বন্ড লাইসেন্স Active, SCN Demand ঘরে ঋণাত্মক অঙ্ক; বিভাগ ও সার্কেলের তথ্যেও রয়েছে অসংগতি।
নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা নিয়ে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো। এ সুবিধার বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন, রপ্তানি, মজুত এবং শুল্ক-সংক্রান্ত দায়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা জরুরি। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স সক্রিয় থাকা কিংবা অনলাইন ডেটাবেইসে অডিটের তারিখ প্রদর্শিত হওয়াই তার সব আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের আওতাধীন মেসার্স নীট ভ্যালী ফ্যাশনস লিমিটেডের সরকারি নথি পর্যালোচনায় এমন কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা পাওয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স, SCN Demand-সংক্রান্ত এন্ট্রি, অডিটের তথ্য, রপ্তানি সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা এ অনুসন্ধানের মূল বিষয়।
বন্ড লাইসেন্স ও সরকারি রেকর্ড
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর অনলাইন কোম্পানি সার্চে KNIT VALLEY FASHIONS LTD. নামে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য রয়েছে। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স নম্বর 1995/CUS-SBW/2019। লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯। প্রতিষ্ঠানটির BIN নম্বর 001552601-0403 এবং জেনারেল বন্ড নম্বর GB801191995।
একই ডেটাবেইসে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড স্ট্যাটাস ‘Active’ দেখানো হয়েছে। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে— CS-149, 150, RS-755, 756, গ্রাম কালমা, ডাকঘর ডেইরি ফার্ম, থানা সাভার, ঢাকা।
অর্থাৎ, সরকারি অনলাইন রেকর্ড অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি সক্রিয় বন্ড লাইসেন্সধারী। তবে এই স্ট্যাটাস থেকে একা প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি, উৎপাদন বা শুল্ক-সংক্রান্ত সব হিসাব সঠিক রয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সূত্র: কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)—কোম্পানি সার্চ
বিভাগ ও সার্কেল নিয়ে অসংগতি
প্রতিষ্ঠানটির বিভাগ ও সার্কেল-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ড বিভাগ–১, সার্কেল–৪-এর আওতাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কাস্টমসের অনলাইন কোম্পানি সার্চে প্রতিষ্ঠানটির সার্কেল নম্বর ১৮ দেখানো হয়েছে।
দু’টি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য কেন, তা সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের কাছে যাচাই করা প্রয়োজন। বিভাগ পুনর্বিন্যাস, দায়িত্ব হস্তান্তর, ডেটাবেইস হালনাগাদের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো কারণে এমন পার্থক্য তৈরি হয়েছে কিনা, তা নথি ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই জানতে হবে, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ ও সার্কেল কোনটি এবং বন্ড অডিট, শুল্কদাবি ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত নথি কোন দপ্তরে সংরক্ষিত রয়েছে।
SCN Demand ঘরে ‘-২৭৮.৯৯’: অঙ্কটির অর্থ কী?
কাস্টমসের অনলাইন কোম্পানি সার্চে প্রতিষ্ঠানটির SCN Demand কলামে ‘-২৭৮.৯৯’ প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্য ডেটাবেইসে এই অঙ্কের একক, হিসাবের ভিত্তি কিংবা ঋণাত্মক চিহ্নটির ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়।
SCN সাধারণত Show Cause Notice বা কারণ দর্শানোর নোটিশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো সিস্টেমের নির্দিষ্ট কলামে অঙ্ক প্রদর্শিত হওয়ার অর্থ বুঝতে সংশ্লিষ্ট ডেটাবেইসের নির্দেশিকা ও মূল হিসাবপত্র প্রয়োজন।
এই অঙ্ককে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া শুল্ক, সরকারি পাওনা কিংবা অনিয়মের পরিমাণ হিসেবে দেখানোর মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে, অঙ্কটি ঋণাত্মক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কোনো দায় নেই— এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যাবে না।
এখানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: অঙ্কটির একক কী, এটি কোন সময়ের হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানটির নামে কোনো অনিষ্পন্ন শোকজ নোটিশ বা শুল্কদাবি রয়েছে কিনা। কোনো দাবি থাকলে তার মূল পরিমাণ, সুদ বা জরিমানা, আদায় এবং নিষ্পত্তির অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কাস্টমস্ কতৃপক্ষের কাছে বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হয়েছে।
অডিটের তারিখ আছে, কিন্তু ফলাফল কোথায়?
সরকারি কোম্পানি সার্চে প্রতিষ্ঠানটির অডিট-সংক্রান্ত কলামে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ দেখা যায়। একই রেকর্ডে জেনারেল বন্ড-সংক্রান্ত কলামে ৮ অক্টোবর ২০২৮ এবং নবায়ন-সংক্রান্ত কলামে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৮ তারিখ প্রদর্শিত হয়েছে।
তবে অনলাইন রেকর্ডে তারিখ থাকার অর্থ কী— অডিটের সময়সীমা, নির্ধারিত তারিখ, সম্পাদনের তারিখ, নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক এন্ট্রি— তা মূল নথি ছাড়া নিশ্চিত করা যায় না। ফলে শুধু এই তারিখের ভিত্তিতে অডিট সম্পন্ন হয়েছে, আপত্তি পাওয়া গেছে অথবা সব দায় নিষ্পত্তি হয়েছে— কোনোটিই বলা যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বন্ড অডিট প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি, সংশ্লিষ্ট জবাব, নিষ্পত্তির আদেশ এবং আদায়যোগ্য শুল্কের বিবরণ সংগ্রহ করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো আপত্তি থাকলে সেটি চূড়ান্ত হয়েছে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ আদায় হয়েছে কিনা, তা নথিভিত্তিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বছরে ৬ লাখ ডজন উৎপাদন সক্ষমতা, প্রকৃত রপ্তানি কত?
