Headlines

১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ কি তাহলে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত অভিযোগ মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে?

ডিএমডি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক

তাপস পালকে ঘিরে অভিযোগে প্রশ্ন: provision ঘাটতি কি আত্মসাত, নাকি ব্যাংকের ঋণঝুঁকির সংকট?

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও ব্যাংকের প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে এ পরিমাণ অর্থ তার দ্বারা আত্মসাতের কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

মতিঝিল
মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি হলো বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, যা ১৯৯৯ সালের ২ জুন যাত্রা শুরু করে।

বরং ব্যাংকের ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে যে বড় অঙ্কের অর্থসংক্রান্ত সংকটের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, সেটি হলো খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে provision বা সংস্থান ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকটির provision shortfall ছিল ২ হাজার ১২১.১৯ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা সংস্থান করায় ঘাটতি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০০.৮৬ কোটি টাকা।

কিন্তু provision shortfall এবং অর্থ আত্মসাত এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটিই তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে ওঠা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১,২০০ কোটি টাকা কোথায়— আর্থিক বিবরণীতে কী আছে?

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২০২৪ সালের audited financial statements-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের assessment-এর ভিত্তিতে provision shortfall-এর হিসাব বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২,১২১.১৯ কোটি টাকার provision প্রয়োজনের বিপরীতে ঘাটতির তথ্য রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০ কোটি টাকা specific provision-এ স্থানান্তরের পরও ১,৭০০.৮৬ কোটি টাকা ঘাটতি থেকে যায়।

এটি মূলত ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওতে তৈরি হওয়া ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় provision না থাকার বিষয়।

অন্যদিকে অভিযোগে যে ১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে এই provision shortfall-কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—

১,২০০ কোটি টাকা কোন হিসাব থেকে নেওয়া হয়েছে?

কোন কোন লেনদেনকে আত্মসাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?

কার হিসাবে গেছে?

কোন কর্মকর্তা অনুমোদন দিয়েছেন?

কোন ভাউচার বা payment instruction-এর মাধ্যমে অর্থ ছাড় হয়েছে?

প্রকাশ্য financial statements-এ এসব প্রশ্নের উত্তর নেই।

বরং ব্যাংকের বড় সংকট ছিল খেলাপি ঋণ।

২০২৪ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ব্যাংকের classified investments এক বছরে প্রায় ১৯৯ শতাংশ বেড়ে ৫,১৭৬ কোটি টাকা হয়। এটি মোট ঋণপোর্টফোলিওর ১৭.২৫ শতাংশ। একই কারণে ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে ব্যাংক ২৭২ কোটি টাকা নিট লোকসান করে এবং পুরো বছরের consolidated net profit ৬৮ শতাংশ কমে ৬৪.৯৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। EPS কমে হয় ০.৫৮ টাকা।

এগুলো অবশ্যই ব্যাংকের জন্য গুরুতর আর্থিক সমস্যা।

কিন্তু খেলাপি ঋণ, provision shortfall কিংবা মুনাফা কমে যাওয়া— কোনোটিই নিজে থেকে CFO-এর ব্যক্তিগত অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নয়।

২০২৫ সালেও provision ঘাটতি ছিল।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের হিসাবেও।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের regulatory forbearance পেয়েছে। প্রকাশিত corporate disclosure অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ২,১৬১.৩১ কোটি টাকা unadjusted provision shortfall রেখেই financial statements চূড়ান্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়। এর কারণে ২০২৫ সালের জন্য কোনো dividend ঘোষণা করা হয়নি।

অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫— দুই বছরেই ব্যাংকের বড় আর্থিক দুর্বলতা হিসেবে যে বিষয়টি নথিভুক্ত হয়েছে, সেটি হলো provision shortfall।

এখন প্রশ্ন হলো, এই দুই বছরের provision ঘাটতিকে কি ১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে?

যদি করা হয়, তাহলে তার পক্ষে নির্দিষ্ট হিসাব ও transaction-level evidence প্রয়োজন।

তাপস পাল ২০১৯ থেকেই CFO— তবু ব্যবস্থাটি কি একক?

তাপস চন্দ্র পাল ২০১৯ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের CFO হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের Deputy Managing Director & CFO হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তার দীর্ঘদিন CFO থাকার বিষয়টি তদন্তে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একজন CFO কি ব্যাংকের সব অর্থের একক অনুমোদনকারী?

সেটি ধরে নেওয়া যায় না।

একটি ব্যাংকের বড় অঙ্কের ব্যয় ও আর্থিক সিদ্ধান্ত সাধারণত বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন, হিসাবরক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, অডিট ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্য দিয়ে যায়।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রকাশ্য তথ্যেও Audit Committee, Risk Management Committee এবং Board-level governance কাঠামোর অস্তিত্ব দেখা যায়।

তাই অভিযোগ সত্য হলে তদন্তের আওতা শুধু CFO-তে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো approval chain-ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে “সিএফও”-এর নেতৃত্বে লেখাটা ব্যক্তিগত আক্রোশ মনে হতে পারে।

দীর্ঘদিন আত্মসাৎ হলে অডিট কোথায় ছিল?’

