Headlines

বিএসটিআই আছে, অভিযানও হয়— কক্সবাজারের বড় হোটেলেও কি মানহীন পণ্যের দাপট?

মিষ্টি দই থেকে আইসক্রিম, কেক-পেস্ট্রি, বোতলজাত পানি— বড় হোটেলের খাবার ও পানীয়ের মান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

কক্সবাজার প্রতিনিধি

পর্যটনের শহর কক্সবাজার। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক এখানকার হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেতে খাবার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে বড় ও তারকা হোটেলগুলোতে খাবারের দাম যেমন বেশি, তেমনি পর্যটকদের প্রত্যাশাও থাকে মান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— দামি হোটেলের খাবার মানেই কি তা মানসম্মত?

কক্সবাজারে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন— বিএসটিআইয়ের জেলা কার্যালয় রয়েছে। সংস্থাটি পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষা, সিএম লাইসেন্স প্রদান, মোড়কজাত পণ্যের নিবন্ধন এবং ওজন-পরিমাপের বিষয় তদারকির দায়িত্ব পালন করে। বিএসটিআইয়ের কাঠামোতেই বাধ্যতামূলক পণ্যের তালিকা, সিএম লাইসেন্স এবং মোড়কজাত পণ্যের নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে।

তারপরও কক্সবাজারে বিএসটিআইয়ের অভিযান ও মোবাইল কোর্টে নিয়মিতভাবে লাইসেন্স, মোড়কজাতকরণ, পণ্যের মান এবং ওজন-পরিমাপসংক্রান্ত অনিয়ম সামনে আসছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে— খুচরা বাজারে যদি এসব অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে পর্যটননির্ভর বড় হোটেলগুলোর রান্নাঘর, বাফে, ক্যাফে ও রুম সার্ভিসে ব্যবহৃত পণ্যগুলো কতটা নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয়?

বিএসটিআই
উপর থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে: মোঃ কামরুজ্জামান, উপপরিচালক (মেট্রোলজি) ও অফিস প্রধান, রাজীব দাশ গুপ্ত, সহকারী পরিচালক (সিএম), সজীব চৌধুরী, পরিদর্শক (মেট্রোলজি), নাঈর আউসাফ রহমান, ফিল্ড অফিসার (সিএম), মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা, পরীক্ষক (রসায়ন), এস, এম, রুহুল ইসলাম, পরিদর্শক (মেট্রোলজি), মোঃ আরাফাতুল আলম, পরীক্ষক (পদার্থ)।

অভিযানে যখন অনিয়ম মিলছে

বিএসটিআইয়ের কক্সবাজার কার্যালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খাদ্য ও পানীয় খাতের বিভিন্ন পণ্যের লাইসেন্স, নিবন্ধন ও মান নিয়ে মাঠপর্যায়ে তদারকি প্রয়োজন হচ্ছে।

কক্সবাজারের কলাতলী ও হোটেল-মোটেল জোনে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পণ্যের বৈধ সিএম লাইসেন্স/সনদ যাচাই করা হয়েছে। অন্যদিকে চকরিয়া-পেকুয়া এলাকায় প্যাকেটজাত পানি ও বেকারি পণ্যের ক্ষেত্রেও লাইসেন্স ও নিবন্ধনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার ঘটনা রয়েছে।

উখিয়ায় বিএসটিআইয়ের অভিযানে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও পরিমাপের ঘাটতি ধরা পড়ে। অর্থাৎ শুধু খাবারের গুণগত মান নয়, পণ্য ও সেবার পরিমাপ-সংক্রান্ত বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন হচ্ছে।

২০২৬ সালের অভিযানে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে

সময় এলাকা যে বিষয় সামনে এসেছে
১৬ মার্চ কক্সবাজার সদর, কলাতলী–সি-ইন এলাকা ১০টি প্রতিষ্ঠানে খাদ্যপণ্যের সিএম লাইসেন্স/সনদ যাচাই
২৫ মার্চ কক্সবাজার সদর প্যাকেটজাত পানীয় অতিরিক্ত দামে বিক্রির ঘটনায় জরিমানা
৩০ মার্চ চকরিয়া–পেকুয়া প্যাকেটজাত পানি ও বেকারি পণ্যের লাইসেন্স/নিবন্ধন নিয়ে নির্দেশনা
১ এপ্রিল উখিয়া ফিলিং স্টেশনে ১০ লিটারে প্রায় ১৫০–১৭০ মিলিলিটার পর্যন্ত কম দেওয়ার ঘটনা; একাধিক মামলায় জরিমানা

বিএসটিআইয়ের নিজস্ব ওয়েব কাঠামোতেও মোবাইল কোর্ট ও সার্ভিলেন্সকে সংস্থার নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়টি বিএসটিআইয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত।

এখানেই অনুসন্ধানের জায়গা।

বড় হোটেলগুলো সাধারণত শুধু রান্না করা খাবার পরিবেশন করে না। তাদের রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, বেকারি, ডেজার্ট কর্নার, জুস বার ও বাফেতে বিভিন্ন ধরনের দুধজাত, বেকারি, পানীয় ও প্যাকেটজাত পণ্য থাকে।

কক্সবাজারের কয়েকটি বড় হোটেলের নিজেদের প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করলেও বিষয়টি স্পষ্ট।

কোন হোটেলে কোন পণ্য আগে পরীক্ষা করা যেতে পারে?

