মানুষের অসহায়ত্ব কি চিকিৎসাবাণিজ্যের পুঁজি, চিকিৎসকের যোগ্যতা ও চিকিৎসার যৌক্তিকতা যাচাই করবে কোন প্রতিষ্ঠান?
ফলোআপ নিউজ | অনুসন্ধান
একজন মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, ওষুধের কার্যকারিতা কিংবা পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অধিকাংশ রোগীরই পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকে না। চিকিৎসক যে ওষুধ লিখছেন, সেটি তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কিনা, কিংবা যে পাঁচটি পরীক্ষা করতে বলা হচ্ছে, সব কটিই প্রয়োজনীয় কি না— তা যাচাই করার সক্ষমতাও সাধারণত রোগীর থাকে না। চিকিৎসকের জ্ঞান ও পেশাগত সততার ওপর আস্থা রেখেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কিন্তু সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ কিংবা বারবার চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেন, তাহলে রোগী প্রতিকার চাইবেন কোথায়? চিকিৎসককে প্রশ্ন করার মতো জ্ঞান তার নেই, আবার চিকিৎসককে বিশ্বাস না করেও তার উপায় নেই। এই অসম সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মানুষের অসুস্থতা, উদ্বেগ ও মৃত্যুভয়কে পুঁজি করে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কিনা, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
এমবিবিএস ডিগ্রি থাকলেই কি চিকিৎসায় দক্ষতা প্রমাণিত হয়?
এমবিবিএস ডিগ্রি একজন চিকিৎসকের প্রাথমিক পেশাগত শিক্ষার স্বীকৃতি। কিন্তু ডিগ্রি অর্জন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা, নৈতিকতা এবং রোগীর প্রতি দায়িত্বশীলতা এক বিষয় নয়। একজন চিকিৎসকের বহু বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে চিকিৎসকের বয়স বা অভিজ্ঞতা কম হলেই তিনি অদক্ষ— এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, চিকিৎসকের পেশাগত দক্ষতা ও আচরণ নিয়মিত মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে? চিকিৎসক সর্বশেষ কখন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, আধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করেন ক না, রোগীর ইতিহাস যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেন কিনা এবং ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কিনা— এসব বিষয়ে জনসাধারণ কতটুকু জানতে পারেন?
চিকিৎসকের ডিগ্রি যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু ডিগ্রি যাচাই আর চিকিৎসার মান যাচাই এক নয়। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

কী বুঝে ওষুধ, কী বুঝে পরীক্ষা?
চিকিৎসক কোনো ওষুধ লিখলে রোগীর জানার অধিকার রয়েছে— ওষুধটি কেন দেওয়া হচ্ছে, কী উপকার প্রত্যাশিত, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী এবং বিকল্প চিকিৎসা রয়েছে কিনা। একইভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও রোগীর প্রশ্ন থাকতে পারে: পরীক্ষাটি কেন প্রয়োজন, কী রোগ শনাক্ত করতে এটি সাহায্য করবে এবং পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত কীভাবে পরিবর্তিত হবে?
অবশ্য সব পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা রোগী নিজে নির্ধারণ করতে পারবেন না। রোগের জটিলতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি কিংবা বিপজ্জনক অবস্থা শনাক্ত করতে একাধিক পরীক্ষা অপরিহার্য হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসকের পেশাগত বিবেচনার অর্থ এই নয় যে রোগীকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হবে না।
প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসায় রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার যৌক্তিকতা, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিকল্প সম্পর্কে যথাসম্ভব স্বচ্ছ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কোনো কোনো রোগীর অভিযোগ, তারা প্রেসক্রিপশনে ওষুধ ও পরীক্ষার নাম পেলেও সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পান না। এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও সত্যতা নির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
চিকিৎসাসেবা, নাকি অসুস্থতাকে ঘিরে বাণিজ্য?
হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ কোম্পানি এবং চিকিৎসকের মধ্যে আর্থিক স্বার্থের সম্পর্ক থাকলে চিকিৎসার সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কোনো চিকিৎসক রোগীকে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন নিচ্ছেন কি না, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে কিনা, কিংবা ওষুধ কোম্পানির আর্থিক প্রণোদনা প্রেসক্রিপশনকে প্রভাবিত করছে কিনা— এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনই কি সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলোর আর্থিক স্বার্থও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে?
অভিযোগ থাকলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা না থাকলে কিংবা তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে না এলে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধও গড়ে ওঠে না। চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই অনৈতিক আচরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের জবাবদিহি চাইবে কে?
বাংলাদেশে চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও পেশাগত আচরণ তদারকির জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরেও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ জানানো যায়। অর্থাৎ অভিযোগ জানানোর কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পথ রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ব্যবস্থায় চিকিৎসকের পেশাগত অবহেলা, অনৈতিক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিংবা আর্থিক স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ কতটা কার্যকরভাবে তদন্ত করা হয়? গত পাঁচ বছরে কতটি অভিযোগ জমা পড়েছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং কতজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— এসব তথ্য কি নিয়মিত ও সহজে জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়?
নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, সিদ্ধান্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আপিলের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ— তা পরিসংখ্যান ও নথির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, অযৌক্তিক হয়রানি ও জনরোষের অপব্যবহার থেকেও সুরক্ষা দিতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের অধিকার রক্ষায় ন্যায়সংগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
রোগীর অসহায়ত্বের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে কি?
চিকিৎসা একটি বিশেষায়িত পেশা। তাই রোগী প্রতিটি সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক যথার্থতা নিজে যাচাই করতে পারবেন— এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। চিকিৎসকের পেশাগত জ্ঞান ও সততার ওপর নির্ভর করা রোগীর জন্য প্রায় অনিবার্য। ফলে সেই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হলে তার প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু রোগীর নয়; রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেরও।
চিকিৎসকের যোগ্যতা যাচাই, পেশাগত আচরণের তদারকি, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভিযোগ তদন্ত, রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে প্রবেশাধিকার এবং অভিযোগের ফলাফল প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীকে চিকিৎসার ব্যাখ্যা চাওয়া, প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত নেওয়া এবং অনিয়মের প্রতিকার চাওয়ার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে।
মানুষ চিকিৎসকের কাছে জীবন বাঁচানোর আশায় যান, নিজের অসহায়ত্বের মূল্য দিতে নয়। চিকিৎসককে সম্মান করা এবং তার পেশাগত সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।
ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানী প্রশ্ন তাই স্পষ্ট: চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রকৃত চিত্র কী? চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও পেশাগত আচরণ মূল্যায়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা কতটুকু? আর রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কেউ অনৈতিক ব্যবসা করলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে পালন করছে?
