নিজস্ব প্রতিবেদক
রংপুরের আলোচিত চার খুনের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বয়ান এবং আদালতে আসামিদের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির মধ্যে সামঞ্জস্যের বিষয়টি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে— পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, সেটি আগে নাকি আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি আগে?
এই সময়ক্রমের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো আসামির আদালত-প্রদত্ত জবানবন্দি যদি পুলিশের প্রকাশিত ঘটনার বিবরণের পরে দেওয়া হয়ে থাকে এবং সেই জবানবন্দির সঙ্গে আগের পুলিশি বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সেই মিলকে স্বাধীনভাবে পুলিশের বয়ানের সত্যতা নিশ্চিতকারী প্রমাণ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ২৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে চার খুনের বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তুলে ধরেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই যুবকের সঙ্গে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পরবর্তীতে দুই আসামির আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির প্রসঙ্গে ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, তাদের বক্তব্য কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মূলত মিলে গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জবানবন্দিতে কিছু অতিরিক্ত তথ্যও এসেছে।
এখানেই তদন্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসেঃ
আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ঠিক কখন রেকর্ড করা হয়েছিল?
যদি কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন আগে হয়ে থাকে এবং তার পর আসামিদের জবানবন্দি রেকর্ড হয়ে থাকে, তাহলে জবানবন্দিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মিল থাকা বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে— তা তদন্তকারীদের স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
‘স্বাধীন corroboration’ নিয়ে প্রশ্ন
আইনগতভাবে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একাই কোনো ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করে না। জবানবন্দির বক্তব্যকে অন্যান্য বস্তুগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যদি পুলিশ আগে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বয়ান জনসমক্ষে প্রকাশ করে থাকে, তাহলে পরে আসামির বক্তব্যে একই বয়ান পাওয়া গেলে প্রশ্ন উঠতে পারে— আসামি কি নিজস্ব জ্ঞান থেকে তথ্য দিয়েছে, নাকি আগে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে তার বক্তব্যের কোনো প্রভাব বা সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে?
এটি কোনো আসামির জবানবন্দি মিথ্যা— এমন দাবি নয়। বরং জবানবন্দির স্বাধীনতা ও প্রমাণমূল্য যাচাইয়ের জন্য একটি মৌলিক অনুসন্ধানী প্রশ্ন।
তদন্তে যে নথি দুটি পাশাপাশি রাখা প্রয়োজন
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তকারীদের সামনে অন্তত দুটি নথি পাশাপাশি রাখা প্রয়োজন—
১. ২৩ আগস্ট পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনের সম্পূর্ণ ভিডিও/অডিও ও লিখিত বক্তব্য।
২. আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ আদালত নথি, যেখানে জবানবন্দি রেকর্ডের তারিখ ও সময় রয়েছে।
এরপর দুটির বক্তব্য শব্দ, ঘটনা, মোটিভ, সময়, স্থান ও ভূমিকার ভিত্তিতে তুলনা করা প্রয়োজন।
শুধু ‘মিলেছে’ বলা যথেষ্ট নয়। কোন তথ্য কমিশনার আগে প্রকাশ করেছিলেন এবং কোন তথ্য আসামি পরে প্রথমবার আদালতে বলেছে— এটি আলাদা করতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, আসামিদের জবানবন্দি কমিশনারের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—
জবানবন্দি রেকর্ড হওয়ার আগে পুলিশ ঠিক কী কী তথ্য জানত?
আর সেই তথ্যের কোন অংশ পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছিল?
যদি দেখা যায়, কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে হত্যার মোটিভ, ঘটনার ধরন, অভিযুক্তদের ভূমিকা কিংবা ঘটনাক্রমের এমন নির্দিষ্ট তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা হয়েছিল, যা পরে আসামির জবানবন্দিতেও প্রায় একইভাবে এসেছে, তাহলে তদন্তের স্বচ্ছতার স্বার্থে এই তথ্যের উৎস ও ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করা জরুরি।
তদন্তভার বদলও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে
চার খুনের মামলার তদন্ত পরবর্তীতে থানা পুলিশ থেকে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী। সনাতন চক্রবর্তী ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তদন্ত তদারকির সঙ্গে যুক্ত।
তদন্তভার পরিবর্তনের পর এখন নতুন তদন্ত দলের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে— প্রথম দিনের পুলিশি বক্তব্য থেকে শুরু করে আদালতে আসামিদের জবানবন্দি পর্যন্ত পুরো ঘটনাক্রমের একটি নিরপেক্ষ টাইমলাইন তৈরি করা।
জনগণের প্রশ্ন
চারজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফলে শুধু আসামিদের বক্তব্য বা পুলিশের বক্তব্য— কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—
পুলিশ প্রথমে কী বলেছিল?
কখন বলেছিল?
আসামিরা কখন ১৬৪ ধারায় বক্তব্য দিয়েছে?
তাদের বক্তব্যে নতুন কী ছিল?
আর কোন তথ্যটি পুলিশ আগে থেকেই জানত?
এই চারটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, আসামিদের জবানবন্দি পুলিশের প্রাথমিক বয়ানের স্বাধীন সমর্থন, নাকি আগে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যের একটি সামঞ্জস্য মাত্র।
চার খুনের তদন্তে তাই এখন শুধু ‘আসামিরা কী বলেছে’— এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—
“আসামিরা বলার আগেই পুলিশ কী বলেছিল?”
সেই সময়ক্রমই হয়তো তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
