Headlines

একজন জেলেকে হত্যা করে উগ্রবাদের কবলে দিশেহারা পুলিশ কি তার ক্ষমতা দেখালো?

জেলেকে হত্যা
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক | ৩০ অক্টোবর ২০২৬

একদিকে উগ্রবাদ, অপরাধ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, অর্থনৈতিক অপরাধ ও জননিরাপত্তার সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া একজন দরিদ্র জেলের বুকে গুলির ক্ষত নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বরিশালের হিজলা উপজেলার মেঘনা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন জেলে আকতার হোসেন হাওলাদার (৪০)। ২৯ অক্টোবর ভোরের এই ঘটনায় আরও কয়েকজন জেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নৌ-পুলিশের সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে একজন মানুষের মৃত্যুর পরও কে গুলি চালিয়েছে, কার নির্দেশে চালিয়েছে এবং কেন চালিয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

জেলেকে হত্যা
নদীতে ইলিশ ধরার অপরাধে কি একজন জেলের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কাউকে দিয়েছে? উগ্রবাদ, চাঁদাবাজি ও সংগঠিত অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে যখন প্রশ্ন, তখন একজন দরিদ্র জেলের বুকে গুলি চালিয়ে কিসের ক্ষমতা প্রদর্শন? আইন প্রয়োগের নামে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি। ছবিঃ প্রতিকী ছবি।

মেঘনার বুকে কী ঘটেছিল?

সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর বুধবার রাতে আকতার হোসেনসহ কয়েকজন জেলে মাছ ধরতে মেঘনা নদীতে যান। বৃহস্পতিবার ভোরে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের শাওড়া অরাকুল মাছঘাটসংলগ্ন এলাকায় তাদের নৌযানের সঙ্গে একটি অভিযানকারী দলের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহতের বোন সাথী আক্তার আহত জেলেদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করেছেন, কোস্টগার্ড ও চাঁদপুর নৌ-পুলিশের সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালান। অন্যদিকে, বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার বক্তব্য এসেছে, সংঘর্ষের সময় আত্মরক্ষার্থে অভিযানকারী দল গুলি চালিয়েছিল।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস সিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে পুলিশি গুলিতে আকতার নিহত এবং আবদুল ব্যাপারী নামের আরেক জেলে আহত হওয়ার কথা জানা গেছে।

তবে বরিশাল ও চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ-পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ, একই ঘটনার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি রয়েছে।

মেঘনায় জেলেকে হত্যা

একজন মানুষের শরীরে অসংখ্য ছররা গুলি

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিহত আকতারের শরীরে গুলির ক্ষত। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিজলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোলায়মান জানিয়েছেন, আকতারের ঘাড় ও বুকে গুলির দাগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁর ধারণা, এগুলো ছররা গুলির আঘাত।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অনিক বিশ্বাসের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আকতারকে হাসপাতালে আনার সময় তার মুখ, বুক ও হাত অসংখ্য ছররা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত ছিল। চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. কত দূরত্ব থেকে গুলি চালানো হয়েছিল?

২. জেলেদের নৌযানে কতজন মানুষ ছিলেন?

৩. তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, নাকি ইট-পাটকেল ছিল?

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষার দাবি করলে সেই পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র কী?

৫. ছররা গুলি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া গুলিবর্ষণকে বৈধ আত্মরক্ষা কিংবা অবৈধ বলপ্রয়োগ— কোনোটিই চূড়ান্তভাবে বলা যায় না। ময়নাতদন্ত, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা, ঘটনাস্থলের আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জেলে নিহত

নিষেধাজ্ঞা ভাঙার অপরাধ, মৃত্যুদণ্ড নয়

মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ ছিল। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে ভিজিএফ খাদ্যসহায়তা দেওয়ারও কথা ছিল।

আকতার হাওলাদার নিষেধাজ্ঞা চলাকালে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন— প্রকাশিত সংবাদে এমন তথ্য রয়েছে। কাজটি আইনবিরুদ্ধ হলে তার বিরুদ্ধে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। নৌকা আটক, জাল জব্দ, মামলা, জরিমানা কিংবা আদালতের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু কোনো ব্যক্তি আইন ভাঙলেই তাকে গুলি করে হত্যার অধিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেয়ে যায় না।

