২০২২ সালে ২ লাখ টাকা জরিমানা, VAT নিয়ে তদন্তে অসঙ্গতি, হাইকোর্টে গড়ানো অভিযোগ; ২০২৬ সালেও খাবার খেয়ে পর্যটক অসুস্থের অভিযোগ।
নিজস্ব প্রতিবেদক | কক্সবাজার
কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার পরিচিত রেস্টুরেন্ট আল-গণি। পর্যটকদের কাছে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গত কয়েক বছরে একের পর এক অভিযোগ ও অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। কখনো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের দায়ে জরিমানা, কখনো VAT হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, আবার ২০২৬ সালে খাবার খেয়ে পর্যটক অসুস্থ হওয়ার অভিযোগের পর ফের অভিযানে রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়ার তথ্য— সব মিলিয়ে আল-গণির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর পাশাপাশি কক্সবাজারের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় আল-গণির রেস্টুরেন্ট পরিচালনায় ব্যবহৃত জায়গার একটি অংশ সরকারি/খাস বা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে— এমন অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সৈকতসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এসব এলাকায় অনুমোদিত সীমানার বাইরে জায়গা ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সুগন্ধা পয়েন্টে রেস্টুরেন্টের কার্যক্রমের বিস্তৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে জায়গাটির প্রকৃত মালিকানা, দাগ-খতিয়ান এবং আল-গণির দখল বা ব্যবহার বৈধ কি না, তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই প্রয়োজন।

২০২২ সালে ২ লাখ টাকা জরিমানা
২০২২ সালের ১৮ মে কক্সবাজার শহরের পাঁচটি রেস্টুরেন্টে অভিযান চালায় র্যাব-১৫-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিএসটিআইয়ের সমন্বিত দল।
অভিযানে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের দায়ে পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর মধ্যে আল-গণি রেস্টুরেন্টকে জরিমানা করা হয় ২ লাখ টাকা।
একই অভিযানে কলাতলী রেস্টুরেন্ট ও মেরিন ফুডকে ২ লাখ টাকা করে, হট চিলিকে ১ লাখ এবং কক্স কুটুমবাড়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
অভিযানকারী সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের অভিযোগ ছিল।
VAT নিয়ে অভিযোগ গড়ায় হাইকোর্টে
আল-গণিকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর একটি উঠে আসে VAT হিসাব নিয়ে।
২০২২ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কক্সবাজারের হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাতে VAT ফাঁকি ও রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এসব প্রতিবেদনে আল-গণিরও নাম ছিল।
প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, আল-গণির থানার সামনে ও থানা রাস্তার মাথার দুটি শাখায় মাসে বিপুল পরিমাণ বিক্রির বিপরীতে তুলনামূলকভাবে খুব কম VAT প্রদানের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগটি পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
হাইকোর্ট NBR ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি তদন্ত করে অগ্রগতি জানানোর নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল জারি হয়।
জেলা প্রশাসনের তদন্তে উঠে আসে VAT হিসাবের অসঙ্গতি
VAT নিয়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জেলা প্রশাসনের তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য সামনে আসার পর।
২০২৩ সালে প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আল-গণির একটি বিক্রয়কেন্দ্রে EFD মেশিনের পাশাপাশি সাধারণ বিক্রয় স্লিপ ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৭২ হাজার ৯৩৮ টাকা এবং অক্টোবর মাসে ৭৪ হাজার ১১২ টাকা VAT প্রদান করা হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়েছিল।
দুই মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০ টাকা।
অর্থাৎ VAT ফাঁকির বড় অভিযোগটি আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত না হলেও জেলা প্রশাসনের তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট বিক্রয় ও VAT হিসাবের অসঙ্গতির তথ্য সামনে এসেছিল।
২০২৬ সালে ফের খাবার নিয়ে অভিযোগ
পুরোনো অভিযোগের কয়েক বছর পর ২০২৬ সালের মে মাসে আল-গণিকে ঘিরে ফের বড় ধরনের ঘটনা সামনে আসে।
রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষা সফরের একটি দলের সদস্যরা কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টের আল-গণি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান।
এরপর দলের প্রায় ৩০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
অসুস্থদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তারা কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১১টার পর আক্রান্ত পর্যটকেরা হাসপাতালে আসতে শুরু করেন এবং মোট ৩০ জন চিকিৎসা নেন।
অভিযোগের পরদিন অভিযান
