Headlines

কক্সবাজারে এত এনজিও, বদলেছে আসলে কী?

নয় বছরে শত শত সংস্থা, হাজার কোটি টাকার মানবিক সহায়তা—তারপরও কেন শেষ হয়নি সংকট?


নিজস্ব প্রতিবেদক

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী বসতি। এর সঙ্গে গড়ে ওঠে বিশাল মানবিক সহায়তা কাঠামো। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিও, দেশীয় এনজিও, দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান মিলে গত প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করছে।

২০২৬ সালের Joint Response Plan (JRP) অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ৯৮টি জাতিসংঘ সংস্থা ও এনজিও অংশীদার রয়েছে। এ বছর প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থের একটি বিশাল মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— এত বছর ধরে এত সংস্থা, এত প্রকল্প এবং এত অর্থ ব্যয়ের পর কক্সবাজারে আসলে কী বদলেছে?

কোন কোন খাতে কাজ করছে এনজিওগুলো?

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মূলত কয়েকটি বড় খাতে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

• খাদ্য নিরাপত্তা
• স্বাস্থ্যসেবা
• পুষ্টি
• শিক্ষা
• পানি ও স্যানিটেশন
• আশ্রয় ও ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা
• শিশু সুরক্ষা
• নারী ও কিশোরীদের সুরক্ষা
• জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন
• আইনি সহায়তা
• প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা
• দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
• কমিউনিটি সুরক্ষা

উল্লেখযোগ্য দেশীয় এনজিও

কক্সবাজারের মানবিক কার্যক্রমে দেশীয় বিভিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে রয়েছে—

BRAC, Caritas Bangladesh, Mukti Cox’s Bazar, FIVDB, Prottyashi, YPSA, NGO Forum for Public Health, CODEC, COAST Foundation, Gonoshasthaya Kendra, RDRS Bangladesh, SAWAB, Friendship, GUSS, PHALS, PULSE Bangladesh, SHED, Uttaran, Shushilan, Jago Nari, Jagorani Chakra Foundation, Bandhu Social Welfare Society, BLAST, BNWLA, BNPS, CDD, CNRS, DSK, ESDO, GUK, Nari Maitree, NCDW, PHD, RIC, RWWS, SKUS, SARPV, VERC, ACLAB, Agrajattra, Anando, AID-Comilla, BITA, BGS, BTS, Bolipara Nari Kalyan Samity, CWFD, HELP, JSK, JSUS, OPCA, RTMI ও RIMESসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

এসব সংস্থা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানি-স্যানিটেশন, জীবিকা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, আইনি সহায়তা, প্রতিবন্ধিতা এবং কমিউনিটি উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কার্যক্রম

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর উপস্থিতিও বড়।

Action Against Hunger, ActionAid, ACTED, BBC Media Action, CARE International, CBM Global Disability Inclusion, Christian Aid, Concern Worldwide, Danish Refugee Council, Welthungerhilfe, Educo, Habitat for Humanity, HEKS, Humanity & Inclusion, iDE, International Rescue Committee, IPAS, Islamic Relief, MedGlobal, Norwegian Refugee Council, OBAT Helpers, Oxfam, Plan International, Qatar Charity, Save the Children, Terre des Hommes, UCEP, United Purpose ও World Visionসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের IOM, UNHCR, UNICEF, WFP, WHO, UNFPA, UN Women, UNDP, UNESCO, FAO ও UNOPS-এর মতো সংস্থাও বিভিন্ন খাতে যুক্ত রয়েছে।

অর্থের পরিমাণ কত?

২০২৫ সালের JRP-তে কক্সবাজারের মানবিক সহায়তার জন্য প্রায় ৮৮৭.৯৮ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন দেখানো হয়েছিল।

খাতভিত্তিক প্রয়োজনের চিত্র ছিল—

খাদ্য নিরাপত্তা — ২৮৭.০৮ মিলিয়ন ডলার

আশ্রয় ও ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা — ১৭৬.৮১ মিলিয়ন ডলার

স্বাস্থ্য — ৯২.৩৪ মিলিয়ন ডলার

পানি ও স্যানিটেশন — ৭৩.৩৬ মিলিয়ন ডলার

শিক্ষা — ৭১.৫২ মিলিয়ন ডলার

পুষ্টি — ৪৪.৯৩ মিলিয়ন ডলার

জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়ন — ৪১.৯৭ মিলিয়ন ডলার

সুরক্ষা — ৩৮.৩২ মিলিয়ন ডলার

শিশু সুরক্ষা — ২৫.০৪ মিলিয়ন ডলার

নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ — ২৭.৪৪ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ শুধু খাদ্য নিরাপত্তা এবং আশ্রয়-ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা খাতেই প্রায় ৪৬৪ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন দেখানো হয়েছিল।

নয় বছর পর কী বদলেছে?

নিঃসন্দেহে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা, নারী সুরক্ষা, আশ্রয় এবং দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

অনেক মানুষ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছে। শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। নারী ও শিশুদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু এগুলো মূলত মানবিক সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা।

সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।

রোহিঙ্গারা এখনও ক্যাম্পে

২০১৭ সালের পর প্রায় নয় বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনও কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাস করছে।

অর্থাৎ জরুরি মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

খাদ্য সহায়তা এখনও প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা এখনও প্রয়োজন।

পানি ও স্যানিটেশন এখনও প্রয়োজন।

শিক্ষা ও সুরক্ষা কার্যক্রম এখনও প্রয়োজন।

জীবিকা প্রকল্পও চলছে।

প্রশ্ন হলো— এত বছর ধরে চলা এই প্রকল্পগুলো কি রোহিঙ্গাদের ক্রমশ স্বনির্ভর করে তুলতে পেরেছে?

