গণপরিবহনের সংকট, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং শ্রেণিগত বাস্তবতার আলোকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
FollowUpNews ডেস্ক
ঢাকা শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি রিকশা ও অটোরিকশার উপস্থিতি এখন আর অস্বীকার করার মতো কোনো বিষয় নয়। এগুলো যেমন সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে, তেমনি লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বল্প দূরত্বে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে চলাচলের সুযোগ তৈরি করেছে এসব যানবাহন। গণপরিবহনের প্রধান রুট থেকে আবাসিক এলাকা, বাজার কিংবা কর্মস্থলের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও এগুলোর ব্যবহার ব্যাপক।
তাই ইজি রিকশা নিয়ে বিতর্কটি শুধু ‘রিকশা থাকবে কি থাকবে না’— এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যাটির বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।
প্রশ্ন হওয়া উচিৎ— যেহেতু এই যানবাহনগুলো মানুষের প্রয়োজনের কারণে তৈরি হয়েছে এবং বাস্তবতার অংশ হয়ে গেছে, সেহেতু এগুলোকে কীভাবে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত, পরিবেশবান্ধব ও গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত করা যায়?

ঝুঁকি আছে— কিন্তু সমাধান কি উচ্ছেদ?
ইজি রিকশার ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অনিয়ন্ত্রিত গতি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, চালকের প্রশিক্ষণের অভাব এবং স্থানীয়ভাবে পরিবর্তিত বা অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ২০১৬-২০২৪ সালের বাংলাদেশজুড়ে ইজি বাইক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার ধরন ও উচ্চঝুঁকির স্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ নিরাপত্তার প্রশ্নটি বাস্তব।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে— ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা আর পুরো একটি পরিবহন ব্যবস্থা উচ্ছেদ করা এক বিষয় নয়।
নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড, অনুমোদিত নকশা, ব্রেক, লাইট, ইন্ডিকেটর, টায়ার, মোটর ও ব্যাটারির মান নির্ধারণ করা যায়। চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা যায়। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার আওতায় আনা যায়।
অর্থাৎ নীতির লক্ষ্য হতে পারে—
ইজি রিকশা বন্ধ নয়; অনিরাপদ ইজি রিকশা বন্ধ।
বাংলাদেশও এখন নিষেধাজ্ঞা থেকে নিয়ন্ত্রণের দিকে
এই বাস্তবতা সম্ভবত নীতিনির্ধারকরাও উপলব্ধি করছেন।
সম্প্রতি সরকার শহর করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
ঢাকায় জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথাও সামনে এসেছে। অর্থাৎ সব রাস্তা ও সব এলাকায় একইভাবে এসব যানবাহন চলবে না; নির্দিষ্ট অঞ্চল ও রুটের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনার চিন্তা করা হচ্ছে।
এমনকি সাম্প্রতিক প্রস্তাবনায় নিবন্ধনের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিংয়ের শর্ত যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
এগুলো দেখাচ্ছে— বাস্তবসম্মত সমাধান হয়তো ‘সব বন্ধ’ নয়, বরং নিবন্ধন, নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

বিদ্যুৎ পোড়ায়— কিন্তু তুলনাটা কোথায়?
ইজি রিকশার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ— এসব যানবাহন প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
এটি অবশ্যই নীতিগত আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে অবৈধ সংযোগ, অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং এবং নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে।
কিন্তু একই আলোচনায় ব্যক্তিগত গাড়ির বিষয়টিও আসতে হবে।
একটি ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তার তুলনামূলক বেশি জায়গা ব্যবহার করে, জ্বালানি পোড়ায় এবং নিজস্ব ব্যাটারিও ব্যবহার করে। ফলে পরিবেশ ও শক্তি ব্যবহারের হিসাব করতে গেলে যানবাহনটির প্রতি যাত্রীর জন্য কতটা রাস্তা ও শক্তি ব্যবহার হচ্ছে— সেটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ।
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার একটি বহুল উদ্ধৃত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ি মোট যাত্রার খুব ছোট অংশ বহন করেও সড়কের বড় অংশ ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাংকের একটি পুরোনো বিশ্লেষণে প্রায় ২১ মিলিয়ন দৈনিক যাত্রার মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির অংশ প্রায় ৫ শতাংশ হলেও তারা প্রায় ৮০ শতাংশ রাস্তার জায়গা ব্যবহার করছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো।
অন্য গবেষণাতেও ব্যক্তিগত গাড়ির যাত্রা ও রাস্তার জায়গা ব্যবহারের মধ্যে বড় বৈষম্যের কথা উঠে এসেছে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিৎ শুধু—
ইজি রিকশা কত বিদ্যুৎ খরচ করে?
