ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তিস্তা, সোনাদিয়া, সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রশ্নে দিল্লির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখেও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর ভারতে অবস্থান দলটির রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও দরকষাকষির ক্ষমতাকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যে ভারত একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের কৌশলগত অংশীদার ছিল, সেই ভারতেই এখন দলটির একটি অংশের রাজনৈতিক আশ্রয় ও সাংগঠনিক যোগাযোগের কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এটি কি ভারতের জন্য আওয়ামী লীগকে নিজের কৌশলগত বলয়ে আটকে রাখার সুযোগ, নাকি একসময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্রকে নির্ভরশীল করে তোলার এক অনিবার্য পরিণতি?
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
ভারত-আওয়ামী লীগ সম্পর্ক: ঘনিষ্ঠতা, স্বার্থ ও দরকষাকষি
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা করেছে।
ভারত বিশেষ করে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ পেয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতাও দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগ সরকার সব ক্ষেত্রে ভারতের প্রত্যাশা মেনে নিয়েছিল। বরং একই সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও সামরিক সম্পর্কও বিস্তৃত হয়েছে। পরকীয়ার মতো চীনের সাথে আওয়ামী সরকার গভীর এবং অনেকক্ষেত্রে গোপন সম্পর্ক বজায় রেখেছিলো।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত সহযোগিতার পর্যায়ে উন্নীত হয়। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে চীনের উপস্থিতি বাড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়: আওয়ামী লীগ সরকার কি ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ-স্বার্থ পূরণ করার পাশাপাশি চীনের কাছ থেকেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছিল?
প্রকাশ্য ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এমন একটি ভারসাম্যনীতির ইঙ্গিত দেয়।

সোনাদিয়া ও তিস্তা: ভারতের সংবেদনশীলতার জায়গায় আওয়ামী লীগের অবস্থান
বাংলাদেশের সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহ ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের সম্ভাব্য আপত্তি এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ভারত সরাসরি প্রকল্পটি বাতিল করিয়েছে— এমন প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পেও চীনের আগ্রহ ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছিল। অন্যদিকে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার চীন সফরের আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছিল। তিস্তা প্রকল্প, চীনের বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে চীনের ভূমিকা দিল্লির কৌশলগত আলোচনায় ছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ রেখেছিল। দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ, কিন্তু সব ক্ষেত্রে একমুখী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক ছিল না।
২০২৪ সালের পটপরিবর্তন: দরকষাকষির অবস্থান বদলে গেল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন শুধু বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোকেও বদলে দেয়।
শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একটি অংশও ভারতে চলে যায়। কলকাতা ও দিল্লিতে দলটির নেতাদের অবস্থান, যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৮ আগস্ট BBC Bangla-র প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, কলকাতার একটি বাণিজ্যিক ভবনে আওয়ামী লীগের একটি অনানুষ্ঠানিক দলীয় কার্যালয় গড়ে উঠেছে। সেখানে দলটির নেতাদের বৈঠক হয়। প্রতিবেদনটিতে দলীয় সূত্রের বরাতে বৃহত্তর কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া নেতাদের একটি অংশের তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দ্য গার্ডিয়ান জানায়, কলকাতায় ৬০০-এর বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী অবস্থান করছেন এবং তাদের একটি অংশ ভারতকে দলীয় যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে এই সংখ্যা ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের মোট নেতা-কর্মীর সংখ্যা নয়।
অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সংখ্যা কয়েক হাজার বলে দাবি করা হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ সরকারি বা স্বাধীন তালিকা ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবে সংখ্যার বিতর্কের বাইরে একটি বাস্তবতা রয়েছে: আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা-কর্মী এখন দেশের বাইরে, বিশেষ করে ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে দলটির রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের একটি অংশ বাংলাদেশের বাইরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ভারত কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল থেকে কৌশলগত নিয়ন্ত্রকের অবস্থানে যেতে পারে?
