Headlines

পাঁচ বছরে জনতা ব্যাংকের ধারাবাহিক আর্থিক অবনতি: খেলাপি ঋণ ৬৮ হাজার কোটি, মূলধন ঘাটতি ১০ হাজার কোটি ছাড়াল

২০২০–২০২৪ সালের আর্থিক হিসাব, একাধিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদ ও ঋণ আদায়ের চিত্র নিয়ে প্রশ্ন।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসির আর্থিক অবস্থার পাঁচ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, মূলধন, আমানত এবং মুনাফার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যায়। ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৮ হাজার ৬৬ কোটি টাকায়। একই সময়ে মূলধন ঘাটতি প্রায় ৩১ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত অবস্থা থেকে বেড়ে ১০ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার ঘাটতিতে পৌঁছায়।

এই সময় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ, মো. আব্দুল জব্বার, ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মো. গোলাম মর্তুজা এবং মো. মাজিবুর রহমান। তবে ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক ফলাফল দিয়ে এককভাবে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায় নির্ধারণ করা যায় না। ঋণ অনুমোদন, বিতরণ, খেলাপি হওয়ার সময়, পুনঃতফসিল, আদায় এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

জনতা ব্যাংকের প্রকাশিত Financial Highlights ও বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে ২০২০–২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

পাঁচ বছরের আর্থিক চিত্র: এক নজরে

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ ২০২৪
মোট ঋণ ও অগ্রিম (কোটি টাকা) ৬০,৫৩৫ ৬৯,৯৬৬ ৮৫,২০৯ ৯৮,৩৮৯ ১,০০,৭৯৪
শ্রেণিকৃত ঋণ (কোটি টাকা) ১৩,৭৩৬ ১২,৩২০ ১৫,১৯৮ ২৫,০০৯ ৬৮,০৬৬
শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২২.৬৯% ১৭.৬১% ১৭.৮৪% ২৫.৪২% ৬৭.৫৩%
মোট আমানত (কোটি টাকা) ৮২,৪০১ ১,০১,৬২১ ১,০১,৪৫৮ ১,১০,৩২৬ ১,০৯,৮১০
পরিচালন মুনাফা/লোকসান (কোটি টাকা) ৯৮১ ১,০০২ ৯২৮ ৫৮৪ −২,১৯৫
কর-পরবর্তী মুনাফা/লোকসান (কোটি টাকা) ১৪ ৩০০ ১১৩ ৫৫ −৩,০৭১
মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) ১০.০৫% ৮.৯৮% ৭.৮৩% ৬.৭৫% ০.৯৩%

উৎস: জনতা ব্যাংকের Financial Highlights ও বার্ষিক প্রতিবেদন। টাকার অঙ্কগুলো মিলিয়ন থেকে কোটি টাকায় রূপান্তর করে নিকটতম পূর্ণ কোটি পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। ২০২৩ সালের আমানতের ক্ষেত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন সারণিতে সামান্য অমিল রয়েছে; এখানে Financial Highlights-এর অঙ্ক ব্যবহার করা হয়েছে।

তথ্যগুলোতে দেখা যায়, ২০২১ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের হার কমলেও পরবর্তী দুই বছরে তা আবার বেড়েছে। ২০২৪ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ ও মূলধনের সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। ওই বছরের প্রতিবেদনে ঋণ শ্রেণিকরণের কঠোরতা এবং আগে পুনঃতফসিল করা কিছু ঋণের পুনঃশ্রেণিকরণের বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। ফলে ২০২৪ সালের বৃদ্ধিকে শুধু ওই বছরের নতুন খেলাপি ঋণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না; পুরোনো ঋণের প্রকৃত অবস্থা এবং শ্রেণিকরণ পদ্ধতির পরিবর্তনও যাচাই করা প্রয়োজন।

২০২০ থেকে ২০২৪: ঋণ বাড়লেও ঝুঁকি কমেনি কেন?

