Headlines

রাজনৈতিক মেরুকরণ ও শিল্পীর দায়ঃ বাঁধন বিতর্ক কোন বার্তা দিচ্ছে?

ইতালিতে হামলা
ইতালির ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সমান্তরালে মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি The Daily Star নতুন করে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তাঁর প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে প্রবাসী আওয়ামী সমর্থকরা তাকে হেনস্তা করেছে Prothom Alo। তবে এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে যে বহুমাত্রিক আলোচনা ও মতামতের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হামলার খতিয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মব জাস্টিস এবং একজন শিল্পীর ‘নিরপেক্ষতা’র সংকটকে ফ্রেমবন্দী করেছে।

মব কালচার ও কর্মফলের তত্ত্ব: একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

ঘটনাটির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক ও পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে গণহারে মব কালচার, মব জাস্টিস, ভাস্কর্য ভাঙচুর ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল Facebook, তখন দেশের অনেক প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বই রহস্যজনকভাবে নীরব ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় যেমনটি দেখা যাচ্ছে— আইনের শাসনের পরিবর্তে যখন দলবদ্ধ হামলা ও ভয় দেখানোর সংস্কৃতিকে একপক্ষীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব কোনো না কোনোভাবে সবার ওপরেই এসে পড়ে Facebook। সমালোচকদের মতে, দেশে চলমান সেই অরাজক মব সংস্কৃতিরই একটি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বা ‘কাউন্টার মব’ হিসেবে ভেনিসের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে The Business Standard on Facebook

শিল্পীর নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতের সংকট

একটি দেশের বুদ্ধিজীবী এবং অভিনয়শিল্পীদের সমাজ সাধারণত দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। বাঁধন নিজেই তার ভিডিও বার্তায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ভেনিসে যে চলচ্চিত্রটি নিয়ে এসেছেন (দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড), সেটির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের বাবা একজন সাবেক আওয়ামী লীগ মন্ত্রী RTV Online, অথচ জুলাই পরবর্তী সময়েও তিনি সেই পরিচালকের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন DhakaTimes News। বাঁধনের এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক তাঁর নিজের অবস্থানের এক ধরণের স্ববিরোধী হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, বাঁধন যদি একাধারে আওয়ামী লীগের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে কাজ করতে পারেন, তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় কেন তিনি দেশের সার্বিক সহিংসতার বিপক্ষে না দাঁড়িয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট পক্ষের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে উসকে দিলেন? সংকটের সময়ে একজন শিল্পীর সার্বিক মানবিক বিপর্যয় ও সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সমানভাবে না দাঁড়িয়ে একপেশে অবস্থান নেওয়াটা সামাজিক মেরুকরণকে আরও বেশি অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক সচেতন নাগরিক।

রাজনৈতিক পুনর্বাসন বনাম সামাজিক ক্ষোভ

ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠন একে আওয়ামী লীগের ‘সহিংস চরিত্রের প্রকাশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন New Age, Channels.com.bd। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ধরনের ঘটনা কোনো দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বা পুনর্বাসিত করতে না পারলেও, এটি স্পষ্ট করে যে প্রবাসে বা দেশের ভেতরে সাধারণ জনগণের ক্ষোভের আগুন এখনো নিভে যায়নি। যখন দেশের ভেতরের একটি বড় জনগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ও মতামত প্রকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত বোধ করে, তখন এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ও অসংলগ্ন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে The Business Standard on Facebook
পরিশেষে বলা যায়, ভেনিসের ঘটনাটি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সহিংসতা বা মব কালচার কখনোই একতরফা হয় না। সমাজে যদি সব ধরণের হামলা ও অরাজকতার বিরুদ্ধে সমভাবে আইনি শাসন এবং নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর বজায় না রাখা যায়, তবে সেই অস্থিতিশীলতার আঁচ প্রবাসের মাটিতেও দেশের ভাবমূর্তিকে একইভাবে কালিমালিপ্ত করতে থাকবে।