অভিযোগে যদি বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাসপেন্স হিসাব, ব্যয় হিসাব, CSR, provident fund, gratuity কিংবা বিভিন্ন ক্রয় খাতে শত শত কোটি টাকা সরানো হয়েছে, তাহলে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

Internal Audit কী করেছে?

External Auditor কী পেয়েছে?

Audit Committee কী রিপোর্ট পেয়েছে?

Board-কে CFO কী financial statements দিয়েছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শনে কী পাওয়া গেছে?

এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ অভিযোগে কথিত অর্থ যদি সত্যিই ১,২০০ কোটি টাকা হয়, তাহলে সেটি কোনো ছোটখাটো হিসাবগত অনিয়ম নয়। এত বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে সরাতে হলে একাধিক financial record, ledger, voucher, bank transaction এবং reconciliation-এর মধ্যে তার ছাপ থাকার কথা।

সেই নথিগুলো প্রকাশ্যে না এলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে তাপস পালকে ১,২০০ কোটি টাকার আত্মসাতকারী হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত— সেটিই এখন প্রশ্ন।

‘সিএফও পদে থাকা মানেই আত্মসাতের দায় নয়’

তাপস পালের বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি অংশ তার দীর্ঘদিন CFO থাকা এবং দ্রুত পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে।

কিন্তু একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি বা দীর্ঘদিন একটি পদে থাকা নিজে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ নয়।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে তার কর্মদক্ষতা, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত এবং প্রযোজ্য নীতিমালা কী ছিল— এসব নথি যাচাই করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

একইভাবে তার পেশাগত সনদ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, সনদ না থাকা এবং ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাত— দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিযোগ। একটির মাধ্যমে অন্যটি প্রমাণ করা যায় না।

CSR ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনুমোদনের প্রশ্ন।

অভিযোগে CSR fund নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কিন্তু কোনো CSR ব্যয় বৈধ কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট approval, board decision এবং fund disbursement records দেখতে হবে।

শুধু কোনো CSR প্রকল্পে CFO উপস্থিত ছিলেন— এটা তার ব্যক্তিগতভাবে সেই অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নয়।

অভিযোগের তদন্ত হোক— তবে হিসাবের ভিত্তিতে

তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গুরুতর। তাই তদন্ত হওয়া উচিত— এ নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়।

কিন্তু তদন্তের মানদণ্ডও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সত্য হতে হলে তদন্তকারীদের উচিত—

১. সংশ্লিষ্ট সাসপেন্স হিসাবের পূর্ণ ledger পরীক্ষা করা;
২. প্রতিটি কথিত অনিয়মের transaction number শনাক্ত করা;
৩. payment approval ও voucher পরীক্ষা করা;
৪. অর্থের চূড়ান্ত beneficiary শনাক্ত করা;
৫. CSR, provident fund ও gratuity fund-এর reconciliation করা;
৬. procurement-এর tender ও comparative statement দেখা;
৭. Internal Audit-এর রিপোর্ট পরীক্ষা করা;
৮. External Auditor-এর management letter পরীক্ষা করা;
৯. Board ও Audit Committee-র minutes পর্যালোচনা করা;
১০. বাংলাদেশ ব্যাংকের inspection report-এর সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা।

তাহলেই বোঝা যাবে— এটি সত্যিই ১,২০০ কোটি টাকার আত্মসাত, নাকি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, provision ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়মকে একত্র করে একটি বড় অঙ্কের অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী ব্যাংকটির জন্য উদ্বেগজনক চিত্র দেখায়— বিশেষ করে খেলাপি ঋণ, provision shortfall এবং মুনাফার পতন।

২০২৪ সালে provision shortfall ১,৭০০.৮৬ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ২,১৬১.৩১ কোটি টাকা unadjusted shortfall থাকার তথ্য প্রকাশ্য নথিতে রয়েছে।

কিন্তু এই অঙ্কগুলোকে তাপস চন্দ্র পালের ব্যক্তিগত আত্মসাত হিসেবে চিহ্নিত করার মতো সরাসরি প্রমাণ প্রকাশিত financial statements-এ নেই।

তাই ১,২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগের অঙ্ক নয়, অঙ্কটির হিসাবের উৎস প্রকাশ করা।

প্রশ্নটা তাই তাপস পাল ১,২০০ কোটি টাকা নিয়েছেন কি না— শুধু এটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, ১,২০০ কোটি টাকার হিসাবটি কোথায়, কোন লেনদেনে, কার অনুমোদনে এবং কার কাছে গেছে?

সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে অভিযোগটি কতটা বাস্তব, আর কতটা হিসাবের সঙ্গে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত অভিযোগকে মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে।