শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে ঢাবি শিক্ষিকা মোনামির স্কোর ১.৫৯, পাঠদান-পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের দেওয়া বেনামি রিভিউতে শিক্ষিকা মোনামির পাঠদান, সময়ানুবর্তিতা, পেশাদারিত্ব, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে। প্রকাশিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাঁচের মধ্যে তার সামগ্রিক স্কোর ১.৫৯।
মূল্যায়নের বিভিন্ন সূচকে স্কোর তুলনামূলকভাবে কম হলেও শিক্ষার্থীদের লিখিত মন্তব্যে একই শিক্ষিকাকে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাও পাওয়া গেছে। কেউ তাকে বন্ধুসুলভ ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ পাঠদান ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কঠোর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মোদ্দাকথা শিক্ষকতার চেয়ে মাঠেঘাটে তার স্কোর ভালো।
কোন সূচকে কত স্কোর
| মূল্যায়নের বিষয় | স্কোর (৫-এর মধ্যে) |
|---|---|
| বিষয়বস্তু স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা | ১.৩৬ |
| সমালোচনামূলক ও স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহ | ১.৬০ |
| উদাহরণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে পাঠ বোঝানো | ১.৫২ |
| প্রশ্ন ও উন্মুক্ত আলোচনায় উৎসাহ | ২.০৪ |
| শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে পৌঁছানো ও সাড়া দেওয়া | ১.৭৬ |
| সম্মান ও ন্যায্য আচরণ | ১.৬৮ |
| গ্রেডিংয়ের মানদণ্ড স্পষ্ট, ন্যায্য ও স্বচ্ছ | ১.৬৮ |
| অ্যাসাইনমেন্ট/পরীক্ষার ফিডব্যাক | ১.৫৬ |
| সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মিত ক্লাস | ১.২০ |
| পেশাগত সততা ও আচরণ | ১.২৮ |
| অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে সুপারিশের সম্ভাবনা | ১.৪৪ |
| কোর্সের পাঠদানে সামগ্রিক সন্তুষ্টি | ১.৫২ |
সময়ানুবর্তিতা ও পেশাদারিত্বে সবচেয়ে কম স্কোর
মূল্যায়নের সবচেয়ে কম স্কোরগুলোর মধ্যে রয়েছে সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মিত ক্লাস নেওয়া— ১.২০ এবং পেশাগত সততা ও আচরণ— ১.২৮।
এ ছাড়া বিষয়বস্তু কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে স্কোর ১.৩৬ এবং শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষককে সুপারিশ করার ক্ষেত্রে স্কোর ১.৪৪।
অর্থাৎ, শুধু পাঠদানের মান নয়— ক্লাস পরিচালনা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত আচরণ নিয়েও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

লিখিত মন্তব্যে পরস্পরবিরোধী অভিজ্ঞতা
তবে সংখ্যাগত মূল্যায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের লিখিত মন্তব্যে ভিন্ন চিত্রও পাওয়া যায়।
একজন শিক্ষার্থী মোনামিকে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষিকা বন্ধুসুলভ এবং শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়। তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হলেও পাঠদানে ভালো কাজ করেন বলেও ওই শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন।
ওই শিক্ষার্থী একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষিকার উপস্থিতিকে তার শিক্ষকতা মূল্যায়নের ভিত্তি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয়— একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত পরিচয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড দিয়ে শ্রেণিকক্ষের সক্ষমতা বিচার করা উচিৎ নয়।
সারবস্তু— শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে তিনি মানোত্তীর্ণ শিক্ষক নন। অনেকে শিক্ষার্থী ফলোআপ নিউজকে বলেছেন, তিনি কোনোভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন।
পরীক্ষার সময়সূচি নিয়েও অভিযোগ
অন্য কয়েকটি বেনামি রিভিউতে মোনামির সময় ব্যবস্থাপনা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এক শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, তার ছাত্রজীবনে এমন অভিজ্ঞতার শিক্ষক তিনি আগে দেখেননি। ওই রিভিউতে পাঠদান দক্ষতা ও সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতির অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ মনে রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্য এক শিক্ষার্থী তাকে ‘সবচেয়ে খারাপ শিক্ষকদের একজন’ হিসেবে উল্লেখ করে সময় ব্যবস্থাপনা, পাঠদানের সক্ষমতা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, নির্ধারিত পরীক্ষার তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
একই রিভিউতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, শিক্ষিকাকে যারা তোষামোদ করেন তারা তুলনামূলক বেশি মনোযোগ ও ভালো নম্বর পান।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিরই স্বাধীন যাচাই ওই শিক্ষার্থীদের রিভিউতে নেই।
লেকচার পদ্ধতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
আরেক শিক্ষার্থী মোনামির শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে আরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, শিক্ষক ক্লাসে এসে মূলত নিজের তৈরি লেকচার পড়েন এবং লেকচারের কিছু অংশ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছ থেকে তৈরি করা।
এ ছাড়া সময়ানুবর্তিতা ও পেশাদারিত্ব নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। সাবেক প্রক্টরিয়াল টিমের দায়িত্ব থেকে সরে আসার পর পক্ষপাতিত্ব কমবে বলে আশা করা হলেও তা হয়নি— এমন মন্তব্যও ওই রিভিউতে রয়েছে।
তবে বেনামি রিভিউ মানেই চূড়ান্ত সত্য নয়
শিক্ষক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের মতামত শিক্ষকতার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বেনামি রিভিউকে এককভাবে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিশেষ করে পক্ষপাতিত্ব, নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম কিংবা পরীক্ষার তারিখ ভুলে যাওয়ার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট একাডেমিক নথি, ক্লাস রুটিন, পরীক্ষার সময়সূচি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক তথ্য দিয়ে যাচাই প্রয়োজন।
এখানেই শিক্ষক মূল্যায়নের প্রকৃত গুরুত্ব— শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা না করে অভিযোগগুলো যাচাই করা এবং একই সঙ্গে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অযাচাইকৃত ব্যক্তিগত অভিযোগকেও প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার না করা।
মোনামির ক্ষেত্রে প্রকাশিত মূল্যায়ন তাই দুটি প্রশ্ন সামনে এনেছে— শিক্ষার্থীদের দেওয়া ১.৫৯ স্কোরের কারণগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কতটা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করবে এবং বেনামি অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আছে কি না।
শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য যদি কেবল নম্বর দেওয়া না হয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন হয়, তাহলে এমন কম স্কোরের পেছনে থাকা কারণগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনাই হতে পারে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শিক্ষক মূল্যায়নের এ ধারা শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবাবে।
