Headlines

Towellers Bangladesh-এর বন্ড ব্যবস্থাপনায় কী পেয়েছিল কাস্টমস অডিট?

কাস্টমস্ বন্ড কমিশনারেট চট্টগ্রাম

আমদানি না করেও কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাব, রপ্তানি দেখানো পণ্যের উৎস নিয়েও প্রশ্ন; চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের ৭৮ লাখ টাকার দাবি শেষ পর্যন্ত কেনো টেকেনি আদালতে?

ফলোআপ নিউজ | অনুসন্ধান

চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অডিটে Towellers Bangladesh Ltd.-এর বন্ড ব্যবস্থাপনা ও কাঁচামালের হিসাব নিয়ে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি উঠে এসেছিল। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের বার্ষিক অডিট করতে গিয়ে অডিট দল আমদানি-রপ্তানি রেকর্ড, উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং রপ্তানি পণ্যের হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্যের তথ্য পায় বলে সুপ্রিম কোর্টের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে কাস্টমসের সেই পর্যবেক্ষণ থেকে যে দাবি ও জরিমানা আরোপ করা হয়েছিল, তা পরবর্তী পর্যায়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে দেয়। এরপর কাস্টমস কমিশনারেট হাইকোর্টে আপিল করলেও ২০২৪ সালের ৯ মে হাইকোর্ট সেই আপিল খারিজ করে। ফলে অডিটে উত্থাপিত অভিযোগ এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

অডিটে কী পাওয়া গিয়েছিল?

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, Towellers Bangladesh Ltd. মূলত সুতা ও রাসায়নিক আমদানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ২০১৮ ও ২০১৯ সালের হিসাবের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের একটি অডিট দল কাজ করে।

অডিটের সময় দলটি দেখতে পায়, ২০১৯ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির আর কোনো আমদানি-রপ্তানি রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

অডিট প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ৫৫,০৩৭.৭২ কেজি সুতা এবং ৩,৫১০ কেজি রাসায়নিক ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছিল। কিন্তু অডিট দলের পর্যবেক্ষণ ছিল, ব্যবহারের পরিমাণ আমদানি করা কাঁচামালের তুলনায় বেশি।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়—নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কোনো রাসায়নিক আমদানি করা হয়নি; অথচ ওই বছর ৩,৫১০ কেজি রাসায়নিক ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছিল।

Towellers Bangladesh Ltd.-এর বন্ড ব্যবস্থাপনা নিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অডিট ও পরবর্তী মামলার নথি।

আমদানি না করেই রপ্তানি?

অডিট দল BEPZA-এর IP-সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে যাচাই করেও কিছু অসঙ্গতি পেয়েছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে।

নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ২৮,৪৯২ কেজি এবং ২০১৯ সালে ২৪,৫০০ কেজি পণ্য Towellers Bangladesh আমদানি করেনি—অডিটের এমন পর্যবেক্ষণ ছিল। অথচ এসব পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে বলে হিসাব দেখানো হয়েছিল।

কাস্টমসের বক্তব্য ছিল, এসব পণ্য প্রকৃতপক্ষে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে এবং সেগুলো রপ্তানি করা হয়েছে দেখিয়ে শুল্ক-কর এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

তবে এটি ছিল কাস্টমসের অভিযোগ/দাবি; আদালত পরবর্তী পর্যায়ে সেই দাবিকে ভিত্তি করে কমিশনারের আরোপিত অর্থদণ্ড বহাল রাখেনি।

৭৮ লাখ টাকার দাবি

কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ৫৮,৫৪৭.৭২ কেজি সুতা ও ৩,৫১০ কেজি রাসায়নিকের মূল্যায়নযোগ্য মূল্য ছিল প্রায় ৭৬.৪১ লাখ টাকা এবং এর বিপরীতে শুল্ক-কর দাবি করা হয় ২৮,২৭,৪৯৭.২৩ টাকা

এর সঙ্গে কাস্টমস কমিশনার ৫০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করেন।

অর্থাৎ কমিশনারের ২৮ মার্চ ২০২২ সালের আদেশে মোট আর্থিক দাবি দাঁড়ায় প্রায় ৭৮.২৭ লাখ টাকা

কাস্টমস্ বন্ড কমিশনারেট চট্টগ্রাম
কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত এটি পাকিস্তানী Towellers। এটির সাথে Towellers Bangladesh-এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা ফলোআপ নিউজ নিশ্চিত নয়।

এরপর কী হলো?