এর পাশাপাশি প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—
একটি যাত্রী পরিবহনে কোন যান কত শক্তি ও কত রাস্তার জায়গা ব্যবহার করছে?
ব্যাটারি দূষণঃ সমাধান রিসাইক্লিংয়ে
ব্যাটারির পরিবেশগত ঝুঁকিও বাস্তব। বিশেষ করে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা, ফেলা বা পুনর্ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু এখানেও নিষেধাজ্ঞা একমাত্র সমাধান নয়।
ব্যাটারি আমদানি থেকে শুরু করে বিক্রি, ব্যবহার, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার— পুরো চেইনকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা যায়।
প্রতিটি নতুন ব্যাটারির বিপরীতে পুরোনো ব্যাটারি ফেরত নেওয়া, অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টার তৈরি করা এবং চার্জিং স্টেশন নিবন্ধনের আওতায় আনা যেতে পারে।
অর্থাৎ ব্যাটারি দূষণের সমাধান হলো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা; ইজি রিকশা উচ্ছেদ নয়।
আসল প্রশ্ন— ঢাকার গণপরিবহন কতটা সক্ষম?
ইজি রিকশা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায়ই বাদ পড়ে যায়— ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা কি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট?
ঢাকায় বাস, মেট্রোরেল ও অন্যান্য গণপরিবহন রয়েছে। কিন্তু বড় গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি মৌলিক সমস্যা হলো— যাত্রীকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।
২০২৫ সালের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঢাকার মেট্রোরেল ব্যবহারকারীদের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্টেশনে পৌঁছাতে বা স্টেশন থেকে গন্তব্যে যেতে অনানুষ্ঠানিক রিকশার ওপর নির্ভর করেন।
অর্থাৎ ইজি রিকশা অনেক ক্ষেত্রে গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
এটি গণপরিবহনের ‘শেষ মাইল’।
মেট্রোরেল আপনাকে স্টেশনে নামিয়ে দিল। বাস আপনাকে প্রধান সড়কে নামিয়ে দিল। এরপর বাসা, অফিস, স্কুল বা বাজার পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার কীভাবে যাবেন?
সেখানেই রিকশা বা ইজি রিকশা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
এগুলো নিম্নবিত্তের ‘প্রাইভেট গাড়ি’ হয়ে উঠেছে
এখানে একটি সামাজিক বাস্তবতাও রয়েছে।
উচ্চবিত্তের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি শুধু একটি যানবাহন নয়; এটি ব্যক্তিগত চলাচলের স্বাধীনতা।
কিন্তু নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের সেই সামর্থ্য নেই। তাদের জন্য ইজি রিকশা অনেক ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতার একটি সস্তা বিকল্প তৈরি করেছে।
ফলে শহরের রাস্তা এখন শুধু উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষও তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী নগর পরিবহন ব্যবস্থার একটি জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন।
এখানেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের নীরব শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব।
যে যানবাহনটি একজন সচ্ছল মানুষের কাছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘বিরক্তিকর’ মনে হতে পারে, সেটিই একজন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কর্মস্থলে যাওয়ার, সন্তানকে স্কুলে নেওয়ার কিংবা বাজারে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মাধ্যম।
তাই ইজি রিকশা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শ্রেণিগত বাস্তবতাকে বাদ দেওয়া যাবে না।
তবে রাস্তা দখলের অভিযোগও অস্বীকার করা যাবে না
এর অর্থ এই নয় যে ইজি রিকশাকে সব রাস্তায় অবাধে চলতে দিতে হবে।
ঢাকার প্রধান সড়কে ধীরগতির যানবাহন যদি দ্রুতগতির বাস, গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলে, তাহলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।
