ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষ কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন, সেখানে হয়রানি, অনিয়ম কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব হচ্ছে কিনা— তা সরেজমিনে দেখতে এবার পরিচয় গোপন করে সাধারণ সেবাগ্রহীতার বেশে ভূমি অফিসে হাজির হয়েছেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বোরকা পরে যান তিনি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নিজেও সাধারণ সেবাগ্রহীতার মতো সেবা নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেখানে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রশাসনিক দিক থেকে উদ্যোগটির যুক্তি সহজ। কোনো সরকারি কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের খবর আগে থেকে সংশ্লিষ্ট অফিসে পৌঁছে গেলে স্বাভাবিক দিনের চিত্র পাওয়া কঠিন হতে পারে। কর্মকর্তারা প্রস্তুত থাকেন, সেবার প্রক্রিয়াও সাময়িকভাবে বদলে যেতে পারে। সে কারণে পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা সরাসরি দেখা একটি পর্যবেক্ষণ-পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

ফরিদা খানমের বক্তব্যও মূলত এই জায়গাতেই। নিয়মিত আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের সময় অনেক ক্ষেত্রে সেবার প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি জানা সম্ভব হয় না— সাধারণ মানুষ বাস্তবে কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটি বোঝার জন্যই তিনি সাধারণ সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে সেখানে গিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ঘটনাটির একটি দ্বিতীয় দিকও আছে। সেটি প্রশাসনিক নয়, সামাজিক।
পরিচয় গোপন করার জন্য বোরকা কেন? এই “কেন” ব্যক্তি ফরিদা খানমের কাছে প্রশ্ন নয়। ছদ্মবেশের প্রতিকী তাৎপর্য বুঝতে চাওয়া।
বোরকা বাংলাদেশের সমাজে বহু নারীর ব্যবহৃত একটি পোশাক। কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এটি পরেন, কেউ ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে। ফলে বোরকাকে নিজেই ‘কুসংস্কার’ কিংবা ‘ছদ্মবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
কিন্তু এই নির্দিষ্ট ঘটনায় বোরকার ব্যবহারটি ভিন্ন একটি অর্থ তৈরি করেছে। কারণ এখানে বোরকা পরার উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে সাধারণ সেবাগ্রহীতা হিসেবে আড়াল করা। অর্থাৎ পোশাকটি এখানে শুধু পোশাক নয়— পরিচয় গোপনের কৌশলের অংশ।
এখানেই প্রশ্নটি তৈরি হয়।
একজন জেলা প্রশাসক যদি সাধারণ পোশাকে ভূমি অফিসে যান, অচেনা হলে সেটি হতে পারে ছদ্মবেশ। কিন্তু তিনি যখন বিশেষভাবে বোরকা পরে নিজের পরিচয় আড়াল করেন, তখন জনপরিসরে বোরকার আরেকটি কার্যকর অর্থ দৃশ্যমান হয়— এই পোশাক একজন ব্যক্তির দৃশ্যমান পরিচয়কে আড়াল করতে পারে।
এটি কি ইচ্ছাকৃত সামাজিক বার্তা? এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বক্তব্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফরিদা খানম বোরকার কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন— এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। তার ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের মতো থেকে ভূমিসেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখা।
তবে একজন সরকারি কর্মকর্তার আচরণের প্রতীকী অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
কারণ রাষ্ট্র সাধারণ নাগরিকের পরিচয় জানতে চায়। সরকারি সেবা নিতে পরিচয়পত্র, আবেদন, নথি— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই রাষ্ট্রেরই একজন জেলা প্রশাসক বাস্তব সেবা পরিস্থিতি বোঝার জন্য নিজের পরিচয় গোপন করলেন।
এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়—
স্বচ্ছতা যাচাই করতে গিয়ে পরিচয় গোপন।
আর সেই পরিচয় গোপনের দৃশ্যমান মাধ্যম হলো বোরকা।
তাহলে কি এই ঘটনায় বোরকা অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘ছদ্মবেশের পোশাক’ হিসেবে জনসমক্ষে হাজির হলো?
প্রশ্নটি বোরকা পরা নারীদের নিয়ে নয়। প্রশ্নটি বরং একটি সামাজিক প্রতীকের প্রশাসনিক ব্যবহারের।
একজন সাধারণ নারী বোরকা পরলে তার অর্থ হতে পারে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা সামাজিক অভ্যাস। কিন্তু একজন জেলা প্রশাসক যখন একই পোশাককে নিজের সরকারি পরিচয় আড়াল করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন পোশাকটির একটি নতুন ব্যবহারিক অর্থও সামনে আসে।
আর এখানেই ঘটনাটি শুধু ‘ডিসি দুর্নীতি ধরতে গেলেন’— এই সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এটি প্রশ্ন তোলে— প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কি সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য ছদ্মবেশ নিতে পারেন? পারলে কোন ধরনের ছদ্মবেশ গ্রহণ করা উচিৎ? আর সেই ছদ্মবেশের সামাজিক প্রতীক কী?
দুর্নীতি বা হয়রানি ধরতে পরিচয় গোপন করার প্রশাসনিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও ভাবার বিষয়— রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধির ব্যবহৃত প্রতীক সমাজে কী ধরনের অর্থ তৈরি করে।
ফরিদা খানমের উদ্দেশ্য হয়তো ছিল খুব সরল— অফিসে ডিসি ঢুকেছেন জানলে যে আচরণ পাওয়া যায়, সাধারণ নাগরিক হিসেবে গেলে সেটি পাওয়া যায় কিনা, তা দেখা।
কিন্তু তার ব্যবহৃত পোশাক সেই প্রশাসনিক পরীক্ষাকে একটি সামাজিক প্রশ্নে পরিণত করেছে।
বোরকা কি শুধু পর্দার পোশাক, নাকি প্রয়োজনে পরিচয় আড়াল করার মাধ্যমও?
এই প্রশ্নের উত্তর ডিসি ফরিদার উদ্দেশ্য দিয়ে নয়, বরং ঘটনাটির প্রতীকী অর্থ নিয়ে সমাজের আলোচনাতেই খুঁজে দেখা যেতে পারে।