ঘটনার পরদিন আল-গণির সুগন্ধা পয়েন্ট শাখায় যৌথ অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে খাবার তৈরির স্থান অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
খাবার তৈরিতে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা শুভ্র দাশের বক্তব্য অনুযায়ী, খাবার তৈরির পরিবেশ সন্তোষজনক ছিল না এবং যথাযথ হাইজিন বজায় রাখা হয়নি।
সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগও
আল-গণিকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা ও স্থাপনা সম্প্রসারণ।
কক্সবাজারের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় আল-গণির রেস্টুরেন্ট পরিচালনায় ব্যবহৃত জায়গার একটি অংশ সরকারি/খাস বা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে— এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সৈকতসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এসব এলাকায় ব্যবসায়িক স্থাপনা ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমানার বাইরে জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় রেস্টুরেন্টের কার্যক্রমের বিস্তৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, সরকারি মালিকানা এবং আল-গণির নামে কোনো বৈধ লিজ, বন্দোবস্ত বা অনুমতিপত্র রয়েছে কি না— এসব নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
একই প্রশ্ন বারবার
আল-গণিকে ঘিরে গত কয়েক বছরের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়।
২০২২: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা।
২০২২-২৩: VAT হিসাব নিয়ে অভিযোগ, হাইকোর্টে রিট এবং জেলা প্রশাসনের তদন্তে EFD ও সাধারণ বিক্রয় স্লিপ ব্যবহারের অসঙ্গতির তথ্য।
২০২৬: খাবার খেয়ে প্রায় ৩০ পর্যটক অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ; পরদিন যৌথ অভিযানে অস্বাস্থ্যকর রান্নার পরিবেশ শনাক্ত এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ।
তাহলে প্রশ্ন হলো— জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও একই ধরনের অভিযোগ কেন বারবার সামনে আসছে?
জরিমানা কি সমাধান, নাকি ব্যবসার খরচ?
একটি রেস্টুরেন্টে অনিয়ম ধরা পড়লে জরিমানা হতে পারে। প্রতিষ্ঠানকে সতর্কও করা হতে পারে। কিন্তু কয়েক বছর পর একই প্রতিষ্ঠানে আবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়া গেলে প্রশ্ন ওঠে— আগের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল?
২০২২ সালে ২ লাখ টাকা জরিমানা হওয়ার পর ২০২৬ সালে একই প্রতিষ্ঠানের সুগন্ধা পয়েন্ট শাখায় ফের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কারণ পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব রেস্টুরেন্টে খাবার খান। পর্যটকের নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা শুধু ব্যবসায়ীর দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
আল-গণির ক্ষেত্রে এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি—
১. ২০২২ সালের ২ লাখ টাকা জরিমানার পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ফলোআপ পরিদর্শন হয়েছিল কিনা?
২. ২০২৩ সালের তদন্তে উঠে আসা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০ টাকা VAT-সংক্রান্ত অসঙ্গতির পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
৩. বর্তমানে আল-গণির সব শাখার EFD বিক্রয় ও VAT return-এর তথ্য কী?
৪. সাধারণ বিক্রয় স্লিপ ব্যবহারের অভিযোগ এখনো আছে কিনা?
৫. সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় রেস্টুরেন্ট পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত জমির মালিকানা কার?
৬. সরকারি বা খাস জমির কোনো অংশ ব্যবহার করা হলে তার বৈধ লিজ বা অনুমতিপত্র রয়েছে কি?
৭. অনুমোদিত সীমানার বাইরে কোনো স্থাপনা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে কি না?
৮. ২০২৬ সালের ঘটনায় অসুস্থ পর্যটকদের চিকিৎসা ও খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল কী?
আল-গণি কক্সবাজারের পরিচিত এবং ঐতিহ্যবাহী একটি রেস্টুরেন্ট। কিন্তু পরিচিতি এবং ঐতিহ্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে আইন ও জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে না। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে— ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্টগুলোই ঐতিহ্যের আড়ালে বেশী অনিয়ম করছে।
অতীতের জরিমানা, VAT নিয়ে তদন্ত, হাইকোর্টে গড়ানো অভিযোগ এবং সর্বশেষ খাদ্য-নিরাপত্তা অভিযানের তথ্য— সবকিছু মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তার সঙ্গে যদি কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে সরকারি বা খাস জায়গা দখলের অভিযোগের সত্যতাও নথিতে প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি রেস্টুরেন্টের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি কক্সবাজারের সৈকত ও পর্যটন এলাকার জমি ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করবে।
FollowUpNews-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
