Headlines

হিরো আলম ও সালমান মুক্তাদিরঃ কাজের ওজন একই হলেও একজন সাবঅলটার্ন অন্যজন এলিট কেন?

হিরো আলম

হিরো আলম ও সালমান মুক্তাদির— দু’জনের কাজের ধরন এক নয়, কিন্তু তাদের কিছু কাজের সামাজিক মূল্য বা মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। একইভাবে মানহীন, অগভীর বা গুরুত্বহীন কনটেন্ট করার পরও কেন একজনকে আমরা সাবঅলটার্ন হিসেবে দেখি, আর অন্যজনকে এলিট সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করি?

হিরো আলম
সালমান মুক্তাদির এবং হিরো আলম।

এখানে প্রশ্নটা হিরো আলম ভালো না সালমান মুক্তাদির ভালো— এটা নয়। প্রশ্নটা হলো, কাজের ওজন যদি একই হয়, তাহলে সামাজিক মূল্যায়নের ওজন আলাদা হয় কেন?

হিরো আলমের ক্ষেত্রে তার কনটেন্টের সঙ্গে সঙ্গে তার ভাষা, পোশাক, উচ্চারণ, চেহারা, সামাজিক অবস্থান— সবকিছুই যেন বিচারের অংশ হয়ে যায়। তার কোনো কাজকে শুধু ‘মানহীন’ বলা হয় না; অনেক সময় সেই কাজের সঙ্গে তার সামাজিক পরিচয়ও জুড়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে সালমান মুক্তাদিরের কোনো মানহীন বা অগভীর কাজকে অনেক সময় একইভাবে দেখা হয় না। সেখানে সেটি ‘এন্টারটেইনমেন্ট’, ‘এজডি’, ‘কনট্রোভার্সিয়াল’ কিংবা তরুণদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে জায়গা পেয়ে যেতে পারে।

কেন?

কারণ কনটেন্টের মান আর কনটেন্ট নির্মাতার সামাজিক অবস্থান— দু’টোকে আমরা সবসময় আলাদা করে দেখি না।

একজন কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে কথা বলে, কী পোশাক পরে, কী ভাষা ব্যবহার করে, কার সঙ্গে ওঠাবসা করে, কোন সামাজিক বৃত্তে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে— এসবও তার কনটেন্টের সামাজিক মূল্য নির্ধারণে কাজ করে।

এখানেই সাংস্কৃতিক পুঁজির প্রশ্ন আসে।

একজন মানুষ একই ধরনের কাজ করলে সেটি ‘নিচুরুচি’ হতে পারে, আবার অন্যজন করলে সেটি ‘অন্যরকম’ বা ‘এজডি’ হয়ে যেতে পারে। পার্থক্যটা তখন কনটেন্টে নয়; পার্থক্যটা কনটেন্ট নির্মাতার সামাজিক পরিচয়ে।

হিরো আলমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— তিনি এমন একটি জায়গা থেকে উঠে এসেছেন, যে জায়গাকে বাংলাদেশের তথাকথিত ভদ্র বা এলিট সাংস্কৃতিক পরিসর ঐতিহাসিকভাবে খুব বেশি জায়গা দেয়নি। অথচ তিনি সেই জায়গায় ঢুকেছেন। গান করেছেন, অভিনয় করেছেন, নির্বাচন করেছেন, নিজেকে বারবার দৃশ্যমান করেছেন।

ফলে তার উপস্থিতিই অনেকের কাছে অস্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এখানে ‘সাবঅলটার্ন’ শব্দটির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। সাবঅলটার্ন মানে শুধু দরিদ্র নয়। ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক বৈধতার কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষও সাবঅলটার্ন হতে পারেন।

হিরো আলম জনপ্রিয়। তার দর্শক আছে। তার দৃশ্যমানতা আছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর সাংস্কৃতিক বৈধতা এক জিনিস নয়।

অন্যদিকে, কেউ যদি শহুরে মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির ভাষা, পোশাক, রুচি ও সামাজিক কোডের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হন, তাহলে তার একই ধরনের কাজও অন্যভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।

এখানেই আসল বৈপরীত্য।

একই মানহীনতা— কিন্তু দুই রকম সামাজিক প্রতিক্রিয়া।

একজনের কাজকে বলা হয় ‘আজেবাজে’।

অন্যজনের কাজকে বলা হয় ‘কনটেন্ট’।

একজনকে দেখে হাসা হয়।

অন্যজনকে নিয়ে আলোচনা হয়।

একজনকে বলা হয় ‘সামাজিক সমস্যা’।

অন্যজনকে বলা হয় ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’।

তাহলে প্রশ্নটা হিরো আলম বনাম সালমান মুক্তাদির নয়।

প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের নিয়ে।

আমরা কি সত্যিই কনটেন্ট বিচার করি?

নাকি কনটেন্টের আগে বিচার করি— কে কনটেন্টটি করেছে?

ইন্টারনেট সবাইকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সবাইকে সমান সামাজিক মর্যাদা দেয়নি।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দৃশ্যমানতার বৈষম্য কিছুটা ভেঙেছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক বৈধতার বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে।

হিরো আলম ও সালমান মুক্তাদিরকে পাশাপাশি রাখলে তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—

কাজের ওজন যদি একই হয়, তাহলে একজন সাবঅলটার্ন আর অন্যজন এলিট হয় কীভাবে?

সম্ভবত উত্তরটা কনটেন্টের মধ্যে নেই।

উত্তরটা আছে আমাদের সমাজের চোখে।