একই সমাজে মানুষ এত ভিন্ন হয় কেন?
একই দেশের মানুষ। একই অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কখনো একই পরিবার, একই স্কুল, একই পাড়া। কেউ অন্যের কষ্ট দেখলে থেমে যায়, সাহায্যের হাত বাড়ায়। আবার কেউ সেই কষ্টের মধ্যেও নিজের লাভ খুঁজে নেয়। কেউ ক্ষমতা পেলে আরও দায়িত্বশীল হয়, কেউ ক্ষমতা পেলে অন্যকে আরও ছোট করে।
তাহলে মানুষ মানবিক হয় কীসে?
শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায়? শুধু শিক্ষায়? শুধু ভালো পরিবারে বড় হওয়ার কারণে? যদি তাই হতো, তাহলে একই সমাজে মানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা পাশাপাশি দেখা যেত না।
সম্ভবত মানুষের ভেতরের গল্পটি এক ব্যক্তি একা লেখে না। গল্পটির লেখক অনেকজন।
তার প্রথম লেখক হতে পারে জীববিজ্ঞান।
মানুষ জন্মের সময় সম্পূর্ণ সাদা কাগজ নিয়ে আসে—এ ধারণাটি এখন আর যথেষ্ট নয়। মানুষের temperament, আবেগপ্রবণতা, ভয়, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, সামাজিক সংবেদনশীলতা কিংবা অন্যের আবেগ উপলব্ধি করার ক্ষমতার মধ্যে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকে। এসব পার্থক্যের কিছু জৈবিক ও জেনেটিক ভিত্তিও থাকতে পারে।
কিন্তু জিন কোনো মানুষের কপালে লিখে দেয় না—‘এই মানুষটি ভালো হবে’ অথবা ‘এই মানুষটি নিষ্ঠুর হবে’।
জিন হয়তো কিছু দরজা সহজ করে দেয়, কিছু দরজা কঠিন করে দেয়। কিন্তু কোন দরজা দিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত হাঁটবে, তার ওপর আরও অনেক কিছুর প্রভাব থাকে।
তারপর আসে শৈশব।
একটি শিশু যখন বারবার দেখে যে দুর্বল মানুষকে অপমান করা হচ্ছে, সে দুটি ভিন্ন শিক্ষা পেতে পারে। সে ভাবতে পারে, ‘দুর্বল হওয়া বিপজ্জনক, তাই আমাকে শক্ত হতে হবে।’ আবার সে ভাবতে পারে, ‘দুর্বল মানুষের এই কষ্ট আমি বুঝি; অন্য কাউকে যেন এটি সহ্য করতে না হয়।’
একই ঘটনা। কিন্তু দুটি ভিন্ন গল্প।
এখানেই মানুষের অভিজ্ঞতার অর্থ তৈরি করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কষ্ট মানুষকে সবসময় নিষ্ঠুর করে না। কখনো কষ্ট মানুষকে আরও মানবিক করে।
যে মানুষ ক্ষুধা দেখেছে, সে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি আরও নিষ্ঠুর হতে পারে। আবার সেই মানুষই ভাবতে পারে—‘আমি জানি ক্ষুধা কাকে বলে; তাই অন্য কাউকে ক্ষুধার্ত দেখলে আমি চুপ থাকতে পারি না।’
অর্থাৎ ঘটনা একা মানুষকে তৈরি করে না। ঘটনাকে মানুষ কী অর্থ দিচ্ছে, সেটিও মানুষকে তৈরি করে।
এ কারণেই একই দেশে, একই দারিদ্র্যের মধ্যে, একই সামাজিক অনিশ্চয়তায় বড় হয়েও মানুষের চরিত্র এক হয় না।
তবে সমাজের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না।
মানুষ যদি এমন সমাজে বাস করে যেখানে নিয়ম মানা মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্যায় দ্রুত পুরস্কৃত হয়, তাহলে সামাজিক আস্থা দুর্বল হতে পারে। মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে—‘আমি কেন ভালো থাকব, যদি অন্যরা ভালো থাকার সুযোগটাই না দেয়?’