সমাধান হতে পারে রুটভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা।
প্রধান সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে বা নির্দিষ্ট উচ্চগতির করিডোরে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। অন্যদিকে আবাসিক এলাকা, অলিগলি এবং গণপরিবহনের শেষ প্রান্তে ইজি রিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট রাখা যেতে পারে।
সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনাতেও জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ধারণা এসেছে।
একটি বড় পরিবর্তন হতে পারে—‘শেয়ারড ইজি রিকশা’
ইজি রিকশা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন চিন্তার জায়গা হতে পারে শেয়ারড যাতায়াত।
একই রুটে একই সময়ে ১০ জন মানুষ যদি আলাদা ১০টি ইজি রিকশায় যাতায়াত করেন, তাহলে সড়কে ১০টি ছোট যানবাহন থাকবে।
কিন্তু সেই ১০ জনের একটি বড় অংশ যদি নির্দিষ্ট রুটে শেয়ার করে যাতায়াত করেন, তাহলে একই সংখ্যক মানুষকে কম সংখ্যক যানবাহন দিয়ে পরিবহন করা সম্ভব হতে পারে।
তাই ইজি রিকশাকে শুধু ‘ব্যক্তিগত চলাচলের বিকল্প’ হিসেবে না দেখে শেয়ারড মাইক্রো-পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা যেতে পারে।
নির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট স্টপেজ, নির্ধারিত ভাড়া এবং যাত্রী ওঠানামার নিয়ম করা যেতে পারে।
মেট্রোরেল স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও বড় পরিবহন করিডোর থেকে আশপাশের আবাসিক এলাকায় ইজি রিকশাকে ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এতে যাত্রীর খরচ কমবে, একই সঙ্গে রাস্তার ওপর ছোট যানবাহনের চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
ভারত কী করেছে?
বাংলাদেশের জন্য ভারতের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে সরকার ই-রিকশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে এবং এটিকে পরিবেশবান্ধব প্যারাট্রানজিট বা স্বল্প দূরত্বের পরিবহনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। ভারতীয় নিয়মে ই-রিকশার মোটর ক্ষমতা, গতি ও যাত্রী বহনের মতো বিষয় নির্ধারিত হয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন শহরে ই-রিকশা প্রচলিত গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণ করে last-mile connectivity তৈরি করেছে—বিশেষ করে যেখানে বড় বাস বা অন্যান্য গণপরিবহন সহজে পৌঁছাতে পারে না।
ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— ই-রিকশাকে কেবল ‘রাস্তার সমস্যা’ হিসেবে না দেখে Intermediate Para-Transit বা গণপরিবহনের মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তবে ভারতের অভিজ্ঞতা সতর্কতাও দেয়। নিরাপত্তা, লাইসেন্স, যানবাহনের মান, লেন, বীমা ও ভাড়া— সবকিছুর জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম দরকার।
অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ই-রিকশা সমস্যা; সঠিক নিয়ন্ত্রণে সেটিই সমাধানের অংশ হতে পারে।
শ্রীলঙ্কা দেখাচ্ছে অন্য পথ
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়।
সেখানে প্রচলিত জ্বালানিচালিত থ্রি-হুইলারকে বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। UNDP-এর সহায়তায় পরিচালিত প্রকল্পে প্রচলিত থ্রি-হুইলারকে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের বাস্তব সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ব্যয় কমানো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো এবং নির্গমন হ্রাস।
অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার শিক্ষা হলো—
কোনো জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করছে বলে সেটিকে ধ্বংস না করে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করা সম্ভব।
বাংলাদেশও চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
ঢাকার জন্য কেমন হতে পারে মডেল?