পাঁচ বছরে জনতা ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এ সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের বৃদ্ধির পরিমাণ ঋণ ও অগ্রিমের মোট বৃদ্ধির চেয়েও বেশি।

তুলনামূলক সূচক ২০২০ ২০২৪ পরিবর্তন
মোট ঋণ ও অগ্রিম ৬০,৫৩৫ কোটি ১,০০,৭৯৪ কোটি প্রায় ৬৬.৫% বৃদ্ধি
শ্রেণিকৃত ঋণ ১৩,৭৩৬ কোটি ৬৮,০৬৬ কোটি প্রায় ৩৯৫.৬% বৃদ্ধি
আমানত ৮২,৪০১ কোটি ১,০৯,৮১০ কোটি প্রায় ৩৩.৩% বৃদ্ধি
মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০.০৫% ০.৯৩% ৯.১২ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু ঋণ বিতরণ কত বেড়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ঋণ বিতরণের বিপরীতে কত অর্থ সময়মতো ফেরত এসেছে, কত ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সেই ঝুঁকি সামাল দিতে ব্যাংকের মূলধন কতটা সক্ষম ছিল।

বছরভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণ: ২০২১-এর উন্নতি কি টেকসই ছিল?

বছর শ্রেণিকৃত ঋণ (কোটি টাকা) আগের বছরের তুলনায় পরিবর্তন
২০২০ ১৩,৭৩৬ —
২০২১ ১২,৩২০ প্রায় ১,৪১৬ কোটি টাকা কম
২০২২ ১৫,১৯৮ প্রায় ২,৮৭৮ কোটি টাকা বেশি
২০২৩ ২৫,০০৯ প্রায় ৯,৮১১ কোটি টাকা বেশি
২০২৪ ৬৮,০৬৬ প্রায় ৪৩,০৫৭ কোটি টাকা বেশি

২০২১ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ কমলেও ২০২২ সাল থেকে তা আবার বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালে এর পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। ২০২৪ সালে তা ৬৮ হাজার কোটি টাকার ওপরে পৌঁছায়।

এখানে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০২১ সালের উন্নতি কি প্রকৃত ঋণ আদায়ের ফল ছিল, নাকি পুনঃতফসিল, ঋণের শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো হিসাবগত কারণে শ্রেণিকৃত ঋণ কমেছিল? একইভাবে, ২০২৪ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের বড় বৃদ্ধির কত অংশ নতুন খেলাপি এবং কত অংশ পুরোনো ঋণের পুনঃশ্রেণিকরণ— তা ঋণভিত্তিক নথি ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের সক্ষমতা কতটা?

ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের তথ্যও রয়েছে। সেই তথ্যের সঙ্গে বছরশেষের শ্রেণিকৃত ঋণের তুলনা করলে আদায়ের পরিমাণের একটি ধারণা পাওয়া যায়।

বছর বছরশেষে শ্রেণিকৃত ঋণ শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায় বছরশেষের শ্রেণিকৃত ঋণের তুলনায় আদায়
২০২০ ১৩,৭৩৬ কোটি ১৭৮.৫৪ কোটি ১.৩০%
২০২১ ১২,৩২০ কোটি ২৮৩.৪০ কোটি ২.৩০%
২০২২ ১৫,১৯৮ কোটি ৩০২.৫১ কোটি ১.৯৯%
২০২৩ ২৫,০০৯ কোটি ২২৫.০০ কোটি ০.৯০%
২০২৪ ৬৮,০৬৬ কোটি ৩০২.৯৫ কোটি ০.৪৫%

বিশেষ সতর্কতা: শেষ কলামটি বছরশেষের শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ওই বছরের নগদ আদায়ের একটি তুলনামূলক অনুপাত; এটি একই ঋণ-অ্যাকাউন্ট থেকে আদায়ের নির্ভুল হার নয়। প্রকৃত পুনরুদ্ধার হার নির্ধারণে বছরের শুরুতে থাকা খেলাপি ঋণ, নতুন খেলাপি, পুনঃতফসিল, অবলোপন এবং আদায়ের পূর্ণ হিসাব প্রয়োজন।

তবু সারণিটি একটি প্রশ্ন সামনে আনে: শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়লেও নগদ আদায় কেন তুলনামূলকভাবে একই পর্যায়ে রয়ে গেল? ২০২৪ সালে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে নগদ আদায় ছিল প্রায় ৩০৩ কোটি টাকা। এই ব্যবধানের ব্যাখ্যা ব্যাংকের কাছে চাওয়া প্রয়োজন।

মূলধন ঘাটতি: লোকসান সামলানোর সক্ষমতা কতটা কমেছে?

