Headlines

কূটনৈতিক বন্ডে হাজার হাজার কোটি টাকার মদ আমদানি, নজরদারিতে ফাঁক কোথায়?

বন্ড সুবিধা

শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ; টস বন্ডের চার গুদাম সিলগালা, কমিশনার আবু ওবায়দাকে ঘিরেও ছিলো  অভিযোগ।

ফলোআপ নিউজ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

বাংলাদেশে কূটনীতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির যে ব্যবস্থা রয়েছে, তার আওতায় বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ আমদানি হয়। এই সুবিধার অপব্যবহার, অননুমোদিত গুদামে পণ্য মজুত এবং শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ নতুন করে কাস্টমসের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

গত ২ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডের চারটি গুদাম সিলগালা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ। এনবিআরের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির দুটি গুদামের অনুমোদন থাকলেও পণ্য চারটি স্থানে মজুত পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে গুরুতর অসংগতি শনাক্তের কথা জানায় কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি অধিকতর তদন্তাধীন। সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২ অক্টোবর ২০২৬।

বন্ড সুবিধা
শুল্কমুক্ত সুবিধার আড়ালে কোটি কোটি টাকার মদের অবৈধ কারবার! 🍾🚫 কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকে অবৈধভাবে বাইরে মদ বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ পাসবুকের আড়ালে কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ মদের চালান খোলা বাজারে চলে যাচ্ছে? অবিলম্বে কাস্টমস ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কিন্ত কে আসলে কাস্টমস্, কে আসলে প্রশাসন? তারা এদের সাথে সুবিধার হিসেবে যুক্ত নাকি বিযুক্ত?

পাঁচ বছরে আমদানি ২ কোটি লিটারের বেশি

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৮ জানুয়ারি ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ থেকে ২০২০–২১ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ২ কোটি ১৮ লাখ লিটার বিদেশি মদ আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে বাণিজ্যিক আমদানিকারকের মাধ্যমে এসেছিল মাত্র ১১ লাখ লিটার। অবশিষ্ট প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ লিটার এসেছিল ছয়টি বেসরকারি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই পাঁচ বছরে বিদেশি মদ আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল মাত্র ৫২ কোটি টাকা। সূত্র: The Business Standard।

এটি পুরোনো সময়ের হিসাব; বর্তমান আমদানি বা রাজস্বের পরিমাণ নয়। তবে এই পরিসংখ্যান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন ওঠে— দেশে বিপুল পরিমাণ মদ আমদানি হলেও তার কতটুকু অনুমোদিত ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব রয়েছে কি না?

কাদের জন্য এই শুল্কমুক্ত সুবিধা?

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর সরকারি ওয়েবসাইটে কূটনৈতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য আটটি বন্ডেড ওয়্যারহাউসের তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ওয়্যারহাউস, সাবির ট্রেডার্স, ঢাকা ওয়্যারহাউস, টস বন্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, এইচ. কবির অ্যান্ড কোম্পানি, ইস্টার্ন ডিপ্লোম্যাটিক সার্ভিসেস এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

কাস্টমসের প্রকাশিত বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে কূটনীতিক এবং বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা শুল্কমুক্ত পণ্য কেনার সুযোগ পান। এ সুবিধা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য উন্মুক্ত নয়। সূত্র: কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)।

অতএব, এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কত মদ আমদানি হয়েছে, তা নয়। বরং আমদানি করা পণ্য কোথায় রাখা হয়েছে, কার কাছে বিক্রি হয়েছে, বিক্রির অনুমোদন ছিল কিনা এবং গুদামের মজুত ও বিক্রির হিসাব পরস্পরের সঙ্গে মিলেছে কিনা— সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আবু ওবায়দাকে ঘিরে অভিযোগ

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দাকে ঘিরে ২৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শতকোটি টাকার বন্ড কারসাজি, জাল দলিল, রাজস্ব ফাঁকি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের কথা বলা হয়। ওই প্রতিবেদনে মো. আক্তার উজ জামান নামে এক ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায়ের কথাও বলা হয়েছে। সূত্র: দৈনিক সমবাংলা।

তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের সমর্থনে পূর্ণাঙ্গ মূল নথি কিংবা আদালতের সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে টস বন্ডের গুদাম সিলগালার ঘটনারও সরাসরি যোগসূত্র এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নয়।

সুতরাং দুটি বিষয়কে আলাদা রেখেই অনুসন্ধান করতে হবেঃ একদিকে কূটনৈতিক বন্ডের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পণ্য তদারকি, অন্যদিকে আবু ওবায়দাকে ঘিরে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগ।

তদন্তের কেন্দ্রে যে প্রশ্নগুলো

এই খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে এনবিআর, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের নথি যাচাই প্রয়োজন।

১. ২০২১–২২ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কূটনৈতিক বন্ডের মাধ্যমে কত লিটার মদ আমদানি হয়েছে এবং এর মূল্য কত?

২. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আমদানির পরিমাণ, অনুমোদিত গুদাম, প্রকৃত মজুত ও বিক্রির হিসাব কী?

৩. অনুমোদিত ক্রেতাদের কাছে বিক্রির প্রমাণ হিসেবে পাসবুক ও অন্যান্য নথি কতটা নিয়মিত যাচাই করা হয়?

৪. কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অননুমোদিত গুদামে পণ্য মজুত, জাল নথি, সফটওয়্যার জালিয়াতি কিংবা খোলাবাজারে শুল্কমুক্ত মদ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে তার তদন্ত ও রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি কী?

৫. আবু ওবায়দাকে ঘিরে অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমদানি ঘোষণা, কাস্টমসের ছাড়পত্র, গুদাম রেজিস্টার, বিক্রির রেকর্ড, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং তদন্তের অগ্রগতি মিলিয়ে দেখতে হবে।

রাজস্বের ক্ষতি হলে দায় কার?

কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুবিধা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। এটি একটি অনুমোদিত ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিকে আইনসম্মত শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া। কিন্তু সেই সুবিধার আওতায় আমদানি করা পণ্য যদি অননুমোদিত গুদামে রাখা হয় বা যোগ্যতাবিহীন ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে।

এই খাতে অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হলে শুধু গুদাম সিলগালা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। তদন্তের ফল, প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতি, দায়ী পক্ষ এবং আদায় করা অর্থের হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানী প্রশ্ন তাই সরলঃ কূটনৈতিক বন্ডের নামে কত পণ্য আমদানি হচ্ছে, তার কতটুকু নির্ধারিত নিয়মে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে তার দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করছে?

সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোটঃ বর্তমান আমদানির মোট পরিমাণ, টস বন্ডের তদন্তের চূড়ান্ত ফল এবং আবু ওবায়দাকে ঘিরে অভিযোগের সরকারি অবস্থান পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও নির্দিষ্ট নথিভিত্তিক অনুসন্ধানে উন্নীত করা হবে।