২০ বছরের ডিও, স্টক, মিলার, ওজন ও গেটপাসের হিসাব চায় অনুসন্ধান— দুই খাদ্যগুদামে সম্ভাব্য ২৫ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্র।

নিজস্ব প্রতিবেদক
কাগজে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য থাকার কথা, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দুটি খাদ্যগুদামে বাস্তবে কি তার সবটুকু আছে? নাকি দীর্ঘদিনের ডিও, স্টক রেজিস্টার, গ্রহণ-বিতরণ, মিলারদের সরবরাহ, ওজন, গেটপাস ও হিসাবের মধ্যে কোথাও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ফাঁক?
শ্যামনগরের (নকিপুর খাদ্য গুদাম ও নওয়াবেঁকী খাদ্য গুদাম) দুটি খাদ্যগুদামের মধ্যে কোনটিতে অনিয়মের মাত্রা বেশি, সেটিও নথিভিত্তিক তদন্তে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। অভিযোগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়— দুই গুদামের ২০ বছরের হিসাব পাশাপাশি মিলিয়ে দেখলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
শ্যামনগরের খাদ্যগুদামের প্রকৃত চিত্র জানতে শুধু বর্তমান স্টক গুনলেই হবে না। গত অন্তত ২০ বছরের ডিও থেকে শুরু করে বর্তমান মজুত পর্যন্ত পুরো হিসাবের চেইন অডিট করা প্রয়োজন। সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে ফলোআপ নিউজ প্রশাসনের কাছে নিখুঁত অডিটের দাবী তুলবে।
২৫টি জায়গায় খুঁজতে হবে সম্ভাব্য অনিয়ম
| ক্রম | সম্ভাব্য অনিয়মের ক্ষেত্র | যে নথি/তথ্য দিয়ে যাচাই |
|---|---|---|
| ১ | জাল বা ভুয়া ডিও | ডিও বনাম মূল ইস্যু রেজিস্টার |
| ২ | একই ডিও একাধিকবার ব্যবহার | ডিও, গেটপাস ও স্টক রেজিস্টার |
| ৩ | ডিওর পরিমাণ পরিবর্তন | বরাদ্দ বনাম ডিও বনাম বিতরণ |
| ৪ | ভুয়া স্বাক্ষর বা সিল | দায়িত্বকাল ও স্বাক্ষরের নমুনা |
| ৫ | ডিওর তারিখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দায়িত্বে না থাকা | কর্মকর্তা দায়িত্বকাল বনাম ডিও |
| ৬ | এক মিলারের নামে অন্য মিলের খাদ্যশস্য দেখানো | মিলের রেকর্ড ও চালান |
| ৭ | মিলার–গুদাম কর্মকর্তার সম্ভাব্য যোগসূত্র | বরাদ্দ, ডিও, সরবরাহের ধরণ ও পুনরাবৃত্তি |
| ৮ | নিম্নমানের খাদ্যশস্য গ্রহণ | মান পরীক্ষার রিপোর্ট ও নমুনা |
| ৯ | সরবরাহের চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য কাগজে দেখানো | মিলের ডিসপ্যাচ বনাম গুদাম গ্রহণ |
| ১০ | ওজন কারচুপি | মিল ও গুদামের ওজন স্লিপ |
| ১১ | গুদামে না আসা খাদ্যশস্যের হিসাব তৈরি | গ্রহণ রেজিস্টার বনাম বাস্তব মজুত |
| ১২ | স্টক ঘাটতি গোপন বা সমন্বয় | স্টক রেজিস্টার বনাম সরেজমিন মজুত |
| ১৩ | পুরোনো ঘাটতি নতুন কর্মকর্তার জেরে বহাল | দায়িত্ব হস্তান্তরের জের |
| ১৪ | অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য বের করা | ডিও, গেটপাস ও স্টক |
| ১৫ | সরকারি খাদ্যশস্য কালোবাজারে যাওয়ার সুযোগ | ডিওপ্রাপ্ত ব্যক্তি/ডিলারের রেকর্ড |
| ১৬ | সরকারি বস্তা বা মোড়ক পরিবর্তন | বস্তা, সিল, ব্যাচ ও গুদাম রেকর্ড |
| ১৭ | এক পণ্যকে অন্য পণ্য হিসেবে হিসাব করা | চাল/গম/আটার স্টক |
| ১৮ | নষ্ট বা ঘাটতির নামে অতিরিক্ত সমন্বয় | Loss/Wastage Register ও অনুমোদন |
| ১৯ | জাল চালান | চালান বনাম গেট ও পরিবহন রেকর্ড |
| ২০ | জাল বা অসম্পূর্ণ গেট রেজিস্টার | গাড়ির নম্বর, সময়, ডিও ও চালান |
| ২১ | অডিট আপত্তি গোপন/অসম্পূর্ণ নিষ্পত্তি | অডিট রিপোর্ট ও নিষ্পত্তি ফাইল |