ব্যাংকের মূলধন হলো ঋণক্ষতিসহ বিভিন্ন আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। জনতা ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

বছর মোট মূলধন প্রয়োজনীয় মূলধন উদ্বৃত্ত/ঘাটতি
২০২০ ৬,০১৭ কোটি ৫,৯৮৬ কোটি +৩১ কোটি
২০২১ ৬,৩৭৯ কোটি ৭,১০২ কোটি −৭২৩ কোটি
২০২২ ৬,২৮৪ কোটি ৮,০২১ কোটি −১,৭৩৮ কোটি
২০২৩ ৫,৭১৪ কোটি ৮,৪৬৫ কোটি −২,৭৫১ কোটি
২০২৪ ১,০৯৯ কোটি ১১,৮৫৬ কোটি −১০,৭৫৭ কোটি

২০২০ সালে ব্যাংকটির মূলধন প্রয়োজনীয় মাত্রার সামান্য ওপরে ছিল। ২০২১ সালেই ঘাটতি তৈরি হয়। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ঘাটতি আরও বাড়ে এবং ২০২৪ সালে তা ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

এখানে দুটি বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি। প্রথমত, কোন ঋণ ও সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন বা সম্ভাব্য ক্ষতির সংস্থান বাড়াতে হয়েছে? দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালে মোট মূলধন এত কমে যাওয়ার পেছনে কর-পরবর্তী লোকসান ছাড়াও কী কী হিসাবগত বা নিয়ন্ত্রক কারণ ছিল? কেবল লোকসানের অঙ্ক দিয়ে মূলধন হ্রাসের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না।

ঋণ-আমানত অনুপাত: আমানতের তুলনায় ঋণ কতটা বেড়েছে?

বছর মোট ঋণ ও অগ্রিম মোট আমানত ঋণ-আমানত অনুপাত
২০২০ ৬০,৫৩৫ কোটি ৮২,৪০১ কোটি ৭৩.৫%
২০২১ ৬৯,৯৬৬ কোটি ১,০১,৬২১ কোটি ৬৮.৮%
২০২২ ৮৫,২০৯ কোটি ১,০১,৪৫৮ কোটি ৮৪.০%
২০২৩ ৯৮,৩৮৯ কোটি ১,১০,৩২৬ কোটি ৮৯.২%
২০২৪ ১,০০,৭৯৪ কোটি ১,০৯,৮১০ কোটি ৯১.৮%

ঋণ-আমানত অনুপাত ২০২১ সালে কমলেও পরবর্তী বছরগুলোতে বেড়েছে। ২০২৪ সালে ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ আমানতের প্রায় ৯২ শতাংশে পৌঁছায়।

তবে এই অনুপাত একা ব্যাংকের তারল্য সংকটের প্রমাণ নয়। তারল্য নির্ধারণে নগদ ও তরল সম্পদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবদ্ধ অনুপাত, মেয়াদভিত্তিক দায় এবং আমানত উত্তোলনের চাপও বিশ্লেষণ করতে হবে। অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট বছরের তারল্য প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন-পর্যবেক্ষণ।

পরিচালন মুনাফা থেকে বড় লোকসান: কী ঘটেছিল?

বছর পরিচালন মুনাফা/লোকসান কর-পরবর্তী মুনাফা/লোকসান
২০২০ ৯৮১ কোটি ১৪ কোটি
২০২১ ১,০০২ কোটি ৩০০ কোটি
২০২২ ৯২৮ কোটি ১১৩ কোটি
২০২৩ ৫৮৪ কোটি ৫৫ কোটি
২০২৪ −২,১৯৫ কোটি −৩,০৭১ কোটি

সারণিতে দেখা যায়, ২০২০–২০২২ সময়ে পরিচালন মুনাফা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার আশপাশে ছিল। ২০২৩ সালে তা কমে ৫৮৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি পরিচালন লোকসান দেখায় এবং কর-পরবর্তী লোকসান প্রায় ৩ হাজার ৭১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

এই পরিবর্তন বিশ্লেষণে ঋণের সুদ আদায়, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন, সুদ স্থগিত, বিনিয়োগের আয়, পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য আয়-ব্যয়ের হিসাব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। শুধু মুনাফা কমেছে বলেই একক কোনো কারণকে দায়ী করা যাবে না।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মেয়াদ: কোন সময়ে কী পরিবর্তন?

