এক বছরে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা আয়, মূলত মাইক্রোক্রেডিট থেকেই এ আয়। ঋণের সুদ থেকে আয় হাজার ২৯০ কোটি; সামাজিক প্রকল্পে মাত্র ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়— সে ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কর-সুবিধা ও বিপুল উদ্বৃত্ত নিয়ে আরো বড় প্রশ্ন।

দারিদ্র্য বিমোচন ও নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে কাজ শুরু করা Association for Social Advancement— ASA। এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান। সারাদেশে হাজার হাজার শাখা, প্রায় ৬০ লাখ ঋণগ্রহীতা এবং হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ASA-এর নিজের প্রকাশিত আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন উঠছে— দারিদ্র্য বিমোচনের নামে পরিচালিত এই বিশাল আর্থিক কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রতিদান আসলে কতটা?
বিশেষ করে একটি বিষয় সামনে আসে: মাইক্রোক্রেডিট থেকে ASA-এর বিপুল আয় এবং সামাজিক প্রকল্পে ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কতটা?
এক বছরে আয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা
ASA-এর ২০২৩-২৪ সালের Annual Report অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছে ৬,৯১৭ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস ছিল মাইক্রোক্রেডিটের Service Charges (ঋণের সুদ)। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৬,২৯০ কোটি ৩০ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ মোট আয়ের প্রায় ৯১ শতাংশই এসেছে সার্ভিস চার্জ থেকে।
এছাড়া ব্যাংক সুদ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৫০৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ASA-এর আর্থিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু যে মাইক্রোক্রেডিট, তা প্রতিষ্ঠানটির নিজের হিসাবেই স্পষ্ট।
বছরে ঋণ বিতরণ ৪৫ হাজার ৬০৫ কোটি
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ASA মোট ৪৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।
এর মধ্যে সাধারণ মাইক্রোক্রেডিটে বিতরণ হয়েছে ৩২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা এবং Micro Entrepreneur Credit-এ ১৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
৩০ জুন ২০২৪ শেষে ASA-এর ঋণ স্থিতি ছিল ২৭ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ লাখ, আর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ লাখ ১০ হাজার।
এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট সঞ্চয়ও ছিল প্রায় ৯ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ASA-এর কার্যক্রম কেবল একটি ছোট এনজিওর সামাজিক প্রকল্প নয়; এটি লাখ লাখ মানুষের সঞ্চয় ও ঋণকে ঘিরে পরিচালিত বিশাল একটি আর্থিক নেটওয়ার্ক।
সারাদেশে ৩ হাজারের বেশি শাখা
ASA-এর ২০২৩-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, তখন প্রতিষ্ঠানটির মোট শাখা ছিল ৩ হাজার ৭৩টি। এর মধ্যে সাধারণ শাখা ২ হাজার ৯৯৯টি, MSME শাখা ৭১টি এবং কৃষি শাখা ৩টি।
তাদের কার্যক্রম পৌঁছেছে ৬৪ জেলা, ৫১১ উপজেলা/থানা এবং প্রায় ৬৬ হাজার ৯৩০টি গ্রামে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মী ছিল ২৬ হাজার ২০১ জন।
বর্তমান ASA ওয়েবসাইটেও প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরছে। ওয়েবসাইটের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রায় ৬০ লাখ ক্লায়েন্ট এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ শাখা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সামাজিক কাজে কত?
এখানেই ASA-এর আর্থিক হিসাব নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩-২৪ Annual Report অনুযায়ী, ওই বছর ASA-এর মোট ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে—
- কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য Personnel Expenses: ১,৯১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা
- Loan Loss Provision: ৯৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা
- Financial Costs: ৭৫৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা
- Income Tax: ১৫৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা
- Office and Other Expenses: ২৮১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা
- Social Projects Expenses: ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা
অর্থাৎ সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় মোট ব্যয়ের প্রায় ১.৮ শতাংশ। আর মোট আয়ের তুলনায় সামাজিক প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ মাত্র প্রায় ১.১ শতাংশ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ASA-এর প্রতিবেদনে সামাজিক প্রকল্পের ব্যয় ৭৪৫.৩৩ মিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আয় করা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবে সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় একশ কোটি টাকারও কম।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের হিসাব কতটা সরাসরি সামাজিক ব্যয়?
ASA বলছে, মাইক্রোফাইন্যান্সের পাশাপাশি তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, ফিজিওথেরাপি, স্যানিটেশন, কৃষি সহায়তাসহ বিভিন্ন non-financial programme পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।
সামাজিক প্রকল্পের নামে দেখানো ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার কতটা সরাসরি উপকারভোগীর কাছে গেছে?
এর মধ্যে কর্মী, পরিবহন, অফিস, ব্যবস্থাপনা, প্রচার, অনুষ্ঠান বা অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় কত?
কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে?
কতজন মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন?
প্রকল্পগুলোর স্বাধীন মূল্যায়ন হয়েছে কি?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— ASA যে সামাজিক ব্যয়ের কথা প্রচার করে, তার কত অংশ প্রকৃত অর্থে দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সামাজিক প্রকল্পের ঘোষিত ব্যয়ের পুরোটা সরাসরি ‘দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয়’ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা
ASA-এর ২০২৩-২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী মোট আয় ছিল ৬,৯১৭ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং মোট ব্যয় ৪,১৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
দুইয়ের ব্যবধান প্রায় ২,৭৮৫ কোটি টাকা।
এটি সরাসরি ‘লাভ’ হিসেবে অভিহিত করা ঠিক হবে না; কারণ এনজিও ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের হিসাব কাঠামো এবং উদ্বৃত্ত ব্যবহারের নিয়ম বাণিজ্যিক কোম্পানির লাভের সঙ্গে এক নয়।
তবে এই বিশাল ব্যবধানের অর্থ কোথায় যাচ্ছে— এটি অবশ্যই জনস্বার্থের প্রশ্ন।
এই অর্থের কত অংশ ভবিষ্যৎ মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রমে পুনঃবিনিয়োগ হচ্ছে?
কত অংশ রিজার্ভ বা অন্যান্য তহবিলে যাচ্ছে?
কত অংশ সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে?
পরিচালনা ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বেতন, সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধায় কত ব্যয় হচ্ছে?
আর সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কত যাচ্ছে?
এসব তথ্য আরও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে ASA-এর আর্থিক কাঠামো সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা পরিষ্কার হতে পারে।
পরিচালনা পর্ষদ কি উদ্বৃত্ত অর্থ ভোগ করে?
ASA-এর উদ্বৃত্ত অর্থ সরাসরি পরিচালনা পর্ষদ ভোগ করে— এমন অভিযোগের পক্ষে এই মুহূর্তে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
তবে পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার পারিশ্রমিক, সম্মানী, সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে কতটা স্বচ্ছ— এটি অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে।
কারণ একটি অলাভজনক বা সামাজিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল আর্থিক উদ্বৃত্ত তৈরি হলে তার ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হচ্ছে— দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত সার্ভিস চার্জ (সুদ) থেকে সৃষ্ট উদ্বৃত্তের চূড়ান্ত ব্যবহার কীভাবে নির্ধারিত হয়?
করের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা
ASA-এর করব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ASA, BRAC, TMSS-সহ ৭০০-এর বেশি মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান আয়কর সুবিধা পেয়ে আসছে।
তবে বিষয়টি সরলভাবে ‘কর ফাঁকি’ বলা যাবে না।
কারণ বাংলাদেশের কর আইনে Micro Credit Regulatory Authority-নিবন্ধিত মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট আয়/সার্ভিস চার্জের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ কর সুবিধার বিধান রয়েছে। NBR-এর প্রকাশিত ব্যাখ্যাতেও মাইক্রোক্রেডিটের সার্ভিস চার্জের নির্দিষ্ট ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে ASA-এর নিজস্ব ২০২৩-২৪ হিসাবেই ১৫৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা Income Tax ব্যয় দেখানো হয়েছে।
তাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়েছে—
কোন আয় করমুক্ত, কোন আয় করযোগ্য এবং ASA কোন কোন বিধানের অধীনে কর সুবিধা পাচ্ছে?
কোন সার্ভিস চার্জ করমুক্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে?
করমুক্ত আয়ের বিপরীতে কী কী শর্ত পালন করা হচ্ছে?
NBR-এর সঙ্গে কোনো কর বিরোধ, বকেয়া বা অমীমাংসিত আপত্তি রয়েছে কি?
এসব নথি বিশ্লেষণ না করে ASA-কে ‘কর ফাঁকিবাজ’ বলা সঙ্গত হবে না।
গরিবের টাকা দিয়ে গরিবের ওপরই ঋণের বোঝা?
মাইক্রোক্রেডিটের মূল দর্শন হলো দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়া।
ASA-ও বলছে, তাদের মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির উদ্দেশ্য দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে মাইক্রোফাইন্যান্সকে তাদের মূল কর্মসূচিতে পরিণত করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— ঋণ নেওয়া মানুষ যদি এক ঋণ পরিশোধ করতে আরেক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ঋণব্যবস্থা তাকে কতটা দারিদ্র্য থেকে বের করে আনে?
