Headlines

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুঃ সাংবাদিকদের কর্মজীবন, নিরাপত্তা ও অবসর-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন

পুলক চ্যাটর্জি

চাকরি শেষ হলে একজন সাংবাদিকের প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়? শিল্পগোষ্ঠীর সংবাদমাধ্যম কি স্বাধীন সাংবাদিকতা চায়, নাকি নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়াতে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে? রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সাংবাদিকের অবস্থানই বা কী?

ফলোআপ নিউজ ডেস্ক

সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি তাকে অব্যাহতি দেয়। সেই চিঠি যখন বরিশাল অফিসে পৌঁছায়, আমি সেখানে ছিলাম।

পুলকদার বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, কাজের গতি এবং প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। কাজের গতি বাড়ানোর জন্য তাকে আগেও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ার পর তার জীবনের যে অধ্যায় শুরু হয়, সেটিই আজকের বড় প্রশ্ন।

অব্যাহতির পরদিন পুলকদা আমাকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন—এই বয়সে আর কোথাও সময় কাটানোর জায়গা নেই। শারীরিক ব্যথা-বেদনা নিয়ে বাসায় শুয়ে-বসে দিন কাটালে জীবন আরও অসহ্য হয়ে উঠবে। চাকরি না থাকলেও আগের নিয়মে অফিসে আসতে চান। শুধু বিষয়টি যেন ঢাকায় জানানো না হয়।

আমি তাকে বলেছিলাম—

“সমকালে চাকরি থাকুক বা না থাকুক, বরিশাল অফিস তো আপনারই।”

তিনি কথাটি বিশ্বাস করেছিলেন।

চাকরি না থাকলেও দুপুরে অফিসে আসতেন। রাত পর্যন্ত থাকতেন। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। দীর্ঘ সময় পত্রিকা পড়তেন।

তার বড় চেয়ারটিতে অন্যরা বসতেন না।

অফিস সহকারী দীপকদা আগের মতোই তার জন্য চা বানাতেন।

অর্থাৎ চাকরি শেষ হয়েছিল, কিন্তু সম্পর্কটি শেষ হয়নি।

বরিশালের সমকাল অফিসটি তার কাছে ধীরে ধীরে একটি কর্মস্থল থেকে আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল।

আজ সেই অফিসেই তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করেছে। ঘটনাস্থল থেকে একাধিক চিঠি পাওয়ার কথা জানা গেছে। একটি স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে; অন্যগুলো প্রেস ক্লাব, পুলিশ, সুমন চৌধুরী ও দীপকদার উদ্দেশে।

চিরকুটে শারীরিক অসুস্থতার যন্ত্রণা ও অবসাদের কথা উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।

সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লেখা চিঠিতে সমকালের কাছে তার পাওনা স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ ছিল বলেও জানা গেছে।

এই পাওনা বেতন বা ভাতা বাবদ নয়। দীর্ঘ ১৮ বছরের চাকরিজীবনের গ্র্যাচুইটি ও অর্জিত ছুটি নগদায়নের অর্থ পাওনা থাকার কথা জানা যাচ্ছে।

সহকমীর স্মৃতিচারণ, Facebook থেকে নেওয়া।

সাংবাদিক
বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে অবস্থিত দৈনিক সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর এবং তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।

এই তথ্যগুলো অবশ্যই নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় আরও বড় প্রশ্ন

একজন সাংবাদিকের চাকরি শেষ হলে তার জীবনও কি শেষ?

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার সবচেয়ে কম আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সাংবাদিকের চাকরি-পরবর্তী জীবন। তরুণ বয়সে একজন রিপোর্টারকে আমরা দেখি ছুটছেন। রাত-বিরাতে ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতি, দুর্নীতি, অপরাধ, মানুষের দুর্ভোগ— সবকিছুর খবর করছেন। তিনি অন্যের অধিকার নিয়ে লিখছেন। অন্যের বেতন না পাওয়ার খবর করছেন। অন্যের চাকরি চলে যাওয়ার খবর করছেন। অন্যের চিকিৎসার টাকা না থাকার খবর করছেন। অন্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ? ২০-৩০ বছর পর তার কী হবে? শারীরিক সক্ষমতা কমে গেলে কী হবে? প্রযুক্তি বদলে গেলে কী হবে? প্রতিষ্ঠান যদি তাঁকে আর প্রয়োজনীয় মনে না করে? তখন তার সামনে কী থাকবে?