জীবিকা প্রকল্পের বাস্তব ফল কতটা?

জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্যও কোটি কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে।

কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জীবিকা কর্মসূচি চালু রয়েছে।

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—

প্রশিক্ষণ নেওয়া কতজন ব্যক্তি নিয়মিত আয় করতে পারছেন?

কতজন পরিবার মানবিক সহায়তা থেকে বেরিয়ে স্বনির্ভর হয়েছে?

কতজনের মাসিক আয় বেড়েছে?

প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কতটি উদ্যোগ টিকে আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কী লাভ হয়েছে?

রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর।

তাদের জমি, পরিবেশ, বাজার, শ্রমবাজার, যানবাহন, বাসস্থান ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে।

মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ সালের পরিকল্পনায় ৩ লাখ ৯০ হাজারের বেশি vulnerable Bangladeshi host population-কে সহায়তার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান ২০১৭ সালের তুলনায় কতটা উন্নত হয়েছে— এটি আলাদা করে পরিমাপ করা জরুরি।

একই কাজ কি একাধিক সংস্থা করছে?

এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা।

একই এলাকায় একাধিক এনজিও একই ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিনা?

একই জনগোষ্ঠীর জন্য একাধিক সংস্থা একই ধরনের জীবিকা প্রকল্প চালাচ্ছে কিনা?

একই beneficiary কি একাধিক প্রকল্পে গণনা হচ্ছে?

একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তার ফলাফল কতদিন টিকে থাকছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে মানবিক কার্যক্রমের সফলতা বিচার করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক এনজিও বনাম স্থানীয় এনজিও

কক্সবাজারে স্থানীয় এনজিওগুলোর উপস্থিতি বড় হলেও আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরাসরি কত অর্থ পাচ্ছে?

স্থানীয় এনজিওগুলো সরাসরি donor funding কতটা পাচ্ছে?

কতগুলো স্থানীয় এনজিও আন্তর্জাতিক সংস্থার implementing partner হিসেবে কাজ করছে?

একটি প্রকল্পের মোট বাজেটের কত অংশ মাঠপর্যায়ে যায়?

আর কত অংশ ব্যয় হয় অফিস, কর্মকর্তা-কর্মচারী, যানবাহন, consultant, monitoring ও administrative overhead-এ?

এই তথ্যগুলো প্রকাশ্যে এনে তুলনা করা প্রয়োজন।

তাহলে কি এনজিওগুলো ব্যর্থ?

না।

রোহিঙ্গা সংকটে এনজিও ও মানবিক সংস্থাগুলোর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কয়েক লক্ষ মানুষের খাবার, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।

মানবিক সহায়তা কি সংকটের স্থায়ী সমাধান তৈরি করতে পেরেছে?

উত্তর হলো— এখনও না।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হয়নি।

ক্যাম্পনির্ভরতা শেষ হয়নি।

খাদ্যনির্ভরতা শেষ হয়নি।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ কমেনি।

বরং ২০২৬ সালেও নতুন করে শত শত মিলিয়ন ডলারের humanitarian response প্রয়োজন হচ্ছে।

আসল অনুসন্ধান কোথায়?

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিৎ নয়—

“কক্সবাজারে এত এনজিও কেন?”

প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—

“২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা সংকটে মোট কত টাকা এসেছে, কোন সংস্থা কত টাকা পেয়েছে, কী প্রকল্প করেছে এবং তার measurable outcome কী?”

আরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও জরুরি—

১. একই কাজের জন্য কয়টি সংস্থা কাজ করছে?

২. একজন beneficiary-র পেছনে গড়ে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে?

৩. আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিওর মধ্যে অর্থ বণ্টনের অনুপাত কত?

৪. প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয় কত?

৫. প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কতটি কার্যক্রম টেকসই হয়েছে?

৬. প্রশিক্ষণ পাওয়া কতজন বাস্তবে আয় করছেন?

৭. ২০১৭ সালের তুলনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনমান কতটা পরিবর্তিত হয়েছে?

৮. গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের স্বনির্ভরতার হার কতটা বেড়েছে?

৯. একই beneficiary-কে বিভিন্ন সংস্থা বারবার গণনা করছে কিনা?

১০. এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এখনও নির্ভর করছে নতুন নতুন humanitarian appeal-এর ওপর?

কক্সবাজারে এনজিও কার্যক্রম প্রয়োজনীয়— এ নিয়ে বিতর্ক নেই।

কিন্তু নয় বছর ধরে চলা একটি মানবিক ব্যবস্থাকে শুধু কতগুলো প্রকল্প হয়েছে, কতজনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে কিংবা কতটি সংস্থা কাজ করছে— এসব দিয়ে সফল বলা যায় না।

সফলতা মাপতে হবে পরিবর্তন দিয়ে।

কতজন মানুষ স্বনির্ভর হয়েছে?
কতজনের আয় বেড়েছে?
কতজন ত্রাণনির্ভরতা থেকে বেরিয়েছে?
কতজন শিশু কার্যকর শিক্ষা পেয়েছে?
কতটি প্রকল্প স্থায়ী হয়েছে?
স্থানীয় মানুষের জীবন কতটা উন্নত হয়েছে?

সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

নয় বছরে এত অর্থ, এত সংস্থা, এত প্রকল্প— তারপরও যদি রোহিঙ্গারা ক্যাম্পেই থাকে এবং প্রতি বছর নতুন করে শত শত মিলিয়ন ডলারের আবেদন করতে হয়, তাহলে এই বিশাল humanitarian system আসলে সংকট সমাধান করছে, নাকি শুধু সংকট পরিচালনা করে যাচ্ছে?