জনতা ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের তালিকা অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ের বড় অংশে দায়িত্বে ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। এরপর দায়িত্ব নেন মো. আব্দুল জব্বার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর–নভেম্বরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. গোলাম মর্তুজা; ৭ নভেম্বর ২০২৪ থেকে দায়িত্বে আসেন মো. মজিবুর রহমান।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্বকাল অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়
আব্দুছ ছালাম আজাদ ৫ ডিসেম্বর ২০১৭–৪ ডিসেম্বর ২০২০; পুনরায় ৯ ডিসেম্বর ২০২০–২৯ এপ্রিল ২০২৩ ২০২০–২০২২ সালের ঋণ বৃদ্ধি, শ্রেণিকৃত ঋণের ওঠানামা, বড় ঋণগ্রহীতাদের হিসাব
মো. আব্দুল জব্বার ৩ মে ২০২৩–২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২০২৩ সালের ঋণ ও শ্রেণিকৃত ঋণের বৃদ্ধি; ২০২৪ সালের প্রথমাংশের আর্থিক পরিবর্তন
মো. গোলাম মর্তুজা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪–৬ নভেম্বর ২০২৪, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের স্বল্প সময়ে শ্রেণিকরণ, আদায় ও আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন
মো. মাজিবুর রহমান ৭ নভেম্বর ২০২৪ থেকে ২০২৪ সালের শেষাংশের হিসাব, মূলধন ঘাটতি ও লোকসানের প্রতিবেদন

উৎস: জনতা ব্যাংকের অফিসিয়াল MD/CEO তালিকা এবং প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন।

এই সময়সীমাগুলো বিশ্লেষণের ভিত্তি; এগুলো নিজে থেকে দায় প্রমাণ করে না। একটি ঋণ কোনো এমডির মেয়াদে অনুমোদিত হলেও পরবর্তী সময়ে খেলাপি হতে পারে। আবার আগের মেয়াদে বিতরণ করা ঋণ পরবর্তী ব্যবস্থাপনার সময় পুনঃতফসিল বা শ্রেণিকরণ করা হতে পারে। তাই দায়িত্ব নির্ধারণে ঋণভিত্তিক সময়রেখা অপরিহার্য।

বড় ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে কী কী তথ্য প্রকাশ করা দরকার?

ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সারণি থেকে বোঝা যায় ঝুঁকি বেড়েছে; কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর ঋণ এই অবনতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণে পৃথক ঋণ-তথ্য প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় তথ্য কেন জরুরি
শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার নাম ও মোট এক্সপোজার বড় ঋণগ্রহীতার ওপর ঝুঁকি কেন্দ্রীভূত কি না
ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের তারিখ কোন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ঋণ দেওয়া হয়েছিল
মূল ঋণ, সুদ ও মোট বকেয়া বকেয়া বৃদ্ধির প্রকৃতি বোঝা
খেলাপি হওয়ার তারিখ ও শ্রেণি কখন ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে
পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ইতিহাস খেলাপি অবস্থা কতবার পরিবর্তিত হয়েছে
জামানত, মূল্যায়ন ও আইনগত ব্যবস্থা ঋণ আদায়ের বাস্তব সম্ভাবনা
বছরভিত্তিক নগদ আদায় ঘোষিত উদ্যোগের বিপরীতে প্রকৃত আদায়ের হিসাব
ঋণ অবলোপন ও অবলোপন-পরবর্তী আদায় হিসাব থেকে বাদ পড়া ঋণের প্রকৃত অবস্থা

প্রকাশ্য আর্থিক প্রতিবেদনে এই পূর্ণাঙ্গ ঋণভিত্তিক তথ্য না থাকলে ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে নথি চাওয়া প্রয়োজন।

পুনঃতফসিল, অবলোপন ও অডিট: পরবর্তী অনুসন্ধানের তিনটি ক্ষেত্র

১. পুনঃতফসিল: বছরভিত্তিক কত টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে, কত টাকা কিস্তি পরিশোধ হয়েছে এবং কত ঋণ আবার খেলাপি হয়েছে— তার তালিকা প্রয়োজন।

