ফলোআপ নিউজ ডেস্ক

বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু তখনই প্রকাশ পায় না, যখন একটি হত্যাকাণ্ডের পর আসামি ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় তার চেয়েও ভয়াবহভাবে বিচারহীনতা প্রকাশ পায় তারও আগে—যখন রাষ্ট্রের সামনে বিপদের ইঙ্গিতগুলো একের পর এক হাজির হয়, কিন্তু রাষ্ট্র অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে কোনো একটি বড় দুর্ঘটনা, কোনো একটি লাশ, কোনো একটি ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কিংবা কোনো একটি ভাইরাল ভিডিওর জন্য।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনকে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত নয়। ঘটনাস্থলে সিআইডির ফরেনসিক দল গেছে এবং তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটি শুধু আজকের মৃত্যুকে ঘিরে নয়।
প্রশ্ন হলো—মরিয়ম যখন জীবিত ছিলেন, তখন রাষ্ট্র কোথায় ছিল?
জুলাই মাসে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়মকে ঘিরে ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে ভিডিওটি নিয়ে নানা দাবি ওঠে। পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ওই তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। তার প্রথম স্ত্রী এবং মরিয়মের বাবাও একই দাবি করেন।
কিন্তু এরপর ঘটনাটি আর নিছক ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
মরিয়মের একটি বায়োডাটা সামনে আসে, যেখানে কথিত বিয়ের পাঁচ দিন পরও তার বৈবাহিক অবস্থার ঘরে ‘Unmarried’ লেখা ছিল এবং সেখানে গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরও ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এর সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান—যিনি মরিয়মের মামা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—তাকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান।
অর্থাৎ ঘটনাপ্রবাহে একের পর এক সতর্কসংকেত তৈরি হচ্ছিল।
একজন তরুণীকে ঘিরে বিতর্ক।
তাঁর পরিচয় ও বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন।
ভিডিও প্রকাশকে কেন্দ্র করে বিরোধ।
তাঁর নিকটাত্মীয়ের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ।
ক্ষমতাবান একজন জনপ্রতিনিধির সংশ্লিষ্টতা।
এবং শেষ পর্যন্ত সেই তরুণীর মৃত্যু।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়।

তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে দেওয়া নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—ঝুঁকির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের তদন্ত করা এবং প্রয়োজন হলে আইনসম্মত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
এ কারণেই একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসেঃ
মরিয়ম যদি তখন সত্যিই ঝুঁকির মধ্যে থেকে থাকেন, তাহলে তাকে নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া, তার স্বাধীন বক্তব্য নেওয়া এবং পুরো বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা কি সম্ভব ছিল না?
বিশেষ করে যখন ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছিল, যখন পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসছিল এবং যখন একটি ফৌজদারি মামলাও দায়ের হয়েছিল—তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি বিষয়টিকে কেবল ‘ব্যক্তিগত ঘটনা’ হিসেবে দেখার সুযোগ রাখে?
আরও বড় প্রশ্ন—একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার রাজনৈতিক পরিচয় কি তদন্তের গতি বা রাষ্ট্রের সতর্কতাকে প্রভাবিত করা উচিত?
উত্তরটি হওয়া উচিত—না।
একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের পদ্ধতি আইনের দৃষ্টিতে একই নীতির অধীন হওয়া উচিত। বরং জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে জনস্বার্থের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, জনআস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীও জুলাইয়ের ঘটনায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল। দলটি জানিয়েছিল, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
কিন্তু দলীয় ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রীয় বিচার এক জিনিস নয়।
একটি রাজনৈতিক দল কাউকে বহিষ্কার করতে পারে। কিন্তু কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, কেউ কারও নিরাপত্তার জন্য হুমকি কি না, কোনো মৃত্যু স্বাভাবিক কি না—এসব নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আদালতের।
আজ মরিয়ম নেই।
এখন সবচেয়ে সহজ কাজ হবে তার মৃত্যুকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষের বক্তব্যকে সত্য ধরে নেওয়া, অন্য পক্ষকে আগেই খুনি বানিয়ে ফেলা অথবা পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করা।
কিন্তু সেটি বিচার নয়।
বিচার হলো—ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত সংগ্রহ করা, ফরেনসিক পরীক্ষা করা, ময়নাতদন্ত করা, ডিজিটাল ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা, ফোন ও যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা, প্রত্যেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা।
একই সঙ্গে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন—কারণ একটি মৃত্যুকে কখনো শুধু মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা দিয়ে বোঝা যায় না; তার আগের কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাসের ঘটনাও কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মরিয়মের মৃত্যু যেন আরেকটি ‘রহস্যজনক মৃত্যু’ হয়ে ফাইলের স্তূপে হারিয়ে না যায়।
যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলেও জানতে হবে—কোন পরিস্থিতি একজন ১৯ বছর বয়সী তরুণীকে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।
যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে হত্যাকারী যে-ই হোক, তার পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক ক্ষমতা কোনো কিছুই তদন্তের বাইরে থাকার কারণ হতে পারে না।
আর যদি তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় যে তার মৃত্যুর আগে তিনি হুমকি, চাপ, নির্যাতন কিংবা জবরদস্তির মধ্যে ছিলেন, তাহলে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে উঠবে—রাষ্ট্র সেই ঝুঁকি আগে কেন দেখতে পেল না?
আমাদের বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কেবল অপরাধের পর আসামি ধরতে পারা নয়। বড় পরীক্ষা হলো—একজন নাগরিক বিপদের মধ্যে থাকলে তাকে বিপদ থেকে বের করে আনতে পারা।
মরিয়মকে নিয়ে আজকের সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্ন তাই শুধু ‘কে তাকে হত্যা করল?’ নয়।
প্রশ্নটি আরও আগে শুরু হয়—
মরিয়ম যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার ছিল?
রাষ্ট্র যদি তখন তার পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করে থাকে, আর আজ তার মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু করে—তাহলে আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করেছি যেখানে একজন মানুষের জীবনের মূল্য বোঝা হয় তার মৃত্যুর পর, জীবিত অবস্থায় নয়?
মরিয়মের মৃত্যুর সত্য উদঘাটন তাই শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির ক্ষেত্রেও আইনের সমান প্রয়োগের একটি পরীক্ষা।
মরিয়মের মৃত্যুর কারণ যাই হোক, সত্যটি অবশ্যই বের করতে হবে। আর সেই সত্য যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা সামাজিক চাপের নিচে চাপা না পড়ে—এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