যে মানুষগুলো সুন্দর সমাজের স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছিলেন

সাংবাদিকতায় আসা মানুষের বড় একটি অংশ এই পেশা বেছে নেন কেবল অর্থের জন্য নয়।

তারা বিশ্বাস করেন— সত্য প্রকাশ করা দরকার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা দরকার, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো দরকার, ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা দরকার, সমাজকে আরও মানবিক করা দরকার।

কেউ আত্মসম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান বলেই সাংবাদিকতা বেছে নেন।

কেউ মনে করেন, একটি ভালো প্রতিবেদন হয়তো একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

কেউ মনে করেন, একটি দুর্নীতি প্রকাশ পেলে কোটি টাকার অপচয় বন্ধ হতে পারে।

কেউ মনে করেন, একটি নির্যাতিত পরিবারের কণ্ঠস্বর হওয়াও সমাজের জন্য দায়িত্ব।

কিন্তু কয়েক দশক পর সেই সাংবাদিকই যখন অর্থকষ্ট, অসুস্থতা, একাকীত্ব ও মানুষের অবহেলার মধ্যে পড়ে যান, তখন প্রশ্ন ওঠে—

যে সমাজের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি জীবন কাটালেন, সেই সমাজ তার নিজের আত্মমর্যাদার জন্য কী করল?

পুলকদার মৃত্যু কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

কোনো সাংবাদিক আত্মহত্যা করলেই তার কারণ সাংবাদিকতা— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া দায়িত্বশীল নয়। প্রতিটি মৃত্যুর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, স্বাস্থ্যগত ও আর্থিক প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তবে বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের একাধিক আত্মহত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে ২০২২ সালে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নয়টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে পাঁচটিকে পুলিশ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

২০২৪ সালে সাংবাদিক সীমান্ত খোকনের মৃত্যুকে পুলিশ আত্মহত্যা হিসেবে জানিয়েছিল।

২০২৫ সালে গণমাধ্যমকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়।

এগুলোকে একসঙ্গে এনে ‘সাংবাদিকরা আত্মহত্যাপ্রবণ’ বলা ভুল।

কিন্তু ঘটনাগুলো একটি প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ দেয়—

সাংবাদিকের নাম সর্বশেষ কর্মস্থল ও পদবি মৃত্যুর সময় মৃত্যুর স্থান ও পরিস্থিতি
পুলক চ্যাটার্জি ব্যুরো প্রধান, দৈনিক সমকাল (বরিশাল); সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বরিশাল প্রেস ক্লাব। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে অবস্থিত দৈনিক সমকালের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বিভুরঞ্জন সরকার জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা; প্রবীণ কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ২২ আগস্ট, ২০extended৫ ঢাকার বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় মেঘনা নদী থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজের আগে তিনি “জীবনের শেষ লেখা” শিরোনামে একটি আক্ষেপ জড়ানো খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
মোঃ আসাদুজ্জামান তুহিন গাজীপুর স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ ৭ আগস্ট, ২০২৫ গাজীপুরে স্থানীয় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় নির্মমভাবে খুন হন।
খন্দকার শাহ আলম সাংবাদিক, দৈনিক মাতৃজগত (নবীনগর) ২৫ জুন, ২০২৫ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে তার একটি পূর্ববর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রতিশোধ হিসেবে এক অপরাধী চক্রের টার্গেটেড ও সহিংস হামলার শিকার হয়ে তিনি প্রাণ হারান।
প্রদীপ কুমার ভৌমিক সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি, দৈনিক খবরপত্র আগস্ট, ২০২৪ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের সময় মাঠপর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যান।
তাহির জামান প্রিয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পেশাদার আলোকচিত্রী। জুলাই/আগস্ট, ২০২৪ ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সংঘাতের সময় ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় ছবি তোলার সময় গুলিতে নিহত হন।

এছাড়াও ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট খুলনায় রূপসা সেতু থেকে লাফিয়ে পড়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ওয়াহেদ-উজ-জামান বুলু আত্মহত্যা করেছিলেন

৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগী (৩৫) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তিনি ব্যবসার পাশাপাশি একটি স্থানীয় সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত ছিলেন।

২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর সোবহানবাগের একটি বাসা থেকে ২৮ বছর বয়সী নারী সাংবাদিক স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নতুন চালু হওয়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর জুনিয়র গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট রাতে গাজী টিভির (জিটিভি) নিউজরুম এডিটর ৩২ বছর বয়সী সারা রাহনুমার মরদেহ ঢাকার হাতিরঝিল লেক থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়

এগুলো মাত্র কয়েকটি উদাহরণ। পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়। প্রশ্ন ওঠে— সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

বিভুরঞ্জন সরকার
প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।

শিল্পগোষ্ঠী কি সাংবাদিকতা চায়, নাকি নিজেদের ক্ষমতা?

বাংলাদেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী ও তাদের সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যম

বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় ব্যবসায়িক ও শিল্পগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন ও রেডিওসহ একাধিক গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। Centre for Governance Studies (CGS)-এর ‘Who Owns the Media in Bangladesh?’ গবেষণায় ৪৮টি নির্বাচিত গণমাধ্যমের মালিকানার সঙ্গে ৩২টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক চিহ্নিত করা হয়েছিল।

শিল্প/ব্যবসায়িক গোষ্ঠী গণমাধ্যম মাধ্যম
বসুন্ধরা গ্রুপ বাংলাদেশ প্রতিদিন দৈনিক
বসুন্ধরা গ্রুপ কালের কণ্ঠ দৈনিক
বসুন্ধরা গ্রুপ The Daily Sun দৈনিক
বসুন্ধরা গ্রুপ News24 টেলিভিশন
বসুন্ধরা গ্রুপ Banglanews24.com অনলাইন
বসুন্ধরা গ্রুপ Radio Capital রেডিও
ট্রান্সকম গ্রুপ প্রথম আলো দৈনিক
ট্রান্সকম গ্রুপ The Daily Star দৈনিক
ট্রান্সকম গ্রুপ ABC Radio রেডিও
হা-মীম গ্রুপ সমকাল দৈনিক
হা-মীম গ্রুপ Channel 24 টেলিভিশন
জামুনা গ্রুপ যুগান্তর দৈনিক
জামুনা গ্রুপ Jamuna TV টেলিভিশন
বেক্সিমকো গ্রুপ The Independent দৈনিক
বেক্সিমকো গ্রুপ Independent Television টেলিভিশন
সিটি গ্রুপ Somoy TV টেলিভিশন
বেঙ্গল গ্রুপ RTV টেলিভিশন
গাজী গ্রুপ GTV টেলিভিশন
গাজী গ্রুপ Sarabangla.net অনলাইন
জেমকন গ্রুপ Dhaka Tribune দৈনিক
জেমকন গ্রুপ Bangla Tribune অনলাইন
গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার জনকণ্ঠ দৈনিক
এইচআরসি গ্রুপ The New Age দৈনিক
এইচআরসি গ্রুপ যায়যায়দিন দৈনিক
ইমপ্রেস গ্রুপ Channel i টেলিভিশন
ইমপ্রেস গ্রুপ Radio Bhumi রেডিও
কর্ণফুলী গ্রুপ Desh TV টেলিভিশন
কর্ণফুলী গ্রুপ ভোরের কাগজ দৈনিক

নোট: এটি বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা বর্তমান মালিকানার সরকারি তালিকা নয়। বিভিন্ন সময় মালিকানা ও করপোরেট কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিকানা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন, শেয়ারহোল্ডিং, সরকারি নথি ও সাম্প্রতিক তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

মালিকানা কাঠামো যে প্রশ্নটি সামনে আনে

একজন সাংবাদিকের কাছে সংবাদমাধ্যম কেবল চাকরির জায়গা নয়; এটি তার দীর্ঘ কর্মজীবন, সামাজিক পরিচয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু যখন সংবাদমাধ্যমের মালিকানা বড় শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—

শিল্পগোষ্ঠী কি সাংবাদিকতা চায়, নাকি সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চায়?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একজন সাংবাদিক যখন ২০–৩০ বছর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন, তখন বয়স, অসুস্থতা বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে তিনি কর্মক্ষমতা হারালে সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়?

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

একজন সাংবাদিকের কর্মজীবনের মূল্য কি শুধু যতদিন তিনি দ্রুত সংবাদ লিখতে পারেন ততদিন? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে তার আর্থিক নিরাপত্তা, প্রাপ্য পাওনা, মর্যাদা এবং অবসর-পরবর্তী জীবনের প্রতিও প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায় থাকা উচিত?

এই প্রশ্ন শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের নয়। এটি বাংলাদেশের পুরো গণমাধ্যম শিল্পের মালিকানা, শ্রমনীতি এবং সাংবাদিকদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন।

এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর একটি।

বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ ছাড়া আধুনিক গণমাধ্যম চালানো কঠিন। মূলধন সংবাদমাধ্যমকে প্রযুক্তি, জনবল ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুযোগ দিতে পারে।

কিন্তু মালিকানা যখন বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই—

শিল্পগোষ্ঠী সংবাদমাধ্যম তৈরি করছে সাংবাদিকতার জন্য, নাকি সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে?