| ২২ | দুই গুদামের মধ্যে স্থানান্তরে হিসাবের কারসাজি | Transfer Order, চালান ও দুই গুদামের স্টক |
| ২৩ | একই খাদ্যশস্যের দ্বৈত হিসাব | গ্রহণ, স্থানান্তর ও বিতরণ রেজিস্টার |
| ২৪ | মিলার/ডিলারকে অস্বাভাবিক সুবিধা প্রদান | বছরভিত্তিক বরাদ্দ, ডিও ও সরবরাহ বিশ্লেষণ |
| ২৫ | বর্তমান মজুতের সঙ্গে ২০ বছরের হিসাবের অমিল | উদ্বোধনী জের + গ্রহণ − বিতরণ = সমাপনী জের |
ভুয়া ডিও— অনুসন্ধানের প্রথম দরজা
শ্যামনগরের ২০ বছরের ডিও পরীক্ষা হতে পারে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
কোন ডিও সত্যিই ইস্যু হয়েছিল, কোনটি বাতিল হয়েছিল, কোন ডিওর বিপরীতে খাদ্যশস্য দেওয়া হয়েছিল এবং কোন ডিওর বিপরীতে কোনো পণ্য বাস্তবে বের হয়নি— এসব তথ্য মূল ডিও ইস্যু রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে একই ডিও নম্বর একাধিক জায়গায় ব্যবহার, সিরিয়ালে অস্বাভাবিকতা, ডিওর তারিখে কর্মকর্তার দায়িত্বে না থাকা এবং ডিওতে উল্লেখিত পরিমাণের সঙ্গে স্টক কমার অমিল— এসব অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
মিলারদের সঙ্গে যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা দরকার
গুদামের হিসাবের সঙ্গে মিলারদের হিসাব না মিলালে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
একজন মিলার কত বরাদ্দ পেয়েছেন, কত ডিও পেয়েছেন, বাস্তবে কত খাদ্যশস্য পাঠিয়েছেন, পরিবহনের রেকর্ড কী, গুদাম কত গ্রহণ করেছে এবং তার বিপরীতে কত টাকা বিল পেয়েছেন— সবকিছু পাশাপাশি বসাতে হবে।
কাগজে ১০০ টন সরবরাহ দেখানো হলেও মিলের ডিসপ্যাচ রেকর্ডে যদি ৮০ টনের তথ্য থাকে, অথবা গুদামের গ্রহণ রেকর্ডে অন্য পরিমাণ থাকে, তাহলে সেই পার্থক্যের কারণ বের করা জরুরি।
একই মিলারকে দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক হারে বরাদ্দ বা ডিও দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও আলাদা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বর্তমান গুদাম কর্মকর্তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
বর্তমানে দায়িত্বে থাকা গুদাম কর্মকর্তার কাছে জানতে হবে— তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী কর্মকর্তার কাছ থেকে ঠিক কত পরিমাণ খাদ্যশস্যের জের বুঝে নিয়েছেন।
তারপর প্রশ্ন হবে—
সেই জেরের সঙ্গে বর্তমানে গুদামে থাকা খাদ্যশস্যের পরিমাণ কি মেলে?
যদি না মেলে, ঘাটতি কখন সৃষ্টি হয়েছে?
কোন কর্মকর্তার দায়িত্বকালে হয়েছে?
দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় তা শনাক্ত হয়েছিল কিনা?
কোনো আপত্তি বা রিপোর্ট করা হয়েছিল কিনা?
আর বর্তমান কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো অসংগতি পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কিনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর নথি দিয়েই যাচাই করা সম্ভব।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তদারকিও প্রশ্নের মুখে
শ্যামনগর খাদ্যগুদামের হিসাবের তদারকি শুধু গুদাম কর্মকর্তার বিষয় নয়। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের নজরদারি ও অডিট ব্যবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
গত ২০ বছরে শ্যামপুরের দুই গুদামে কতবার স্টক যাচাই হয়েছে?
কতবার আকস্মিক পরিদর্শন হয়েছে?
কোনো ঘাটতি পাওয়া গেছে কিনা?
অডিট আপত্তি থাকলে তা কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে?
কোনো ডিও নিয়ে আপত্তি উঠেছিল কিনা?