ASA-এর নিজস্ব ২০২৩-২৪ তথ্যেও ঋণের পোর্টফোলিওর ঝুঁকির একটি চিত্র পাওয়া যায়। মোট ঋণের ৩০ দিনের বেশি বকেয়া PAR ছিল ১০.০৫ শতাংশ।
এটি কোনোভাবেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। কিন্তু মাইক্রোক্রেডিটের সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই ধরনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান, নাকি বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান?
ASA-এর বর্তমান ওয়েবসাইটে মাইক্রোফাইন্যান্সকে দারিদ্র্য মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সামাজিক ও non-financial programme পরিচালনার কথাও বলছে।
কিন্তু আর্থিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু এখন বিশাল মাইক্রোক্রেডিট নেটওয়ার্ক।
এক বছরে—
মোট আয়: প্রায় ৬,৯১৭ কোটি টাকা
সুদ আয়: প্রায় ৬,২৯০ কোটি টাকা
ঋণ বিতরণ: প্রায় ৪৫,৬০৫ কোটি টাকা
ঋণ স্থিতি: প্রায় ২৭,৭১৮ কোটি টাকা
মোট ব্যয়: প্রায় ৪,১৩২ কোটি টাকা
সামাজিক প্রকল্পে ব্যয়: প্রায় ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা
সঞ্চয়: প্রায় ৯,৮৬৯ কোটি টাকা
শাখা: ৩,০৭৩টি
ঋণগ্রহীতা: প্রায় ৬০ লাখ
সদস্য: প্রায় ৭০ লাখ ১০ হাজার।
এই পরিসংখ্যানগুলো কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। কিন্তু এগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন অবশ্যই তৈরি করে—
দারিদ্র্য বিমোচনের নামে পরিচালিত হাজার হাজার কোটি টাকার এই ঋণব্যবস্থায় দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে যে বিপুল অর্থ সার্ভিস চার্জ (সুদ) হিসেবে সংগৃহীত হচ্ছে, তার সামাজিক প্রতিদান কতটা?
ASA-এর কাছে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর চায় ফলোআপ নিউজ
ASA-এর মতো একটি বিশাল মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে কয়েকটি তথ্য প্রকাশ করা জরুরি—
১. বছরে মোট কত টাকা সার্ভিস চার্জ আদায় হয়?
২. সার্ভিস চার্জের কত অংশ করমুক্ত এবং কোন আইনি বিধানের অধীনে?
৩. সামাজিক প্রকল্পের ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার প্রকল্পভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ব্যয়ের তালিকা কী?
৪. সামাজিক প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে প্রশাসনিক ব্যয় কত?
৫. প্রকল্পগুলোর প্রত্যক্ষ উপকারভোগীর সংখ্যা কত?
৬. পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার মোট সম্মানী, বেতন ও অন্যান্য সুবিধা কত?
৭. ২,৭৮৫ কোটি টাকার মতো আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে?
৮. NBR-এর সঙ্গে ASA-এর কোনো কর মামলা, বকেয়া বা অমীমাংসিত কর আপত্তি আছে কি না?
৯. মাইক্রোক্রেডিটের সার্ভিস চার্জ থেকে অর্জিত অর্থের কত অংশ পুনরায় মাইক্রোক্রেডিটে বিনিয়োগ করা হয়?
১০. ঋণগ্রহীতাদের ঋণগ্রস্ততা এবং একাধিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে ASA-এর নিজস্ব কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন আছে কি না?
ASA বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের একটি বড় প্রতিষ্ঠান —এটি নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটি লাখ লাখ মানুষের কাছে ঋণ ও সঞ্চয় সেবা পৌঁছে দিয়েছে এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে।
কিন্তু সামাজিক উদ্দেশ্য থাকলেই আর্থিক কর্মকাণ্ড প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যায় না।
বরং যে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের সঞ্চয়, ঋণ ও সার্ভিস চার্জ (সুদ) জড়িত, সেই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতার দাবি আরও বেশি।
ASA-এর নিজের হিসাবেই যখন বছরে প্রায় ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা আয় এবং প্রায় ৬ হাজার ২৯০ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ থেকে আসে, অথচ সামাজিক প্রকল্পে ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, তখন প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ আছে।
দারিদ্র্য বিমোচনের নামে পরিচালিত এই বিশাল ঋণব্যবস্থা কি সত্যিই দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠছে, নাকি সময়ের সঙ্গে এটি একটি বিপুল আর্থিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতার তুলনায় ঋণ ব্যবসার আকারই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্নের উত্তর ASA-এর প্রচারমূলক বক্তব্যে নয়—প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়, নিরীক্ষিত হিসাব, কর নথি, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং ঋণগ্রহীতাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে।