এখানে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়।
অবিশ্বাস থেকে আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে অন্যের ক্ষতি, অন্যের ক্ষতি থেকে আরও অবিশ্বাস।
অন্যদিকে একটি সমাজ যদি মানুষকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক আস্থার অভিজ্ঞতা দেয়, তাহলে সহযোগিতা করার প্রণোদনাও বাড়ে।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়।
সবকিছু যদি পরিবেশের ওপর নির্ভর করত, তাহলে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে আসা অসংখ্য মানবিক মানুষ আমরা দেখতাম না।
আমরা দেখি— অভাবের মধ্যেও কেউ নিজের খাবার ভাগ করে দেয়। নিজের সামান্য উপার্জন থেকেও কেউ অন্যের চিকিৎসায় সাহায্য করে। নিজের সঙ্গে অন্যায় হওয়ার পরও কেউ অন্যের প্রতি অন্যায় করতে অস্বীকার করে।
তাহলে সেখানে কী কাজ করে?
সম্ভবত নৈতিক বোধ, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা।
মানুষের জীবনে একটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে— সে নিজের জীবন সম্পর্কে একটি গল্প তৈরি করে।
‘পৃথিবী নিষ্ঠুর, তাই আমাকেও নিষ্ঠুর হতে হবে।’
অথবা—
‘পৃথিবী আমার প্রতি যথেষ্ট মানবিক ছিল না, তাই অন্তত আমি অন্যের প্রতি মানবিক হব।’
দুটি গল্পের যেকোনো একটিকে মানুষ নিজের পরিচয়ের অংশ করে নিতে পারে।
এখানেই হয়তো মানবিকতার সবচেয়ে গভীর জায়গাটি।
মানুষ শুধু তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা নয়; সে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর অর্থ কী বানিয়েছে— সেটিও।
এই কারণেই মানবিকতা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, শুধু জেনেটিক্সের বিষয় নয়, শুধু শিক্ষার বিষয়ও নয়।
এটি একটি জটিল সমন্বয়।
জীববিজ্ঞান মানুষকে কিছু প্রবণতা দেয়।
পরিবার তাকে কিছু ভাষা শেখায়।
সমাজ তাকে কিছু নিয়ম শেখায়।
অভিজ্ঞতা তাকে কিছু ক্ষত দেয়।
শিক্ষা তাকে সেই অভিজ্ঞতা বোঝার কিছু উপায় দেয়।
আর শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের ভেতরে একটি গল্প তৈরি করে।
সেই গল্পেই হয়তো তার মানবিকতার বড় অংশ বাস করে।
তাই মানবিক সমাজ তৈরি করতে শুধু মানুষকে ‘ভালো হও’ বলা যথেষ্ট নয়। এমন পরিবার দরকার যেখানে শিশুকে সম্মান শেখানো হয়। এমন শিক্ষা দরকার যেখানে অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে শেখানো হয়। এমন রাষ্ট্র দরকার যেখানে ন্যায়বিচার বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়। এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ দরকার যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত অন্যকে পরাজিত করতে না হয়।
কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরেকটি জিনিস প্রয়োজন— নিজের গল্পটি পুনরায় লেখার ক্ষমতা।
কারণ মানুষের অতীত তার গল্পের প্রথম কয়েকটি অধ্যায় লিখতে পারে। পরিবেশ পরের অধ্যায়গুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে। জিন হয়তো গল্পটির কিছু প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
কিন্তু পুরো বইটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না।
মানুষ কখনো কখনো নিজের গল্পের লেখকও হয়ে উঠতে পারে।
আর সম্ভবত সভ্যতার সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন মানুষ বুঝতে শিখবে—
অন্য মানুষের ভালো থাকা আমার পরাজয় নয়।
বরং এমন একটি পৃথিবী, যেখানে অন্য মানুষ নিরাপদ, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে, সেই পৃথিবীতেই আমার নিজের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সম্ভাবনাও বাড়ে।
মানবিক জীবন তাই কেবল নৈতিক আদর্শ নয়; এটি একটি সামাজিক বুদ্ধিমত্তাও।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত তাই শুধু—
“মানুষ কেন মানবিক হয়?”
নয়।
প্রশ্নটি আরও গভীর:
“মানুষ তার ভেতরের গল্পটি কীভাবে লেখে— আর সেই গল্পে অন্য মানুষের জন্য কতটুকু জায়গা রাখে?”
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