Towellers Bangladesh বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে যায়।

২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনারের ২০২২ সালের আদেশ বাতিল করে এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করে।

এরপর কাস্টমস কমিশনারেট ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে।

২০২৪ সালের ৭ ও ৮ মে শুনানি শেষে ৯ মে বিচারপতি জাফর আহমেদ ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেয়।

আদালত দেখতে পায়, ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট নথি ও উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে আইনগত ত্রুটি খুঁজে পায়নি। ফলে কাস্টমস কমিশনারেটের আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়।

তাহলে প্রশ্নটা কোথায়?

Towellers Bangladesh-এর ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাস্টমসের অডিটের বিষয় নয়। এখানে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে—

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, মজুত, উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব নিয়মিতভাবে কীভাবে যাচাই করা হয়?

আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের অডিটে আমদানি করা কাঁচামালের সঙ্গে উৎপাদন ও রপ্তানি হিসাবের এমন অসঙ্গতি উঠে আসে, তাহলে সেই অসঙ্গতি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী কী পদক্ষেপ নেয়—সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।

বিশেষ করে Towellers-এর ক্ষেত্রে অডিটে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর পর প্রতিষ্ঠানটির বন্ড কার্যক্রমের কী অবস্থা হয়েছে, পরবর্তীতে কোনো নতুন অডিট হয়েছে কি না, বকেয়া বা অন্যান্য দায়ের কোনো হিসাব রয়েছে কি না—এসব তথ্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কাছ থেকে নেওয়া প্রয়োজন।

FollowUpNews-এর অনুসন্ধানে যে প্রশ্নগুলো জরুরীঃ

১. Towellers Bangladesh-এর বর্তমান বন্ড লাইসেন্সের অবস্থা কী?

২. ২০১৯ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির কোনো আমদানি বা রপ্তানি হয়েছে কি না?

৩. ২০১৮–১৯ সালের অডিটের পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আর কোনো অডিট করেছে কি না?

৪. ২০১৯ সালে কোনো রাসায়নিক আমদানি না করে ৩,৫১০ কেজি রাসায়নিক ব্যবহারের হিসাব কীভাবে অডিটে উঠে এসেছিল?

৫. ২০১৮ ও ২০১৯ সালের যথাক্রমে ২৮,৪৯২ কেজি ও ২৪,৫০০ কেজি পণ্যের উৎস সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটি কী ব্যাখ্যা দিয়েছিল?

৬. কাস্টমস কমিশনারের ২৮ মার্চ ২০২২ সালের আদেশ বাতিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ কী ছিল?

৭. বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে সরকারের কোনো বকেয়া বা অন্য কোনো দাবি আছে কি না?

৮. প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধা বর্তমানে চালু আছে কি না?

৯. ২০১৯ সালের পর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম না থাকার বিষয়টি কাস্টমসের নজরে আসার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?

১০. অডিটে উঠে আসা অসঙ্গতির জন্য সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কোনো প্রশাসনিক পর্যালোচনা বা তদন্ত হয়েছিল কি না?

নোট: এই প্রতিবেদনে কাস্টমসের অডিটে উঠে আসা বিষয়গুলোকে অভিযোগ/অডিট পর্যবেক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। Towellers Bangladesh-কে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট অর্থদাবি ও জরিমানার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে হাইকোর্ট কাস্টমসের অবস্থান বহাল রাখেনি।