজেন্ট’-এর ক্ষেত্রে মাসে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যাশ-আউটে হার কম— প্রতি হাজারে ১৩ টাকা ৯৫ পয়সা। তবে বিষয়টিকে গ্রাহকরা ঝামেলা এবং “বুঝ দেওয়া” মনে করে।

ক্যাশ আউট
কয়কটি উন্নয়নশীল দেশে ক্যাশ আউটের তুলনামূলক হার।

কিন্তু বিশ্বের অন্য বড় মোবাইল-মানি বাজারে একই অঙ্কের টাকা নগদ করতে গ্রাহকের খরচের কাঠামো কেমন?

তুলনাটি বলছে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত শতাংশভিত্তিক মডেলের পাশাপাশি আফ্রিকার কয়েকটি বড় বাজারে অঙ্কভিত্তিক বা tiered tariff চালু আছে। অর্থাৎ গ্রাহক কত টাকা তুলছেন, তার ওপর ফি বদলে যায়।

কেনিয়ায় অঙ্ক অনুযায়ী ফি

কেনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত মোবাইল-মানি সেবা M-Pesa। এর বর্তমান ট্যারিফেও ক্যাশ withdrawal-এর জন্য বিভিন্ন অঙ্কের আলাদা চার্জ কাঠামো রয়েছে। Safaricom-এর ৪ আগস্ট ২০২৬-এ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, M-Pesa এজেন্ট থেকে ক্যাশ উত্তোলনের সর্বনিম্ন পরিমাণ KES 50 এবং withdrawal fee amount slab অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

অর্থাৎ সেখানে মূল ধারণাটি হলো— যত টাকা তুলছেন, তার ওপর নির্ভর করবে ফি কত হবে।

এটি বাংলাদেশের সরল ১.৮৫ শতাংশ মডেলের চেয়ে আলাদা।

তানজানিয়ায় ফি ও সরকারি লেভি আলাদা

তানজানিয়ার Vodacom M-Pesa-তেও ক্যাশ-আউটের ক্ষেত্রে অঙ্কভিত্তিক ফি রয়েছে। তাদের প্রকাশিত ট্যারিফে ‘Transaction Fee’, ‘Government Levy’ এবং ‘Total Cost’ আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ একজন গ্রাহক যে মোট অর্থটি দিচ্ছেন, সেটি শুধু মোবাইল-মানি প্রতিষ্ঠানের ফি নয়; সরকারি levy-ও হিসাবের মধ্যে রয়েছে।

এই কাঠামোটি গ্রাহকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতা তৈরি করে— কোন অংশ সেবার ফি এবং কোন অংশ সরকারি কর/লেভি, তা আলাদাভাবে বোঝা যায়।

উগান্ডায় আরও স্পষ্ট tiered model

উগান্ডার Airtel Money-এর বর্তমান প্রকাশিত withdrawal tariff আরও স্পষ্টভাবে amount slab অনুসরণ করে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—

  • ০–২,৫০০ UGX তুললে এজেন্ট ফি ৩৩০ UGX
  • ২,৫০১–৫,০০০ UGX তুললে ৪৪০ UGX
  • ৫,০০১–১৫,০০০ UGX তুললে ৭০০ UGX
  • ১৫,০০১–৩০,০০০ UGX তুললে ৮৮০ UGX
  • ৩০,০০১–৪৫,০০০ UGX তুললে ১,২১০ UGX
  • ৪৫,০০১–৬০,০০০ UGX তুললে ১,৫০০ UGX
  • ৬০,০০১–১,২৫,০০০ UGX তুললে ১,৯২৫ UGX
  • ১,২৫,০০১–২,৫০,০০০ UGX তুললে ৩,৫৭৫ UGX

এর পাশাপাশি tax amount-ও আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, ফি সরাসরি একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে কাটা হচ্ছে না।

তাহলে বাংলাদেশের ১.৮৫% কি বেশি?

শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল’ বলা যাবে না। তবে সহজ কথায়— “বেশী”।

কারণ বিভিন্ন দেশে মুদ্রার মূল্য, এজেন্ট কমিশন, কর, বাজারের আকার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং মোবাইল-মানি ব্যবস্থার খরচ আলাদা।

তবে তুলনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

বাংলাদেশে কি ক্যাশ-আউটের পরিমাণ অনুযায়ী আরও নমনীয় ফি কাঠামো করা সম্ভব, করা দরকার?