মিলারদের সরবরাহ ও গুদামের গ্রহণের মধ্যে কোনো পার্থক্য ধরা পড়েছিল কিনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের নথিতে থাকার কথা।
দুই গুদামের তুলনামূলক হিসাব জরুরি
শ্যামনগরের দুটি খাদ্যগুদামের মধ্যে কোনটিতে অনিয়মের মাত্রা বেশি, তা নির্ধারণ করতে দুই গুদামের—
ডিও + স্টক ঘাটতি + অডিট আপত্তি + মিলারভিত্তিক সরবরাহ + ওজনের পার্থক্য + গেটপাস + স্থানান্তর + বর্তমান মজুত
একই পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করতে হবে।
একটি গুদামের হিসাব দিয়ে অন্যটির ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত ঢেকে রাখা হয়েছে কিনা— এমন সম্ভাবনাও নথিগতভাবে যাচাই করা দরকার।
এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে খাদ্যশস্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রে—
Transfer Order → চালান → পরিবহন → গেট রেজিস্টার → গ্রহণ রেজিস্টার → দুই গুদামের স্টক
এই পুরো ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখতে হবে।
কাগজে এক গুদাম থেকে খাদ্যশস্য বের হয়েছে, কিন্তু অন্য গুদামে সেই পরিমাণ ঢোকেনি— এমন কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সেটি হবে গুরুতর তদন্তের বিষয়।
নথি চাওয়ার তালিকাও হবে বিস্তৃত
অনুসন্ধানের জন্য গত ২০ বছরের—
- সব ডিও ইস্যু রেজিস্টার;
- বাতিল ও সংশোধিত ডিওর তালিকা;
- স্টক রেজিস্টার;
- দৈনিক/মাসিক মজুত বিবরণী;
- দায়িত্ব গ্রহণ ও হস্তান্তরের জের;
- মিলারভিত্তিক বরাদ্দ ও ডিও;
- মিলের ডিসপ্যাচ রেকর্ড;
- গুদামে গ্রহণ রেজিস্টার;
- ওজন স্লিপ ও ওজন রেজিস্টার;
- গেট ইন/গেট আউট রেজিস্টার;
- গেটপাস ও চালান;
- Transfer Order;
- ডিলার/গ্রহীতার তথ্য;
- মান পরীক্ষার রিপোর্ট;
- বিল-ভাউচার ও পরিশোধের তথ্য;
- Loss/Wastage Register;
- অডিট রিপোর্ট;
- অডিট আপত্তি ও নিষ্পত্তি;
- স্টক যাচাই ও আকস্মিক পরিদর্শন প্রতিবেদন;
- তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন;
- ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত সংক্রান্ত প্রতিবেদন
চাওয়া প্রয়োজন।
২০ বছরের হিসাব খুললেই উত্তর মিলতে পারে
শ্যামনগর খাদ্যগুদামের প্রকৃত চিত্র জানতে অনুমানের প্রয়োজন নেই। সরকারি নথিই যথেষ্ট।
প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাবের চেইন—
ডিও → বরাদ্দ → মিলার → পরিবহন → ওজন → গেটপাস → গুদামে গ্রহণ → স্টক রেজিস্টার → বিতরণ → গ্রহীতা → বর্তমান মজুত।
এই চেইনের প্রতিটি ধাপ যদি গত ২০ বছরের জন্য মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে কোথায় হিসাবের গরমিল হয়েছে, কোন সময়ে হয়েছে এবং কোন নথির মাধ্যমে হয়েছে— তা শনাক্ত করা সম্ভব।
তাই প্রশ্নটি শুধু “গুদামে এখন কত টন খাদ্যশস্য আছে?”—এতটুকু নয়।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো—
কত টন থাকার কথা ছিল, কত টন এসেছে, কত টন বের হয়েছে, কোন ডিওতে বের হয়েছে, ডিওগুলো সত্যিই বৈধ কি না, কোন মিলার সরবরাহ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কাগজের মজুতের সঙ্গে বাস্তব মজুত মেলে কি না?
শ্যামনগরের দুটি খাদ্যগুদামের ২০ বছরের ডিও, স্টক, অডিট, মিলার, ওজন ও বিতরণ-হিসাব পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হলে কাগজ আর বাস্তবের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকলে সেটিও সামনে আসবে।
একই সঙ্গে কোন গুদামে অনিয়মের মাত্রা বেশি, সেটিও তুলনামূলক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হতে পারে।
আর যদি সব হিসাব মিলে যায়, তাহলেও সেটি হবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য— কারণ তখন দীর্ঘ সময়ের সরকারি খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট নথি ও বাস্তব মজুতের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
অভিযোগ নয়— নথিই বলুক, শ্যামনগরে কোন গুদামে কত খাদ্যশস্য আছে এবং কোথায় অনিয়মের মাত্রা বেশি।