এখানেই প্রশ্নটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে দলটির হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসনিক কাঠামো, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদার ছিল। চীনের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল সেই বিকল্পের একটি অংশ।
কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর পরিস্থিতি পাল্টেছে। ভারতে অবস্থানরত নেতাদের নিরাপত্তা, চলাচল, রাজনৈতিক যোগাযোগ, দলীয় বৈঠক এবং প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের পরিবেশ অনেকাংশে ভারতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
এটি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।
২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় ভূখণ্ডে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয় ও দলীয় কার্যক্রম নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানায়। ঢাকার বক্তব্য ছিল, ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হবে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে যে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য এবং কলকাতায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও দলীয় বৈঠক নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পাশাপাশি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই দুই ধরনের তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন তৈরি করে: ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের সাংগঠনিক তৎপরতার প্রকৃত পরিসর কী, আর ভারত সরকার তাদের কোন সীমার মধ্যে কাজ করতে দিচ্ছে?
ভারত চাইলে আশ্রয়, চলাচল, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলটির ওপর প্রভাব রাখতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ভারতের ঘোষিত নীতি বা প্রমাণিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

আওয়ামী লীগের জন্য কি ভারতের আশ্রয় একসময় তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে?
এখানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি বৈপরীত্য রয়েছে।
একসময় দলটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল। এখন দলটির একটি বড় অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা, আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর।
ভারতে অবস্থান দলটির নেতৃত্বকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কয়েকটি সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
প্রথমত, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সংকট: আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের আইন ও নীতির বাইরে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল কাজ করতে পারে না। ফলে দলীয় সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির ক্ষেত্রে বাস্তব সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরের কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব: নেতৃত্বের বড় অংশ বিদেশে থাকলে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা, সংগঠন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে। কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দেশের ভেতরের কর্মীদের এই দূরত্ব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রশ্নও উঠেছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের সংকট: একটি দল যদি দীর্ঘদিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থান করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাহলে দেশের ভেতরে তার স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
চতুর্থত, ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা: দলটির নেতৃত্বের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক যোগাযোগ যদি ভারতনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ যে দল একসময় ভারতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দরকষাকষি করত, সেই দলই এখন ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভারত কি আওয়ামী লীগকে কোলে তুলে নিজের কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে পারে?
প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগকে আশ্রয় দেওয়ার নয়। বরং আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে দলটির রাজনৈতিক আচরণ, বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ অবস্থানের ওপর ভারতের কতটা প্রভাব তৈরি হতে পারে, সেটি বিবেচনার বিষয়।
ভারতের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।
এক. আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের তৎপরতা সীমিত রাখা।
দুই. দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের দরকষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করা।
তিন. আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা খোলা রেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
চার. আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে তাদের ভারতনির্ভরতার বাস্তবতা বজায় রাখা।
এসবই সম্ভাব্য কৌশলগত দৃশ্যপট। কোনটি ভারত বাস্তবে অনুসরণ করছে, তা নির্ধারণ করতে সরকারি নথি, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এখন আগের মতো স্বাধীন দরকষাকষির অবস্থানে নেই।

চীন কি এই পরিস্থিতির সুবিধা নিচ্ছে?
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদার হয়ে উঠেছিল। ২০১৯–২০২৩ সময়ে বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানির ৭৩ শতাংশ চীন থেকে এসেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চীন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি হয়। চীন বাংলাদেশে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয় বলে একই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কাজ করেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চীনের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার ছিল, সরকার পরিবর্তনের পরও সেই চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি অংশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ভারতের জন্যও কি এটি বুমেরাং?
ভারত আওয়ামী লীগকে আশ্রয় দিয়ে সাময়িকভাবে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিল্লির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের ঘনিষ্ঠ সমর্থন এবং তাঁর ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের জনমনে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ পরিকল্পনাকেও জটিল করতে পারে।
তবে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে আওয়ামী লীগকে আশ্রয় দেওয়া এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে ভারতকে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হচ্ছে।
এখানে ভারতের জন্যও ঝুঁকি রয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের অন্য রাজনৈতিক শক্তি ও সাধারণ মানুষের কাছে ভারতকে একটি নির্দিষ্ট দলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখা হতে পারে। আবার আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও নিজস্ব কৌশলগত হিসাব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একসময় যে আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে দরকষাকষি করত, এখন কি সেই দলই ভারতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়?