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-র সদস্যতথ্য অনুযায়ী, নীট ভ্যালী ফ্যাশনস লিমিটেডের সদস্য নিবন্ধন নম্বর ৬৪১৮ এবং ইপিবি নিবন্ধন নম্বর ৬৬৪৬। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ এনামুল হকের নাম উল্লেখ রয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় ৭৫৪টি মেশিন এবং বার্ষিক ৬ লাখ ডজন উৎপাদন সক্ষমতার তথ্য রয়েছে। পোলো শার্ট, টি-শার্ট, বক্সার ও প্যান্টকে প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর রপ্তানিকারক ডেটাবেইসে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিভিন্ন পোশাকের HS কোড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে নিট শার্ট, টি-শার্ট, সোয়েটার, ট্রাউজার ও অন্যান্য পোশাকশ্রেণির কোড রয়েছে।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা ও পণ্যের HS কোড দিয়ে প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ বা মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটি কোন অর্থবছরে কত পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে, তার মূল্য কত এবং বন্ডের আওতায় আমদানি করা কাঁচামালের সঙ্গে সেই রপ্তানির হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে— এসব তথ্য প্রকাশ্য উৎসে নিশ্চিত করা যায়নি।
সূত্র: বিজিএমইএ—প্রতিষ্ঠানের সদস্যতথ্য, ইপিবি—রপ্তানিকারক ডেটাবেইস
শ্রমিকসংখ্যার তথ্যেও পার্থক্য
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অনলাইন রেকর্ডে নীট ভ্যালী ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানাটি নিবন্ধিত দেখানো হয়েছে। সেখানে লাইসেন্স নম্বর ২৬-৭২-১-০০৩-০০৪৯৮ এবং মেয়াদ ২৭ আগস্ট ২০২৭ পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে। একই রেকর্ডে শ্রমিকসংখ্যা ৭০০ ও ৪৫০—মোট ১১৫০ জন।
অন্যদিকে, বিজিএমইএর সদস্যতথ্যে ব্যবস্থাপনা ও কর্মীসংক্রান্ত ঘরে ৮০০ পুরুষ ও ৮০০ নারী কর্মীর তথ্য রয়েছে। দুটি উৎসে প্রদর্শিত সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য আছে।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান জনবল, কর্মীদের শ্রেণিবিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড হালনাগাদের তারিখ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রয়োজন।
সূত্র: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর—কারখানার নিবন্ধন
বন্ড সুবিধার প্রকৃত চিত্র জানতে যেসব নথি প্রয়োজন
নীট ভ্যালী ফ্যাশনসের বন্ড সুবিধার ব্যবহার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে শুধু লাইসেন্স বা অনলাইন স্ট্যাটাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে অন্তত গত পাঁচ অর্থবছরের আমদানি ও রপ্তানির তথ্য, কাঁচামালের মজুত, উৎপাদন ও অপচয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট অডিট প্রতিবেদন।
বিশেষ করে পরীক্ষা করতে হবে—
১. বছরভিত্তিক কত পরিমাণ সুতা, কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে।
২. ওই কাঁচামাল দিয়ে কত পণ্য উৎপাদিত হয়েছে এবং কত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
৩. উৎপাদনজনিত অপচয়, অবশিষ্ট কাঁচামাল ও মজুতের হিসাব বিধি অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়েছে কিনা।
৪. কোনো শোকজ নোটিশ, অডিট আপত্তি বা শুল্কদাবি থাকলে তার বর্তমান অবস্থা কী।
৫. প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও জেনারেল বন্ড-সংক্রান্ত অনুমোদন বর্তমান বিধি ও নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা।
৬. বিভাগ ও সার্কেল-সংক্রান্ত রেকর্ডের পার্থক্যের কারণ কী এবং বর্তমানে কোন দপ্তর প্রতিষ্ঠানটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছে।
এসব নথি পর্যালোচনা করলেই বোঝা সম্ভব হবে, বন্ড সুবিধার ব্যবহার ও হিসাবের মধ্যে কোনো বাস্তব অসংগতি আছে কিনা।
কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রয়োজন
প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত পর্ব করার আগে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের কাছে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদন, SCN Demand-এর ব্যাখ্যা, অনিষ্পন্ন শুল্কদাবি থাকলে তার বিবরণ এবং বিভাগ ও সার্কেল-সংক্রান্ত তথ্যের লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীট ভ্যালী ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি, উৎপাদন ও অডিটের হিসাব সম্পর্কে বক্তব্য নেওয়া দরকার।
প্রকাশ্য সরকারি তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স সক্রিয় থাকা, উৎপাদন সক্ষমতা, নিবন্ধন এবং কিছু প্রশাসনিক তথ্য যাচাই করা গেছে। কিন্তু প্রকৃত আমদানি-রপ্তানি হিসাব, অডিটের ফলাফল এবং SCN Demand-এর অর্থ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
অতএব, নীট ভ্যালী ফ্যাশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কথা বলছে না ফলোআপ নিউজ। তবে বন্ড সুবিধার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, অডিটের ফলাফল এবং সরকারি রেকর্ডের অসংগতির ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
