Headlines

আনোয়ারায় চিলড্রেন প্লেইসের ৭২০ শ্রমিক, কারখানা নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ— বন্ড সুবিধার বর্তমান অবস্থা কী?

চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মেসার্স চিলড্রেন প্লেইস লিমিটেডের কারখানা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন নথিতে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (DIFE) অনলাইন ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানটিকে নিবন্ধিত দেখানো হলেও একই নথিতে কারখানাটির নিবন্ধনের মেয়াদ ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে শেষ হয়ে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। অথচ পরবর্তী সময়েও প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কারখানাটির বর্তমান নিবন্ধন, বন্ড লাইসেন্স এবং বন্ড সুবিধার বৈধ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

DIFE-এর প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, Children Place Limited-এর কারখানার ঠিকানা ভাটুয়াপাড়া, ৯ নম্বর পরৈকোড়া, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স/রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৫-০৪-১-০০৩-০০০০১, পুরোনো নম্বর ৫৯৮৭। শিল্প খাত হিসেবে এটিকে গার্মেন্টস/তৈরি পোশাক (নীট) এবং কারখানার শ্রেণি ‘জি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সরকারি রেকর্ডে মোট শ্রমিকের সংখ্যা ৭২০ জন—২৪০ + ৪৮০। কিন্তু ওই রেকর্ডেই নিবন্ধনের মেয়াদ ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

মেয়াদ শেষের পরও বাণিজ্যিক কার্যক্রম?

নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের তথ্যের কারণে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) প্রকাশ্য ডাটাবেজে Children Place Ltd.-কে এখনও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সেখানে আনোয়ারার একই কারখানার ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের HS Code-ও সেখানে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এদিকে বাণিজ্য-তথ্যভিত্তিক একটি ডাটাবেজের হিসাবে মে ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ সময়ে Children Place Limited-এর নামে প্রায় ১.৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি এবং ৬.১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আমদানির ১৭১টি এবং রপ্তানির ২৪৮টি চালানের তথ্যও সেখানে দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ, DIFE-এর প্রকাশ্য রেকর্ডে কারখানার নিবন্ধনের মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার তথ্য থাকার পরও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই বাণিজ্য কার্যক্রমের প্রতিটি চালান বন্ড সুবিধায় হয়েছে কিনা, সেটি উন্মুক্ত তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বন্ডের পুরোনো রেকর্ডেও প্রতিষ্ঠানটির নাম

বাংলাদেশ কাস্টমসের প্রকাশিত একটি ডাটাবেজে CHILDREN PLACE LIMITED-এর নামে GB802000019 নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট একটি ওয়্যারহাউস নম্বরও দেখা যায়। এটি প্রতিষ্ঠানটির বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার একটি সরকারি রেকর্ড।

তবে এই তথ্য পুরোনো হওয়ায় বর্তমানে ওই বন্ড লাইসেন্স সক্রিয় কিনা, লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে কিনা বা পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কিনা— তা কাস্টমস/বন্ড কমিশনারেটের বর্তমান নথি ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শ্রমিকের সংখ্যাতেও বিভিন্ন তথ্য

শ্রমিক সংখ্যার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উৎসে পার্থক্য রয়েছে। DIFE-এর বর্তমান অনলাইন রেকর্ডে শ্রমিক সংখ্যা ৭২০ জন।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের একটি আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র-সংক্রান্ত প্রকাশ্য ডাটাবেজে Children Place Ltd.-এর জন্য ৭৫০ জন শ্রমিক উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার Mapped in Bangladesh-এর ২০২৪ সালের তথ্যভান্ডারে শ্রমিক সংখ্যা ৫৬৪ জন, মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ৪০ হাজার পিস এবং ৩৫০টি সেলাই মেশিনের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

BGMEA ও EPB-র তথ্যেও আলাদা ঠিকানা

BGMEA-এর সদস্য তথ্য অনুযায়ী Children Place Ltd.-এর কারখানার ঠিকানা ১৩৬, লালচাঁদ রোড, চকবাজার, চট্টগ্রাম এবং প্রতিষ্ঠানের Managing Director হিসেবে Lutfuzzaman Shameem-এর নাম দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের BGMEA Registration No. 3177 এবং EPB Registration No. 2272 উল্লেখ আছে।

অন্যদিকে EPB-এর রেকর্ডে আনোয়ারার ভাটুয়াপাড়া, পরৈকোড়ার ঠিকানাটি কারখানা হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং অফিসের ঠিকানা হিসেবে লালচাঁদ রোডের ঠিকানাটিও রয়েছে।

অতএব দুটি ঠিকানা থাকা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়— একটি অফিস এবং অন্যটি কারখানা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু DIFE, EPB, BGMEA ও বন্ড কমিশনারেটের রেকর্ডে একই প্রতিষ্ঠানের কোন ঠিকানা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অনুমোদিত ঠিকানা কোনটি— তা যাচাই করা জরুরি।

এখন মূল প্রশ্ন বন্ড সুবিধা নিয়ে

Children Place Limited-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন আর শুধু কারখানার নিবন্ধনের মেয়াদ নয়।

প্রশ্ন হলো—

২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি DIFE নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কারখানাটির নিবন্ধন নবায়ন করা হয়েছিল কিনা?

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স সক্রিয় কিনা?

২০২১–২২ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় কত টাকার কাঁচামাল আমদানি হয়েছে?

এসব কাঁচামালের বিপরীতে কত মূল্যের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি হয়েছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

বন্ড অডিটে কোনো ঘাটতি, অনিয়ম, শুল্ক-কর দাবি, জরিমানা বা মামলা শনাক্ত হয়েছে কি না?

বন্ড কমিশনারেটের নথিই দিতে পারে চূড়ান্ত উত্তর

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও পূর্ববর্তী বন্ড লাইসেন্স, গত পাঁচ অর্থবছরের বন্ড সুবিধায় আমদানি-রপ্তানি, কাঁচামালের ব্যবহার, বন্ড অডিট এবং কোনো শুল্ক-কর দাবি বা মামলার তথ্য চাওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে ২০২১–২২ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আমদানি ও রপ্তানির তথ্য পাশাপাশি বসানো গেলে বোঝা যাবে— প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় কী পরিমাণ কাঁচামাল নিয়েছে, তার বিপরীতে কী পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে এবং সরকারি রাজস্বের কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কি না।

সুতরাং, প্রকাশ্য সরকারি নথিতে আপাতত যে অসংগতিটি সবচেয়ে স্পষ্ট— তা হলো: DIFE-এর রেকর্ডে নিবন্ধনের মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শেষ দেখালেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির EPB নিবন্ধন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে বন্ড লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থার যোগসূত্রই এখন অনুসন্ধানের প্রধান প্রশ্ন।

চিলড্রেন প্লেইস লিমিটেডের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।