একজন শিল্পগোষ্ঠীর মালিকের ব্যবসা থাকতে পারে, ব্যাংক থাকতে পারে, কারখানা থাকতে পারে, সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকতে পারে, রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকতে পারে।

তারপর তার হাতে যদি সংবাদমাধ্যমও থাকে, তাহলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শুরু হয়।

প্রশ্ন হলো—

মালিকের ব্যবসার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে কি?

মালিকের কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক নির্যাতিত হলে?

মালিকের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশগত অভিযোগ উঠলে?

কর বা ভ্যাট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে?

ব্যাংকঋণ নিয়ে বিতর্ক হলে?

সরকারের সঙ্গে মালিকের কোনো স্বার্থের সংঘাত হলে?

সেই সংবাদ কি একই স্বাধীনতায় প্রকাশিত হবে?

যদি হয়— সেটি সাংবাদিকতার শক্তি।

যদি না হয়— তাহলে সংবাদমাধ্যম ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষমতার অবকাঠামোতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

একটি সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন, তা বোঝার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো—

সে নিজের মালিককে কতটা প্রশ্ন করতে পারে।

অন্যের দুর্নীতি প্রকাশ করা সহজ।

অন্যের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে লেখা সহজ।

অন্যের ব্যবসার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করা সহজ।

কিন্তু মালিকের নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করা?

সেখানেই প্রকৃত সম্পাদকীয় স্বাধীনতার পরীক্ষা।

কারণ সাংবাদিকতার কাজ কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ক্ষমতা রক্ষা করা নয়।

সাংবাদিকতার কাজ হলো—

জনস্বার্থে ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

সাংবাদিকের ওপর দায়িত্ব অনেক, কিন্তু সাংবাদিকের প্রতি দায়িত্ব কার?

একজন সাংবাদিককে বলা হয় নিরপেক্ষ হতে, সত্য বলতে, তথ্য যাচাই করতে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে এবং জনস্বার্থ রক্ষা করতে।

কিন্তু সাংবাদিকের নিজের অধিকার?

ন্যায্য বেতন?

চাকরির নিরাপত্তা?

গ্র্যাচুইটি?

প্রভিডেন্ট ফান্ড?

অর্জিত ছুটির অর্থ?

স্বাস্থ্যসেবা?

বীমা?

অবসরকালীন নিরাপত্তা?

পুনর্বাসন?

দক্ষতা পরিবর্তনের প্রশিক্ষণ?

মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা?

এসব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কতটা আলোচনা হয়?

পুলক চ্যাটার্জির ঘটনা সেই আলোচনাটিই সামনে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে একজন সাংবাদিকের ক্যারিয়ার যেন অনেক সময় একটি সরল রেখা—

রিপোর্টার → সিনিয়র রিপোর্টার → ব্যুরো প্রধান → একদিন অব্যাহতি।

কিন্তু কেন একজন প্রবীণ সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা অন্যভাবে ব্যবহার করা হবে না?

তিনি হতে পারেন মেন্টর, রিসার্চার, আর্কাইভ সম্পাদক, কলামিস্ট, ট্রেনার বা পরামর্শক।

একজন ২৫ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে শুধু বয়সের কারণে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বানিয়ে দেওয়া আসলে সংবাদমাধ্যমের নিজেরই ক্ষতি।

পুলক চ্যাটর্জি

এই রাষ্ট্রব্যবস্থা কি সাংবাদিকদের সুহৃদ ভাবে?

আরেকটি বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রের দিকে।

সাংবাদিক যখন দুর্নীতির খবর করেন, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ তাকে সহযোগী নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

তথ্য চাইলে বিরক্তি।

প্রশ্ন করলে অসন্তোষ।

ক্যামেরা দেখলে আপত্তি।

জবাবদিহি চাইলে সাংবাদিকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন।

অথচ রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন স্বাধীন সাংবাদিকতার।

কারণ সাংবাদিক না থাকলে জনগণ জানবে কীভাবে—

সরকারি টাকা কোথায় যাচ্ছে?

কোথায় প্রকল্পের অনিয়ম?

কোথায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা?

কোথায় নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে?

কোথায় দুর্নীতি?

কোথায় ক্ষমতার অপব্যবহার?

সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন।

তার কাজ রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়।

তার কাজ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।

সাংবাদিক
সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির লেখা সুইসাইড নোটগুলো।

রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ— সব জায়গায় যদি দুর্বৃত্তায়ন বাড়ে?

