ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী, অবকাঠামো বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নয়; তার শক্তি নির্ভর করে নাগরিকের আস্থার ওপর। সেই আস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো করব্যবস্থা। মানুষ কর দেয় এই বিশ্বাসে যে, সেই অর্থ দিয়ে রাষ্ট্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। কিন্তু যখন কর আদায়ের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে হয়রানি, জটিলতা, অস্বচ্ছতা কিংবা বৈষম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন শুধু অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অর্থনীতিতে ভ্যাটকে একটি পরোক্ষ কর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর একটি বড় সমালোচনা হলো— এটি অনেক ক্ষেত্রে রিগ্রেসিভ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। কারণ একই হারে ভ্যাট পরিশোধ করলেও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের তুলনায় করের চাপ অনেক বেশি পড়ে। একজন দিনমজুর, একজন ক্ষুদ্র দোকানি এবং একজন কোটিপতি যখন একই পণ্যের ওপর একই হারে ভ্যাট দেন, তখন সেই করের প্রকৃত বোঝা সমান থাকে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি চাকরি পান না; বরং নিজেরাই ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, কারখানা, ওয়ার্কশপ বা সেবাভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থানের বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ থেকে।
প্রশ্ন হলো— যে মানুষটি নিজের পুঁজি, শ্রম ও ঝুঁকি নিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, রাষ্ট্র কি তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে? নাকি করব্যবস্থার জটিলতা তার পথ আরও কঠিন করে তুলছে?
বড় একটি কোম্পানির জন্য কর পরামর্শক, হিসাবরক্ষক, সফটওয়্যার এবং আইনগত সহায়তা রাখা সম্ভব। কিন্তু একজন ছোট উদ্যোক্তার পক্ষে সেই সক্ষমতা প্রায়ই থাকে না। ফলে জটিল নিয়ম, কাগজপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, কর আদায়ের লক্ষ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কর আদায়ের খরচ (Cost of Compliance) কমিয়ে আনা।
এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কর প্রশাসনের দর্শন কী হবে? করদাতাকে কি সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখা হবে, নাকি রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে?
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে কর প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য শাস্তি নয়; বরং স্বেচ্ছায় কর পরিশোধের পরিবেশ তৈরি করা। সেখানে সহজ নিয়ম, ডিজিটাল সেবা, দ্রুত তথ্যপ্রাপ্তি এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের মাধ্যমে করদাতার সময় ও ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়। কারণ কর সংগ্রহের সবচেয়ে কার্যকর উপায় ভয় নয়, আস্থা।
বাংলাদেশে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উচ্চশিক্ষিত নন। অনেকেই প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তা। তাদের কাছে জটিল কর আইন বোঝা সহজ নয়। তাই সহজ ভাষায় নির্দেশিকা, প্রশিক্ষণ, অনলাইন সহায়তা এবং সেবামুখী প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন যত জটিল হবে, বিভ্রান্তির সুযোগ তত বাড়বে; আর বিভ্রান্তি বাড়লে অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, ব্যবসার ব্যয় বাড়লে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়, কর-সংক্রান্ত খরচ কিংবা অন্যান্য ব্যয় অনেক সময় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দাম না বাড়িয়ে পণ্যের মান বা পরিমাণ কমিয়ে দেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষই।
তবে কর নিয়ে আলোচনায় আরেকটি প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়— রাষ্ট্র যে অর্থ সংগ্রহ করছে, তা কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করছে?
বিশ্বের যেসব দেশে কর সংস্কৃতি শক্তিশালী, সেসব দেশে নাগরিকেরা শুধু কর দেন না; করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটিও জানতে পারেন। সংসদীয় তদারকি, স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত বাজেট তথ্য এবং গণমাধ্যমের অনুসন্ধান— এসবের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। করদাতার অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির একটি মৌলিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশেও এই প্রশ্ন আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা সেবাখাত— সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। করদাতা জানতে চাইতেই পারেন— তার অর্থের বিনিময়ে তিনি কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন।
কর আদায় এবং সরকারি ব্যয়— এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যদি মানুষ মনে করেন করের অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে কর দেওয়ার মানসিকতাও বাড়ে। আবার যদি তারা অপচয়, অদক্ষতা বা দুর্নীতির ধারণা পোষণ করেন, তাহলে করব্যবস্থার প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই কর নীতির পাশাপাশি সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে।
নিউজিল্যান্ডের GST ব্যবস্থা সহজ, একক এবং তুলনামূলকভাবে কম জটিল। সিঙ্গাপুর GST বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা চালু করেছে, যাতে অতিরিক্ত চাপ কমে। কানাডায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বিভিন্ন ট্যাক্স ক্রেডিট পায়। ইউরোপের বহু দেশে খাদ্য, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কম ভ্যাট হার বা বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন সময় এসেছে করনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার। কর আদায় বাড়ানো অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই করব্যবস্থা যদি উৎপাদন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানের পথে অযথা বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কর প্রশাসনের সফলতা শুধু কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়; বরং কত নতুন ব্যবসা টিকে থাকল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কত মানুষ স্বেচ্ছায় কর দিতে আগ্রহী হলো— সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের উচিত করদাতাকে সন্দেহের চোখে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে শত্রু নয়, অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা। আর নাগরিকেরও অধিকার আছে জানতে চাওয়ার— তার করের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের ফল তিনি কতটা পাচ্ছেন।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কর আদায়ের বৈধতা কেবল আইন থেকে আসে না; আসে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি থেকে। নাগরিক যদি দেখেন যে করব্যবস্থা ন্যায্য, প্রশাসন সেবামুখী এবং সরকারি ব্যয় জবাবদিহির আওতায়, তাহলে কর পরিশোধ শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়— রাষ্ট্র গঠনে অংশগ্রহণের একটি ইতিবাচক দায়িত্বে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল আরও বেশি কর আদায় করা নয়; বরং এমন একটি করব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন নিরুৎসাহিত হবে না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ভয় পাবেন না, সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত চাপ অনুভব করবেন না এবং করদাতা বিশ্বাস করবেন— তার দেওয়া প্রতিটি টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হচ্ছে।
সেই দিনই কর হবে উন্নয়নের শক্তি, আতঙ্কের নয়।