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি— আইন প্রয়োগ এবং প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ এক বিষয় নয়। অপরাধ প্রতিরোধের নামে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীন হতে পারে না। আত্মরক্ষার প্রয়োজন থাকলেও ব্যবহৃত শক্তি পরিস্থিতির তুলনায় প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।

বাংলাদেশের পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গলের ১৫৩ বিধি এবং প্রচলিত আইনি কাঠামোতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও সীমা রয়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অনুমতি নেই। এমনকি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬(৩) ধারায় নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

অতএব, আকতার নিষেধাজ্ঞা ভেঙেছিলেন কিনা, সেটি একটি প্রশ্ন। আর তাকে গুলি করে হত্যা করা আইনসিদ্ধ ছিল কিনা, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং আরও গুরুতর প্রশ্ন।

মেঘনায়

পুলিশের অভিযান ছিল, অথচ পুলিশ জানে না?

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানসংক্রান্ত বক্তব্যের অসংগতি।

একদিকে স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, নৌ-পুলিশ মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাচ্ছিল। সংঘর্ষের একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।

অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বরিশাল অঞ্চলের নৌ-পুলিশ সুপার নজমুল হক, চাঁদপুর অঞ্চলের নৌ-পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান এবং কোস্টগার্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এসেছে— তাদের কেউই ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা স্বীকার করেননি।

হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমানও জানিয়েছেন, তাদের কোনো অভিযানকারী দল ওই রাতে সেখানে যায়নি। তাদের স্পিডবোট বিকল থাকায় ছোট ট্রলারে সীমিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে গুলি চালিয়েছিল কারা?

যদি নৌ-পুলিশ গুলি চালিয়ে থাকে, তাহলে তাদের অভিযান অস্বীকার করার কারণ কী? যদি কোস্টগার্ড গুলি না চালিয়ে থাকে, তাহলে তাদের নাম কেন অভিযোগে আসছে? আর যদি অন্য কোনো বাহিনী সেখানে অভিযান চালিয়ে থাকে, তাহলে সেই বাহিনীর পরিচয়, অভিযান পরিচালনার আদেশ এবং অস্ত্র ব্যবহারের হিসাব কোথায়?

রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে, অথচ সেই দায়িত্বের অস্তিত্বই পরে অস্বীকার করবে— এমন পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পরিবারের বিচার চাওয়ার সাহসটুকুও কি নেই?

আকতারের বোন সাথী আক্তারের বক্তব্য এই ঘটনার আরেকটি মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ নেই। কারণ অভিযোগ করলে আরও হয়রানির শিকার হতে পারেন বলে তাদের আশঙ্কা। তারা ময়নাতদন্ত ছাড়াই ভাইয়ের মরদেহ দাফন করতে চেয়েছিলেন।

অন্যদিকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে তার বক্তব্য এসেছে— ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু বিচার চাইতে গেলে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একটি পরিবারের এই ভয়কে সাধারণ অনীহা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতা, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রশ্ন তৈরি করে।

একজন দরিদ্র জেলের পরিবার যদি মনে করে, হত্যার বিচার চাইতে গেলেই তাদের হয়রানির মুখে পড়তে হবে, তাহলে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার অভিযোগ করতে না চাইলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একজন মানুষের অস্বাভাবিক ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুকে শুধু পরিবারের অভিযোগের ওপর নির্ভর করে নিষ্পত্তি করা যায় না।

মেঘনায়

উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সক্ষমতা কোথায়?

