ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক আধিপত্য— বিভিন্ন প্রশ্নে ভারতের নীতির সমালোচনা করার যথেষ্ট বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে দর-কষাকষি করাও স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্নটি তখনই জটিল হয়ে ওঠে, যখন ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে ধর্মীয় উগ্রবাদ বা চরমপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হয়।
এখানেই বাংলাদেশের সামনে সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বিপদের পরিমাণ অনেক বেশি।
কারণ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা করতে গিয়ে যদি এমন একটি অভ্যন্তরীণ শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা হয়, যার নিজস্ব আদর্শ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে আলাদা প্রকল্প রয়েছে, তাহলে সেই শক্তিকে পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ভারতকে মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশ কি অন্য কারও প্রভাববলয়ে ঢুকবে?
বাংলাদেশের ভূগোল পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা-সম্পর্ক বাংলাদেশের বাস্তবতা। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার; পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হলো ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতা।
অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবের বিরোধিতা করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পশ্চিমা কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়েও নিজের স্বার্থ আদায় করতে পারে।
কিন্তু ভারতবিরোধী রাজনীতিকে যদি একটি বৃহত্তর ধর্মীয় বা ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়— বাংলাদেশ কি ভারতের প্রভাব কমাচ্ছে, নাকি কেবল একটি প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে অন্য একটি প্রভাববলয়ে প্রবেশ করছে?
সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে উগ্রবাদকে ‘রাজনৈতিক সম্পদ’ মনে করা
ধরা যাক, কোনো রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী মনে করল— ভারতের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে কঠোর অবস্থানের ধর্মীয় শক্তিকে ব্যবহার করা যাবে। তারা হয়তো মনে করতে পারে, এই শক্তিকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে পরে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা কিন্তু উল্টো শিক্ষা দেয়।
যে শক্তিকে mobilise করা যায়, তাকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
একটি উগ্রবাদী বা চরমপন্থী গোষ্ঠী প্রথমে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে মাঠে নামতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের পর তার নিজস্ব agenda সামনে আসবে।
আজ agenda হতে পারে ভারতবিরোধিতা।
আগামীকাল সেটি হতে পারে পশ্চিমাবিরোধিতা।
তারপর হতে পারে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বিরোধিতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বিরোধিতা কিংবা রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের আদর্শ অনুযায়ী পুনর্গঠনের দাবি।
তখন যে রাজনৈতিক শক্তি তাদের ব্যবহার করেছিল, তারাই হয়তো তাদের রাজনৈতিক দাবির কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে।
ভারতবিরোধিতা যদি জাতীয় স্বার্থের বদলে পরিচয়ের রাজনীতি হয়ে যায়
ভারতের কোনো নির্দিষ্ট নীতির বিরোধিতা এবং ভারতবিরোধিতাকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত করা— দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
প্রথমটি কূটনৈতিক কৌশল।
দ্বিতীয়টি হতে পারে রাজনৈতিক মেরুকরণ।
বাংলাদেশের স্বার্থ হলো ভারতের সঙ্গে যেখানে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে সেখানে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা করা।
কিন্তু যদি ‘ভারতবিরোধিতা’ এতটাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে ভারতের সঙ্গে যেকোনো সহযোগিতাকেই বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখানো শুরু হয়, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা আবেগের কাছে পরাজিত হতে পারে।
একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আবেগ দিয়ে নয়, স্বার্থ দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত।
এর পরিণতি হতে পারে একটি বিপজ্জনক নিরাপত্তা চক্র
ভারতবিরোধী উগ্রবাদ বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়তে পারে।
ভারত তখন বাংলাদেশের সীমান্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে পারে। বাংলাদেশ সেই নিরাপত্তা তৎপরতাকে আবার ভারতের হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
ফলে তৈরি হতে পারে একটি self-reinforcing cycle:
উগ্র ভারতবিরোধিতা → ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ → ভারতীয় নিরাপত্তা তৎপরতা → বাংলাদেশের আরও ভারতবিরোধী প্রতিক্রিয়া → আরও উগ্রতা।
এই চক্রের শেষ কোথায়?
সাধারণ বাংলাদেশির জন্য সেখানে লাভ খুব কম। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যয়, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ঝুঁকি বাড়তে থাকবে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতার
বাংলাদেশের উচিৎ কোনো একটি শক্তির শিবিরে নিজেকে আটকে না ফেলা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ভারতনির্ভরতা নয়।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু চীননির্ভরতা নয়।
পাকিস্তান, তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু তাদের কোনো ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হওয়াও নয়।
এই নীতিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
কিন্তু উগ্র ভারতবিরোধী রাজনীতি যদি বাংলাদেশকে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় বা anti-India geopolitical bloc-এর দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে বাংলাদেশের strategic autonomy সংকুচিত হতে পারে।
অর্থাৎ ভারতকে ঠেকাতে গিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, যেখানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই কমে যাবে।
তাহলে কি ভারতের সমালোচনা করা যাবে না?
অবশ্যই যাবে।
বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও দৃঢ়, তথ্যভিত্তিক এবং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি প্রয়োজন।
সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কিংবা যেকোনো অসম চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
কিন্তু তার জন্য উগ্রবাদকে প্রয়োজন নেই।
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজের কূটনীতি দিয়ে প্রতিবেশীকে মোকাবিলা করে; নিজের ভেতরে এমন শক্তি তৈরি করে না, যাকে পরে রাষ্ট্রকেই মোকাবিলা করতে হতে পারে।
মূল প্রশ্ন তাই ভারত নয়— বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিৎ নয়—
“আমরা ভারতের বিরুদ্ধে কতটা যেতে পারি?”
প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—
“ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?”
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভারত একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নীতি পরিবর্তন হতে পারে, সম্পর্কের উত্থান-পতন হতে পারে। কিন্তু ভূগোল বদলাবে না।
তাই ভারতের সঙ্গে স্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের কোনো কৌশল হতে পারে না।
একইভাবে ভারতের সঙ্গে অন্ধ আনুগত্যও বাংলাদেশের স্বার্থ নয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন স্বাধীন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।
শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিটা কোথায়?
উগ্রবাদকে ব্যবহার করে ভারতকে দুর্বল করার কৌশল হয়তো স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক লাভ দিতে পারে। এতে কিছু রাজনৈতিক শক্তি জনপ্রিয়তা পেতে পারে, ভারতের ওপর কিছুটা চাপও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য হতে পারে অনেক বেশি—
অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ, উগ্রবাদের বিস্তার, নিরাপত্তা সংকট, প্রতিবেশীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং নতুন কোনো বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাটি হলো— যে শক্তিকে ব্যবহার করে ভারতীয় প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, একসময় সেই শক্তিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করতে পারে।
তখন বাংলাদেশ হয়তো ভারতের প্রভাব থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়নি।
বরং এক প্রভাববলয় থেকে অন্য প্রভাববলয়ে চলে গেছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য কৌশলটি হওয়া উচিত—
India-first নয়, China-first নয়, Pakistan-first নয়, West-first নয়— Bangladesh-first।
ভারতের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ়তা থাকবে, কিন্তু উগ্রবাদকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের হাতিয়ার করা হবে না।
কারণ ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি বাংলাদেশের নিজের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সামাজিক স্থিতি এবং কৌশলগত স্বাধীনতাই দুর্বল হয়ে যায়— তাহলে সেই লড়াইয়ে বিজয়ী আসলে কে?