তাহলে সৎ মানুষের জন্য জায়গা আরও সংকুচিত হয় সাংবাদিকের হাতে বড় অর্থ নেই। প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই।

তার একমাত্র শক্তি—

তথ্য এবং তা প্রকাশ করার সাহস।

ক্ষমতা যখন অর্থ, রাজনীতি, ব্যবসা ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে, তখন সেই শক্তির সামনে দাঁড়ানো সাংবাদিক আরও দুর্বল হয়ে পড়েন।

আর সমাজও যদি তাকে শুধু প্রয়োজনের সময় মনে রাখে, তার একাকীত্ব আরও গভীর হয়।

বরিশাল সমকাল অফিসে পুলকদার একটি বড় চেয়ার ছিল।

চাকরি চলে যাওয়ার পরও আমরা কেউ সেখানে বসতাম না।

কারণ চেয়ারটি যেন তার জন্যই ছিল। বলেছেন তারই একজন সহকর্মী।

তিনি আর নেই।

কিন্তু সেই চেয়ারটি এখন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সামনে একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন সাংবাদিকের জন্য আমরা আসলে কী রেখে যাচ্ছি?

একটি চেয়ার?

একটি প্রেস কার্ড?

কিছু পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং?

নাকি একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ?

আজ যারা তরুণ রিপোর্টার, তাদের শুধু ভালো সাংবাদিক হওয়ার কথা ভাবলে চলবে না।

তাদের ভাবতে হবে—

৩০ বছর পর কী হবে?

সঞ্চয় কোথায়?

পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?

নতুন প্রযুক্তি শেখা হচ্ছে কি?

পেশাগত দক্ষতা বদলানোর প্রস্তুতি আছে কি?

চাকরি চলে গেলে বিকল্প কী?

শরীর ভেঙে গেলে কী হবে?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

সাংবাদিকতার বাইরে আমার মানুষ হিসেবে পরিচয়, সম্পর্ক ও আশ্রয়গুলো কি টিকে থাকবে?

কারণ সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সাংবাদিকের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ।

পুলক চ্যাটার্জি সারাজীবন মানুষের জন্য লিখেছেন।

তিনি খবরের পেছনে ছুটেছেন। সমাজের কথা বলেছেন। ক্ষমতাবানদের নিয়ে লিখেছেন। মানুষের সমস্যাকে সংবাদ বানিয়েছেন।

কিন্তু জীবনের শেষ দিকে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল সম্ভবত একটি জায়গা— যেখানে তিনি নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবেন না।

সমকাল অফিস সেই জায়গাটি কিছুটা দিয়েছিল।

চাকরি ছিল না, তবু তিনি সেখানে যেতেন।

চাবি তার কাছে ছিল।

মানুষ ছিল।

আড্ডা ছিল।

চা ছিল।

একটি চেয়ার ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাটিই হয়ে উঠল তার মৃত্যুর স্থান। কারণ, একইসাথে অর্থকষ্ট, শারীরিক কষ্ট এবং সীমাহীন শূন্যতা ছিলো।

এই ঘটনা থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আগেই দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

কিন্তু প্রশ্নগুলো করতেই হবে।

একজন সাংবাদিকের চাকরি শেষ হলে তার প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয়?

শিল্পগোষ্ঠী সংবাদমাধ্যম চায়, নাকি সংবাদমাধ্যমের ক্ষমতা চায়?

রাষ্ট্র সাংবাদিককে গণতন্ত্রের সহযোগী ভাবে, নাকি ক্ষমতার প্রতিপক্ষ?

সমাজ সাংবাদিকের কাছ থেকে সত্য চায়, কিন্তু সত্য বলার মূল্য দিতে প্রস্তুত কি?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

যারা মানুষের মানবিক জীবন, আত্মসম্মান ও সুন্দর সমাজের জন্য সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলেন, তারা যখন জীবনের শেষ প্রান্তে টাকা-পয়সার অভাব, একাকীত্ব ও মানুষের অবহেলায় পড়ে যান— তখন তাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়?

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু হয়তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না।

কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের বাধ্য করে প্রশ্নগুলো করতে।

কারণ একজন সাংবাদিকের মৃত্যুর পর শুধু তার লেখা সংবাদগুলোই খুঁজে দেখা উচি নয়।

খুঁজে দেখা উচিত—তিনি কেমন জীবন কাটিয়েছিলেন।

আর আরও জরুরি—

আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারব, যেখানে মানুষের জন্য জীবন কাটানো মানুষটিকে জীবনের শেষে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হবে না?