Headlines

ফলোআপ নিউজের হাতে ডজনখানেক রাজস্ব কর্মকর্তার নাম, ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহারের অভিযোগ

কাস্টমস্

‘ঘুষ ছাড়া কোনো ব্যবসায়ীকে ছাড়েন না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নাজেহাল’ —অভিযোগের কেন্দ্রে ক্ষমতার অপব্যবহার।


ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধান

রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এবার রাজধানীর একাধিক ভ্যাট বিভাগে অনুসন্ধান চালিয়ে ডজনখানেক রাজস্ব কর্মকর্তার নাম পেয়েছে ফলোআপ নিউজ, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, ধানমন্ডি, ডেমরা, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিল বিভাগীয় অফিস এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার (এআরও) বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

অভিযোগের ধরনও অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন— ব্যবসায়ীকে অফিসে ডাকা, অফিসের বাইরে দেখা করতে বলা, একই বিষয় নিয়ে বারবার চাপ সৃষ্টি করা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে ব্যবসায়ী শেষ পর্যন্ত ‘মীমাংসার’ পথ খুঁজতে বাধ্য হন।

ফলোআপ নিউজের হাতে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনজন আরও এবং সাতজন এআরওসহ ডজনখানেক কর্মকর্তার নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ ও তথ্য যাচাই করছে অনুসন্ধানী টিম, কিছু ডকুমেন্টস্ও ফলোআপ নিউজের হাতে এসেছে।

ঘুষ না দিলে শেষ হয় না হয়রানি

“বেশী ভ্যাট দিলে কম করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, কম দিলে বেশী দেওয়ার জন্য চাপ”

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভ্যাট সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হওয়ার পর অনেক সময় বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

কাগজপত্র চাওয়া হয়, ব্যাখ্যা চাওয়া হয়, আবার দেখা করতে বলা হয়। এরপরও বিষয়টি ঝুলে থাকে। কখনো অফিসে, কখনো অফিসের বাইরে সাক্ষাতের জন্য চাপ আসে।

ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ— ‘কাজটি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে, নাকি কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সমঝোতা করতে হবে’— এই অনিশ্চয়তাই তাদের সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলে।

ফলে ছোট ব্যবসায়ী থেকে বড় ব্যবসায়ী— অনেকেই শেষ পর্যন্ত বাড়তি অর্থ ব্যয় করে ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো সেটি সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া পরিমাণের চেয়ে বেশী বলে অভিযোগ এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন এখনো আলাদাভাবে যাচাই করছে ফলোআপ নিউজ। অভিযোগগুলো বক্তব্য নির্ভর। লেনদেন হয় ক্যাশে এবং বিকাশ-এ। এ সংক্রান্ত লেনদেনের জন্য অনেক আরও এবং এআরও-এর মনোনীত লোক রয়েছে।

মামলা করার ক্ষমতা যখন চাপের অস্ত্র

ভ্যাট কর্মকর্তাদের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। অনিয়ম পেলে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন। এ ক্ষমতা রাজস্ব সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।

কিন্তু অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে— এই আইনগত ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে কোনো ব্যবসায়ীকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে কি না।

কারণ, একজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে— এই আশঙ্কাই অনেক সময় তাকে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীকে বারবার বোঝানো হয় যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ফলে ব্যবসায়ী দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নিষ্পত্তির অপেক্ষা না করে কর্মকর্তার সঙ্গে ‘সমঝোতার’ পথ খুঁজতে শুরু করেন।

আর এই জায়গাটিই ঘুষের সম্ভাব্য লেনদেনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার মামলা কিছু হয়ও। একজন অবসরপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মামলা কিছু না দিলে বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং কমিশনার ‘মুরগী’ কোথায় পাাবেন।

অফিসেও, অফিসের বাইরেও

ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে— শুধু অফিসে নয়, কোনো কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে অফিসের বাইরেও ব্যবসায়ীদের সাক্ষাতের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে অফিসের বাইরেই বেশী সাক্ষাৎ হয়।

দাপ্তরিক প্রয়োজনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা যেতে পারেন—এটি আলাদা বিষয়। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ীকে বারবার এমন স্থানে দেখা করতে বলা হচ্ছে কি না, যেখানে সাক্ষাতের কোনো স্পষ্ট দাপ্তরিক রেকর্ড থাকে না— সেটিই অনুসন্ধানের বিষয়।

কোনো কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে ফলোআপ নিউজ যাচাই করছে—

কখন ফোন করা হয়েছিল, কোথায় দেখা হয়েছিল, কেন দেখা করতে বলা হয়েছিল এবং সাক্ষাতের পর দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত কী হয়েছিল।

এই তথ্যগুলোর সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র পাওয়া গেলে তা প্রমাণসহ পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

‘ঘুষ ছাড়া ছাড়েন না’—অভিযোগের সত্যতা কতটা?

ফলোআপ নিউজের হাতে আসা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য— ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের ‘ছাড়’ পাওয়া কঠিন। অনেক কর্মকর্তা প্রায় শতভাগ কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুষ নেন বলে অভিযোগ এসেছে।

তবে সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে তার নাম উল্লেখ করে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করছে না ফলোআপ নিউজ। তবে কমপক্ষে তিনজন রাজস্ব কর্মকর্তার ঘুষ লেনদেনের রেকর্ড ফলোআপ নিউজ-এর হাতে রয়েছে।

অনুসন্ধানের লক্ষ্য হচ্ছে—

অভিযোগ → চাপ → সাক্ষাৎ → দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত → সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন

এই পুরো ধারাবাহিকতার মধ্য থেকে প্রমাণ খুঁজে বের করা।

নামগুলো কেন এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না?

ফলোআপ নিউজের হাতে থাকা ডজনখানেক নামের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে।

পরবর্তী প্রতিবেদনে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে—

  • সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম ও পদ;
  • কোন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন, করছেন;
  • কোন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অভিযোগ এসেছে;
  • কী ধরনের চাপ দেওয়া হয়েছে;
  • অফিসে কতবার ডাকা হয়েছে;
  • অফিসের বাইরে কোথায় সাক্ষাতের অভিযোগ রয়েছে;
  • মামলা বা আইনগত ব্যবস্থার ভয় দেখানোর কোনো তথ্য আছে কি না;
  • আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না;
  • এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য।

প্রমাণ ছাড়া কোনো নাম প্রকাশ করবে না ফলোআপ নিউজ।

অনুসন্ধান এখন কর্মকর্তাদের নামের দিকে

রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে এর আগেও অনুসন্ধান হয়েছে; এমনকি NBR-এর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্তের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে ফলোআপ নিউজের বর্তমান অনুসন্ধানের লক্ষ্য কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

লক্ষ্য হচ্ছে— একই ধরনের অভিযোগ একাধিক কর্মকর্তা ও একাধিক ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে কি না এবং এর পেছনে কোনো প্রচলিত ‘চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা আদায়ের’ পদ্ধতি কাজ করছে কি না।

দুদকের সঙ্গে আলোচনা, এখনো কোনো নাম দেয়নি ফলোআপ নিউজ

রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ ও অনুসন্ধানের বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ফলোআপ নিউজের আলোচনা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানের স্বার্থে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম দুদককে জানায়নি ফলোআপ নিউজ।
ফলোআপ নিউজের হাতে থাকা তথ্য ও প্রমাণ আরও যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, যোগাযোগের তথ্য এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে, কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা ও প্রমাণের পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছেও উপস্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করবে ফলোআপ নিউজ।
অনুসন্ধানের স্বার্থে আপাতত কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ না করলেও, ফলোআপ নিউজের হাতে থাকা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।