কারণ শতাংশভিত্তিক মডেলে ১ হাজার টাকা তুললেও একই হারে, ৫০ হাজার টাকা তুললেও একই হারে ফি বাড়ে। বিপরীতে tiered model-এ বড় অঙ্কের জন্য কার্যকর ফি-হার কমে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

ছোট অঙ্কের গ্রাহকের হিসাব

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তবতা।

একজন শ্রমিক হয়তো একবারে ২০ হাজার টাকা তুলবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী ১ হাজার, ২ হাজার বা ৩ হাজার টাকা করে কয়েকবার তুলতে পারেন।

প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা করে দিতে দিতে মাস শেষে মোট ক্যাশ-আউট ফি কত দাঁড়াচ্ছে— তিনি হয়তো সেই হিসাব আলাদাভাবে রাখেন না।

কিন্তু একই ব্যক্তি যদি মাসে মোট ২০ হাজার টাকা ক্যাশ-আউট করেন, সাধারণ হারে তার খরচ হয় ৩৭০ টাকা

বছরে একই পরিমাণ লেনদেন হলে ক্যাশ-আউট ফি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৪০ টাকা

অর্থাৎ ‘প্রতি হাজারে মাত্র ১৮ টাকা ৫০ পয়সা’— বছরের হিসাবে সেটি আর খুব ছোট অঙ্ক থাকে না।

ক্যাশ-আউট ফি কি ভোক্তা ন্যায্যতার প্রশ্ন?

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি— ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষকে সহজে অর্থ লেনদেনের সুযোগ দেওয়া।

কিন্তু যদি ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে টাকা থাকা সত্ত্বেও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নগদ করতে বারবার ফি দিতে হয়, তাহলে সেই খরচও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন মানুষ যত কম আয় করেন, তার লেনদেনের খরচ কি তত কম হওয়া উচিত নয়?

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলছে?

কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডার উদাহরণ দেখাচ্ছে, মোবাইল-মানি খাতে ক্যাশ-আউটের জন্য একাধিক pricing model সম্ভব।

কোথাও amount-based tariff, কোথাও fee ও government levy আলাদা, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সীমা অনুযায়ী আলাদা হার।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বিকাশের সাধারণ ক্যাশ-আউট কাঠামো তুলনামূলকভাবে সরল— প্রতি হাজারে ১৮.৫০ টাকা; নির্দিষ্ট প্রিয় এজেন্টে ১৩.৯৫ টাকা।

সুতরাং প্রশ্নটি ‘বিকাশ বেশি নিচ্ছে কি না’— এমন সরল অভিযোগে সীমাবদ্ধ না রেখে কোন pricing model গ্রাহকের জন্য বেশি ন্যায্য, সেটি নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

সামনে যে প্রশ্নগুলো

ক্যাশ-আউট ফি নিয়ে নীতিনির্ধারক, MFS প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা—তিন পক্ষের কাছেই কয়েকটি প্রশ্ন রাখা যায়:

১. বড় অঙ্কের ক্যাশ-আউটে কি কার্যকর ফি কমানো যায়?

২. নিম্নআয়ের ও ক্ষুদ্র লেনদেনকারীদের জন্য আলাদা কম-ফি কাঠামো করা সম্ভব কি?

৩. ক্যাশ-আউট ফি থেকে এজেন্ট, MFS প্রতিষ্ঠান ও সরকার—কে কত পায়?

৪. গ্রাহকের দেওয়া মোট ফি-র উপাদানগুলো কি আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা উচিত?

৫. বাংলাদেশ কি Kenya, Tanzania বা Uganda-র মতো tiered withdrawal tariff বিবেচনা করতে পারে?

ক্যাশ-আউট ফি শুধু একটি লেনদেনের চার্জ নয়। এটি ডিজিটাল অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অর্থ ব্যবহারের বাস্তব খরচ।

বাংলাদেশে সাধারণ বিকাশ এজেন্টে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা দিতে হয়। অন্যদিকে আফ্রিকার কয়েকটি বড় মোবাইল-মানি বাজারে একই ধরনের সেবায় অঙ্কভিত্তিক ফি কাঠামো চালু রয়েছে।

তাই মূল প্রশ্নটি হতে পারে—

ডিজিটাল টাকা মানুষের হাতে পৌঁছেছে, কিন্তু সেই টাকা নগদে নিতে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে কি অন্যরকম একটি ‘ডিজিটাল টোল’ দিতে হচ্ছে?


হাতে হাতে বিকাশ, হিসাবটা আসলে কার পক্ষে?