ঢাকার জন্য একটি সম্ভাব্য মডেল হতে পারে—
প্রথম ধাপ: নিরাপত্তা
অনুমোদিত মডেল, নির্দিষ্ট মোটর ক্ষমতা, মানসম্মত ব্যাটারি, কার্যকর ব্রেক, লাইট ও ইন্ডিকেটর বাধ্যতামূলক করা।
দ্বিতীয় ধাপ: নিবন্ধন
প্রতিটি যানবাহন ও চালককে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং ডিজিটাল ডাটাবেস তৈরি করা।
তৃতীয় ধাপ: রুট ব্যবস্থাপনা
প্রধান সড়ক ও আবাসিক এলাকার জন্য আলাদা রুট নীতি তৈরি করা।
চতুর্থ ধাপ: শেয়ারড সার্ভিস
নির্দিষ্ট রুটে যাত্রী শেয়ার করার ব্যবস্থা, নির্ধারিত ভাড়া ও স্টপেজ চালু করা।
পঞ্চম ধাপ: গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয়
মেট্রোরেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও প্রধান পরিবহন করিডোরকে কেন্দ্র করে ফিডার সার্ভিস চালু করা।
ষষ্ঠ ধাপ: ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা
অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, পুরোনো ব্যাটারি ফেরত নেওয়া এবং বাধ্যতামূলক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু করা।
সপ্তম ধাপ: প্রযুক্তিগত রূপান্তর
ধাপে ধাপে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন বাদ দিয়ে উন্নত, নিরাপদ ও অধিক দক্ষ বৈদ্যুতিক মডেলে রূপান্তর করা।
চিকিৎসকের বক্তব্য: উদ্বেগ সঠিক, কিন্তু আলোচনাটি আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার
কোনো চিকিৎসক যদি বলেন ইজি রিকশা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে কিংবা ব্যাটারি দূষণ করছে— সেসব উদ্বেগকে সরাসরি ভুল বলা যাবে না।
সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্যের বিষয়। দূষণও জনস্বাস্থ্যের বিষয়।
কিন্তু একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের আরেকটি প্রশ্ন হলো— নিম্নআয়ের মানুষ কীভাবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য পরিবহন পাবে?
সুতরাং সমস্যাকে শুধু একটি যানবাহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে সমাধান অসম্পূর্ণ থাকবে।
ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা, ইজি রিকশা— সব যানবাহনের ক্ষেত্রেই রাস্তার জায়গা, যাত্রী বহনক্ষমতা, জ্বালানি/বিদ্যুৎ ব্যবহার, দূষণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি একই কাঠামোয় বিচার করা প্রয়োজন।
শেষ কথা: নিষেধাজ্ঞা নয়, নকশা বদলাতে হবে
বাংলাদেশে ইজি রিকশা এখন একটি বাস্তবতা। বহু মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল। বহু পরিবার এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। আর গণপরিবহনের ঘাটতির কারণে বহু যাত্রীর জন্য এটি প্রয়োজনীয়।
তাই ইজি রিকশাকে রাতারাতি উচ্ছেদ করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং লক্ষ্য হওয়া উচিৎ—
♠ অনিরাপদ ইজি রিকশা বাদ দেওয়া।
♠ নিরাপদ ইজি রিকশাকে নিবন্ধন করা।
♠ চালকদের প্রশিক্ষিত করা।
♠ নির্দিষ্ট রুট তৈরি করা।
♠ শেয়ারড যাতায়াত উৎসাহিত করা।
♠ গণপরিবহনের শেষ মাইলের সঙ্গে যুক্ত করা।
♠ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা।
♠ এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির রাস্তা ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে বিবেচনা করা।
ভারত দেখিয়েছে ই-রিকশাকে নিয়ন্ত্রিত last-mile transport-এর অংশ করা যায়। শ্রীলঙ্কা দেখাচ্ছে প্রচলিত থ্রি-হুইলারকে প্রযুক্তিগতভাবে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়। বাংলাদেশও এখন ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর মধ্যে আনার পথে এগোচ্ছে।
তাই ঢাকার জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিৎ নয়—
‘ইজি রিকশা থাকবে কি থাকবে না?’
প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—
‘ইজি রিকশাকে কীভাবে ঢাকার নিরাপদ, সাশ্রয়ী, শেয়ারড এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ বানানো যায়?’
কারণ ঢাকার রাস্তা শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নয়। শুধু বাসের জন্যও নয়।
ঢাকার রাস্তা সবার।
উচ্চবিত্তের যেমন, নিম্নবিত্তেরও তেমন।
আর সেই কারণেই ইজি রিকশার সমস্যার সমাধান হতে হবে এমন— যাতে নিরাপত্তা বাড়ে, যানজট কমে, দূষণ কমে এবং একই সঙ্গে শহরের নিম্নবিত্ত মানুষের চলাচলের অধিকারও অক্ষুণ্ন থাকে।
FollowUpNews ডেস্ক।
