সরকারি প্রকল্পে ‘সাশ্রয়’-এর প্রচার, মাঠে শ্রমিকের পাওনা ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন

ফলোআপ নিউজ ফলোআপ বিশেষ প্রতিবেদন
সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দের টাকা থেকে একটি বড় অংশ ব্যয় না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে— খবরটি শুনলেই সাধারণ মানুষের কাছে একটি ধারণা তৈরি হয়: কর্মকর্তা সৎ, প্রকল্পে অপচয় হয়নি এবং রাষ্ট্রের টাকা বেঁচেছে।
কিন্তু সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতায় প্রশ্নটি এত সরল নয়।
টাকা ফেরত দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু কত টাকা ফেরত দেওয়া হলো— তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে কাজের জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, সেই কাজটি পুরোপুরি, নির্ধারিত পরিমাণে ও নির্ধারিত মানে হয়েছে কি না।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় খাল পুনঃখনন প্রকল্প শেষে বিপুল পরিমাণ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও ৭৩ লাখ, কোথাও ৭৬ লাখ, কোথাও ৭৮ লাখ, আবার কোথাও এক কোটি টাকার বেশি অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনাকে কর্মকর্তাদের ‘সততা’, ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এমনকি জুলাইয়ে সালথায় তিনটি খাল পুনঃখনন শেষে ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাকে ‘বিরল সততা ও দায়িত্বশীলতার দৃষ্টান্ত’ হিসেবে সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
কসবার দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প শেষে ৭৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক প্রশংসা পায়।
গৌরনদীতে ৭৬ লাখ ৯ হাজার ২৭৫ টাকা এবং চরফ্যাশনে ১ কোটি ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৪৯ টাকা ফেরত দেওয়ার খবরও একইভাবে ‘সাশ্রয়’ ও ‘স্বচ্ছতা’র উদাহরণ হিসেবে এসেছে।
কিন্তু ‘সাশ্রয়’ আর ‘কাজ কম করা’ কি একই জিনিস?
এখানেই শুরু হয় অনুসন্ধানের মূল জায়গা।
ধরা যাক, একটি খাল খননের জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ হলো। প্রকল্প শেষে ৮০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হলো। সরকারি হিসাবে এটি সাশ্রয়।
কিন্তু যদি দেখা যায়, অনুমোদিত দৈর্ঘ্যের পুরো খাল খনন হয়নি, গভীরতা কম, প্রস্থ কম, মাটি অপসারণের পরিমাণ কম, অথবা প্রকল্পের কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাস্তবায়ন করা হয়নি— তাহলে সেটিকে নিছক ‘সাশ্রয়’ বলা যায় কি?
আর যদি প্রকল্পের শ্রমিকেরা তাদের প্রাপ্য মজুরি না পান, তাহলেও অব্যয়িত টাকা ফেরত দেওয়াকে কীভাবে সততার চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায়?
বরগুনার আমতলীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। সেখানে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার টাকার দুটি খাল খনন প্রকল্পে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৪০ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের পুরো মজুরি দেওয়া হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যেও কাজের পরিমাণ, ভেকু ব্যবহারের ধরন এবং শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থাৎ কোষাগারে টাকা ফেরত গেছে— কিন্তু সেই টাকা কেন ফেরত গেল, সেটিই আসল অনুসন্ধানের বিষয়।
‘ফেরত’ শব্দটি কি কখনো ঢাল হয়ে যায়?
সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার সংবাদ সাধারণত খুব সহজে ইতিবাচক সংবাদে পরিণত হয়।
শিরোনাম হয়—
‘সততার দৃষ্টান্ত’
‘সাশ্রয় হওয়া টাকা ফেরত’
‘প্রশংসায় ভাসছেন ইউএনও’
‘স্বচ্ছতার নজির’
এরপর কর্মকর্তার ছবি, ফুলেল শুভেচ্ছা কিংবা স্থানীয় প্রশংসার বক্তব্য যুক্ত হয়।
কিন্তু প্রকল্পের DPP/প্রাক্কলন, পরিমাপ বই (Measurement Book), বিল-ভাউচার, শ্রমিকের মাস্টাররোল, ব্যাংক লেনদেন, কাজের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-গভীরতা এবং প্রকল্পের আগে-পরে ছবি— এসব সাধারণত সেই সংবাদে থাকে না।
ফলে জনগণ জানতে পারে টাকা ফেরত গেছে; কিন্তু জানতে পারে না কাজটি কতটুকু হয়েছে।
এই প্রবণতা এখন একাধিক উপজেলায়
২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে এমন একাধিক সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।
ফরিদপুরের সালথায় ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা ফেরত দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ফরিদপুরের সদরপুরে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৬২০ টাকা ফেরত দেওয়ার খবর এসেছে।
নরসিংদীর মনোহরদীতে ফেরত দেওয়া হয়েছে ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ফেরত দেওয়া হয়েছে ৭৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা।
ভোলার চরফ্যাশনে ফেরত দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৪৯ টাকা।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ফুলবাড়ীয়ায় ফেরত দেওয়া হয়েছে ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ৬৩০ টাকা।
অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা নয়। একই ধরনের ‘সাশ্রয়’ ও ‘কোষাগারে ফেরত’কে কেন্দ্র করে একাধিক উপজেলা প্রশাসনের প্রশংসামূলক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
আবার অন্য ছবিও আছে
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় সরকারি অডিটে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাতের অভ্যন্তরীণ অডিট নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অব্যয়িত সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে জিআর, টিআর, কাবিখা, কাবিটা এবং হতদরিদ্রদের গৃহ নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ নিয়ে অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ৩ হাজার ২৪টি অডিট আপত্তির কথা বলা হয়েছে, যার ৯৩০টি গুরুতর।
অর্থাৎ একই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একদিকে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য কর্মকর্তারা প্রশংসিত হচ্ছেন, অন্যদিকে অন্য প্রকল্পে অব্যয়িত অর্থ ফেরত না দেওয়া নিয়েই অডিট আপত্তি তৈরি হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সততার মাপকাঠি কি শুধু টাকা ফেরত?