রাষ্ট্র যখন উগ্রবাদ, সংগঠিত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অর্থনৈতিক অপরাধ মোকাবিলার প্রশ্নে জনমনে নানা উদ্বেগের মুখে, তখন একজন সাধারণ জেলের ওপর অস্ত্রের ক্ষমতা প্রয়োগের ঘটনা রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য তৈরি করে।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল অস্ত্র, ইউনিফর্ম কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষমতায় প্রকাশ পায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা প্রকাশ পায় অপরাধীকে শনাক্ত করা, অপরাধের তদন্ত করা, দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখার মধ্য দিয়ে।

উগ্রবাদ বা সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগের বিপরীতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার শক্তি প্রয়োগ হতে পারে না। আবার একজন জেলে আইন ভেঙে থাকলেও তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠলে সেটিও রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর জবাবদিহির বিষয়।

এই দুই বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উগ্রবাদের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নেই। প্রশ্নটা হচ্ছে— পুলিশও সফট্ টার্গেট বেছে নেয় কিনা। ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগে বৈষম্য, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

আকতার হাওলাদারের মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি থানার তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিৎ হবে না। ঘটনার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান প্রয়োজন।

১. ২৯ অক্টোবর ভোর ৪টা থেকে ৭টার মধ্যে শাওড়া অরাকুল মাছঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে কোন কোন বাহিনীর নৌযান চলাচল করেছে?

২. নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অভিযান রেজিস্টার এবং ডিউটি রোস্টারে কী তথ্য রয়েছে?

৩. কোনো বাহিনী অস্ত্র ও ছররা গুলি ব্যবহার করে থাকলে তার অস্ত্র ইস্যু রেজিস্টার, গুলির হিসাব এবং ব্যবহারের অনুমোদন কোথায়?

৪. আকতারের শরীর থেকে উদ্ধার হওয়া গুলির প্রকৃতি কী? ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত অস্ত্র শনাক্ত করা সম্ভব কিনা?

৫. ঘটনাস্থলে থাকা অন্য জেলেদের বক্তব্য, নৌযানের অবস্থান, ক্ষতচিহ্ন ও অন্যান্য আলামত কী নির্দেশ করে?

৬. অভিযান পরিচালনার লিখিত নির্দেশনা ছিল কিনা এবং গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলো?

৭. অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের পরিচয় ও দায়িত্ব কী ছিল?

৮. স্থানীয় প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের বক্তব্যে যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী?

৯. গুলিবিদ্ধ অন্য জেলেদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা?

১০. ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কিনা?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, পুলিশ জিডির ভিত্তিতে আকতারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। এই পরীক্ষার ফলাফল তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পুলিশের গুলিতে জেলে নিহত
বাংলা ট্রিবিউনের খবর।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার বিরুদ্ধে, কার স্বার্থে?

বাংলাদেশের নদী, বন, সীমান্ত, বাজার ও অর্থনীতিতে নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের ভিত্তিতে, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে।

একজন দরিদ্র জেলে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মাছ ধরতে গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তার বুকে গুলি চালিয়ে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলে সেই ঘটনার জবাব দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

রাষ্ট্র যদি ক্ষমতাবান অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, অথচ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

আকতার হাওলাদারের মৃত্যু তাই কেবল একজন জেলের মৃত্যু নয়। এটি নদীতে আইন প্রয়োগের পদ্ধতি, পুলিশের জবাবদিহি, দরিদ্র মানুষের বিচারপ্রাপ্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রের শক্তি ব্যবহারের সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র আছে বলেই রাষ্ট্র শক্তিশালী নয়। রাষ্ট্র কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই তার শক্তির প্রকৃত পরিচয়।

আকতার হাওলাদারের মৃত্যুর দায় কার, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো বাহিনীকে আগাম দায়ী কিংবা দায়মুক্ত করা যাবে না। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আহত জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যথায় মেঘনার বুকে একজন জেলের রক্তের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তথ্যসূত্র:

  • The Daily Star: Fisherman killed in Meghna: Locals allege River Police firing, cops deny claim.
  • The Business Standard: Fisherman shot dead in Meghna; eyewitnesses accuse River Police of opening fire.
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: মেঘনায় মাছ ধরতে গিয়ে গুলিতে জেলে নিহত।
  • বাংলা ট্রিবিউন: ইলিশ ধরতে গিয়ে নৌ-পুলিশের গুলিতে জেলের মৃত্যু।
  • UNB: Fisherman killed, four others injured in firing during clash with river police.