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ রেখেছিল। দিল্লির নিরাপত্তা ও যোগাযোগ-স্বার্থ পূরণ করার পাশাপাশি বেইজিংয়ের বিনিয়োগ, ঋণ ও সামরিক সহযোগিতা গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা-কর্মীর ভারতে অবস্থান দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভবিষ্যৎকে নতুন নির্ভরশীলতার মধ্যে ফেলেছে।
ভারত চাইলে এই অবস্থানকে কৌশলগত সুবিধায় রূপান্তর করতে পারে। আশ্রয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দলীয় কার্যক্রমের পরিসর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগকে “সঠিক কাজটি করতে”, শাস্তি দিতে বা তিক্ত স্বাদ দিতে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে— এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।
তবু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: আওয়ামী লীগ কি একসময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল, আর এখন সেই ভারতেই আশ্রিত হয়ে নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে?
আর ভারতের জন্য প্রশ্নটি আরও বড়: একটি রাজনৈতিক দলকে আশ্রয় দিয়ে কি সে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জায়গায় নতুন জটিলতা তৈরি করছে?
যে আওয়ামী লীগ একসময় রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছিল, সেই দলই এখন ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করে কতটা স্বাধীনভাবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে— এটাই ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ-ভারত ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রতিবেদনটির গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ও নথি
১. The Guardian, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: “The exiled Awami League members plotting a political comeback in Bangladesh – from India”। কলকাতায় ৬০০-এর বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর অবস্থান, দলীয় যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। https://www.theguardian.com/world/2026/feb/03/exiled-awami-league-members-political-comeback-india
২. The Daily Star, ৮ আগস্ট ২০২৫: “AL discreetly sets up ‘party office’ in Kolkata”। কলকাতায় আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক দলীয় কার্যালয়, বৈঠক এবং ভারতে অবস্থানরত নেতাদের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে প্রতিবেদন। https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/news/al-discreetly-sets-party-office-kolkata-3958581
৩. Dhaka Tribune, ২০ আগস্ট ২০২৫: “Dhaka urges Delhi to close banned Awami League offices on Indian soil”। ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ ও দিল্লির কাছে বাংলাদেশের অবস্থান। https://www.dhakatribune.com/bangladesh/foreign-affairs/389487/dhaka-urges-delhi-to-close-banned-awami-league
৪. The Indian Express, ৩১ জুলাই ২০২৬: “Government to House panel: Sheikh Hasina not allowed to conduct political activities from India”। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে ভারত সরকারের সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া বক্তব্য। https://indianexpress.com/article/india/sheikh-hasina-bangladesh-india-extradition-parliament-panel-10811268/
৫. Lee Kuan Yew School of Public Policy, ১ আগস্ট ২০২৪: “The Fall of Sheikh Hasina: Setbacks and Opportunities for India and China”। আওয়ামী লীগ সরকারের ভারত-চীন ভারসাম্যনীতি, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, তিস্তা প্রকল্প এবং ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ। https://lkyspp.nus.edu.sg/cag/publications/center-publications/publication-article/detail/the-fall-of-sheikh-hasina-setbacks-and-opportunities-for-india-and-china
৬. Congressional Research Service, ৫ জুন ২০২৬: “Recent Political Developments in Bangladesh: Background and Issues for Congress”। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভারত-চীন সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা প্রতিবেদন। https://www.everycrsreport.com/reports/R48975.html
৭. International Institute for Strategic Studies (IISS), ফেব্রুয়ারি ২০২৫: “The dimming of Bangladesh–India relations”। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি, বাংলাদেশের জনমনে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষণ। https://www.iiss.org/publications/strategic-comments/2025/02/the-dimming-of-bangladeshindia-relations/
৮. Chatham House, ফেব্রুয়ারি ২০২৬: “India wants to reset relations after Bangladesh elections. It will be easier said than done”। বাংলাদেশের নির্বাচনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্লেষণ। https://www.chathamhouse.org/2026/02/india-wants-reset-relations-after-bangladesh-elections-it-will-be-easier-said-done
তথ্য যাচাইসংক্রান্ত সতর্কতা: ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য সরকারি বা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তালিকা ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যাকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ নয়। একইভাবে ভারত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বা ইচ্ছাকৃতভাবে শাস্তি দিচ্ছে— এমন দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন।