সরকারি প্রকল্পে একজন কর্মকর্তার সততা যাচাই করতে হলে অন্তত পাঁচটি বিষয় দেখা প্রয়োজন—
এক. অনুমোদিত কাজের পুরোটা হয়েছে কি না।
দুই. প্রকল্পের নির্ধারিত কারিগরি মান বজায় রাখা হয়েছে কি না।
তিন. শ্রমিক, সরবরাহকারী ও ঠিকাদারের প্রকৃত পাওনা পরিশোধ হয়েছে কি না।
চার. বিল-ভাউচার ও ব্যাংক লেনদেন প্রকৃত কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
পাঁচ. প্রকল্প শেষে স্বাধীনভাবে পরিমাপ ও যাচাই করা হয়েছে কি না।
এসব যাচাই ছাড়া শুধু ‘অব্যয়িত টাকা ফেরত’কে সততার সার্টিফিকেট বানানো হলে তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার পরিবর্তে জনসংযোগে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
‘সততার প্রচার’ বনাম ‘সততার প্রমাণ’
সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো— একটি ভালো কাজকে সামনে রেখে পুরো প্রকল্পকে ভালো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
কোনো কর্মকর্তা ৫০ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন— এটি সত্য হতে পারে।
কিন্তু সেই একই প্রকল্পে যদি ২০ লাখ টাকার কাজ বাদ পড়ে থাকে, শ্রমিকের মজুরি বাকি থাকে, কিংবা প্রাক্কলনের তুলনায় কম কাজ করা হয়, তাহলে ফেরত দেওয়া ৫০ লাখ টাকা একা প্রকল্পের সততার প্রমাণ নয়।
বরং প্রশ্ন হবে—
কাজ কম হয়েছে বলেই কি টাকা বেঁচেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর বের করতেই দরকার মাঠপর্যায়ের মাপজোক, নথি যাচাই এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে সহজ ‘সততার ছবি’?
একটি প্রকল্প শেষ হলো।
কিছু টাকা বাকি রইল।
সেই টাকা কোষাগারে জমা দেওয়া হলো।
ছবি হলো।
প্রশংসা হলো।
সংবাদ হলো।
কর্মকর্তার সততার গল্প ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু প্রকল্পের গভীরতা কত ছিল, কত মাটি উঠেছে, কত শ্রমিক কাজ করেছেন, প্রত্যেকে কত টাকা পেয়েছেন, ভেকু কত ঘণ্টা চলেছে, কত টাকা বিল হয়েছে— এসব যদি কেউ যাচাই না করে, তাহলে সততার গল্পটি হয়তো সত্য, আবার সেটি একটি অসম্পূর্ণ গল্পও হতে পারে।
আর অসম্পূর্ণ গল্পই কখনো কখনো প্রশাসনিক দুর্নীতির সবচেয়ে নিরাপদ আবরণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই অনুসন্ধানের পরবর্তী প্রশ্ন
খাল খনন প্রকল্পে টাকা ফেরত দেওয়া প্রতিটি উপজেলায় এখন কয়েকটি নথি প্রকাশ্যে আনা দরকার—
প্রাক্কলন কত?
বাস্তবে খনন কত?
প্রকল্পের Measurement Book কোথায়?
শ্রমিকের মাস্টাররোলে কতজন?
ব্যাংক হিসাবে কত টাকা গেছে?
প্রত্যেক শ্রমিক কত পেয়েছেন?
ভেকু মালিককে কত টাকা দেওয়া হয়েছে?
প্রকল্পের আগে ও পরের মাপ কত?
স্বাধীনভাবে কাজ পরিমাপ করেছে কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে— কোষাগারে ফেরত যাওয়া টাকা সত্যিই সাশ্রয়, নাকি কম কাজের হিসাব।
কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রকৃত সততা হলো শুধু টাকা ফেরত দেওয়া নয়।
সততা হলো— যে কাজের জন্য জনগণের টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেই কাজটি পুরোপুরি করে দেখানো।