২. ঋণ অবলোপন: কত ঋণ ব্যাংকের হিসাব থেকে অবলোপন করা হয়েছে, অবলোপনের শর্ত কী ছিল এবং পরবর্তী সময়ে কত টাকা আদায় হয়েছে, তা আলাদা করে যাচাই করা দরকার।

৩. নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা: বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে কী অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে, কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এবং কোনগুলো বাস্তবায়িত হয়নি— এসব নথি ছাড়া আর্থিক অবনতির প্রাতিষ্ঠানিক কারণ নির্ধারণ অসম্পূর্ণ থাকবে।

জনতা ব্যাংকের কাছে যেসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন

১. ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় ১৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা থেকে ৬৮ হাজার ৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছানোর প্রধান কারণগুলো কী?

২. ২০২৪ সালের শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে কত টাকা ওই বছর নতুন করে খেলাপি হয়েছে এবং কত টাকা আগে পুনঃতফসিল করা বা অন্য শ্রেণিতে থাকা ঋণ থেকে পুনঃশ্রেণিকৃত হয়েছে?

৩. গত পাঁচ বছরে শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার বিপরীতে অনুমোদিত ঋণ, বিতরণ, বকেয়া, শ্রেণিকৃত ঋণ ও নগদ আদায়ের পরিমাণ কত?

৪. ২০২১ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ কমলেও ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তা কেন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে?

৫. ২০২৪ সালে মোট মূলধন প্রায় ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকায় নেমে আসার পেছনে প্রভিশন, লোকসান, সম্পদমূল্যায়ন ও অন্যান্য উপাদানের পৃথক অবদান কত?

৬. ২০২০–২০২৪ সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের লক্ষ্য কত ছিল এবং বাস্তব আদায় কত হয়েছে?

৭. পুনঃতফসিল করা ঋণের কত অংশ নিয়মিত হয়েছে এবং কত অংশ আবার খেলাপি হয়েছে?

৮. বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় জনতা ব্যাংকের কোন কোন বড় ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে এবং সেগুলোর কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে?

৯. মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক কী পরিকল্পনা নিয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

১০. আব্দুছ ছালাম আজাদ, মো. আব্দুল জব্বার, মো. গোলাম মর্তুজা ও মো. মাজিবুর রহমানের দায়িত্বকালে অনুমোদিত, পুনঃতফসিলকৃত ও খেলাপি হওয়া বড় ঋণগুলোর পৃথক হিসাব কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে?

আর্থিক অবনতির দায় নির্ধারণে দরকার ঋণভিত্তিক হিসাব

জনতা ব্যাংকের ২০২০–২০২৪ সালের প্রকাশিত আর্থিক তথ্য একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখায়: ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে, শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ তীব্রভাবে বেড়েছে, মূলধন ঘাটতি বিস্তৃত হয়েছে এবং ২০২৪ সালে ব্যাংকটি বড় লোকসানের মুখে পড়েছে।

প্রকৃত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন বড় ঋণগ্রহীতাভিত্তিক হিসাব, ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সময়রেখা, পুনঃতফসিলের নথি, নগদ আদায়ের বিবরণ, নিরীক্ষা আপত্তি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ। এসব তথ্য প্রকাশ করা গেলে বোঝা সম্ভব হবে— ব্যাংকের আর্থিক অবনতির পেছনে কোথায় ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, কোথায় নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা, আর কোথায় পুরোনো ঝুঁকির হিসাব নতুন করে সামনে এসেছে।

সূত্র ও তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তি

১. জনতা ব্যাংক পিএলসি—Financial Highlights: https://jb.com.bd/about_us/financial_highlights

২. জনতা ব্যাংক পিএলসি—Annual Reports: https://www.jb.com.bd/financial_reports/annual-reports

৩. জনতা ব্যাংক পিএলসি—MD/CEO-এর তালিকা: https://jb.com.bd/about_us/MD_CEO_and_MD

৪. প্রথম আলো, ২৫ এপ্রিল ২০২৩—“জনতা ব্যাংককে যে দুর্দশায় রেখে বিদায় নিচ্ছেন বর্তমান এমডি”: https://www.prothomalo.com/amp/story/business/bank/acsqoauzkv