হোটেল প্রকাশিত মেনু/সার্ভিসে পাওয়া পণ্য অগ্রাধিকার দিয়ে যা পরীক্ষা করা যেতে পারে
Ocean Paradise Hotel & Resort মিষ্টি দই, জুস, সালাদ, কোমল পানীয় মিষ্টি দই, জুস, পানীয়, সালাদ ড্রেসিং
Sayeman Beach Resort আইসক্রিম, ফ্রেশ জুস, সফট ড্রিংক, স্ন্যাকস, কেক-পেস্ট্রি আইসক্রিম, কেক, পেস্ট্রি, জুস, পানীয়
Hotel The Cox Today ডেজার্ট, জুস, সফট ড্রিংক, পেস্ট্রি, স্যান্ডউইচ, আইসক্রিম পেস্ট্রি, আইসক্রিম, ডেজার্ট, জুস
Best Western Heritage কেক, চিজকেক, আইসক্রিম, কাস্টার্ড, ক্রিম ক্যারামেল, দইজাত পণ্য দই, আইসক্রিম, কেক, কাস্টার্ড/ডেজার্ট
Seagull Hotels Ltd. পেস্ট্রি, স্ন্যাকস, BBQ, রাইতা, বোতলজাত পানি পেস্ট্রি, রাইতা, বোতলজাত পানি
Long Beach Hotel Cox’s Bazar রেস্টুরেন্ট ও খাদ্যসেবা বাফে, দুধজাত পণ্য, বেকারি ও পানীয়—মেনু মিলিয়ে নমুনা সংগ্রহ
Hotel Sea Palace Ltd. হোটেল রেস্টুরেন্ট/খাদ্যসেবা বাফে, দই-মিষ্টি, বেকারি ও পানীয়—মেনু মিলিয়ে নমুনা সংগ্রহ

সায়মান বিচ রিসোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাদের Surf Side Café-তে আইসক্রিম, তাজা জুস, সফট ড্রিংক, স্ন্যাকস এবং নিজেদের বেকারিতে তৈরি কেক-পেস্ট্রির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

হোটেল দ্য কক্স টুডের প্রকাশিত তথ্যেও EDGE Restaurant-এ জুস, সফট ড্রিংক ও ডেজার্ট এবং Cafe-71-এ বিভিন্ন পেস্ট্রি, স্যান্ডউইচ ও আইসক্রিম থাকার কথা বলা হয়েছে। তাদের Juice Bar-এ ১০০ শতাংশ জুস, চিনি ও প্রিজারভেটিভ ছাড়া পরিবেশনের দাবিও রয়েছে।

অর্থাৎ এসব পণ্য পরীক্ষা করার প্রস্তাব কোনো অনুমান নয়; হোটেলগুলোর প্রকাশিত খাদ্যতালিকা ও সেবার তথ্যের সঙ্গে মিল রেখেই নমুনা নির্বাচন করা সম্ভব।

এই অনুসন্ধানে মিষ্টি দইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

কারণ এটি এমন একটি খাবার, যা হোটেলের বাফে, ডেজার্ট বা রেস্টুরেন্ট মেনুতে থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে দুধজাত পণ্য হিসেবে এর গুণগত মান পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে Ocean Paradise Hotel & Resort-এর প্রকাশিত অনলাইন মেনুতে Sweet Yogurt বা মিষ্টি দই থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

তাই এই হোটেলে মিষ্টি দইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার প্রশ্নটি একেবারেই যৌক্তিক।

একইভাবে অন্য হোটেলগুলোতেও দই, রাইতা, লাচ্ছি, আইসক্রিম ও অন্যান্য দুধজাত পণ্য থাকলে সেগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা যেতে পারে।

হোটেলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্যগুলোর একটি হচ্ছে পানি।

বোতলজাত পানি, জুস, সফট ড্রিংক, লাচ্ছি— এসব পণ্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে পরিবেশন করা হয়।

তাই তদন্তে শুধু বোতলের পানি পরীক্ষা করলেই হবে না। দেখতে হবে—

পানি কোথা থেকে আসে?

হোটেল নিজস্ব বোতলে পানি দেয় কি না?

দিলে সেই পানির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন/নিবন্ধন আছে কি না?

বোতলের লেবেলে উৎপাদনকারী ও মেয়াদ সঠিক আছে কি না?

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সিএম লাইসেন্স বৈধ কি না?

বড় হোটেলের বাফে ও ক্যাফেতে কেক, পেস্ট্রি, ব্রেড, বান, বিস্কুট ও বিভিন্ন ডেজার্ট থাকে।

সায়মানের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বেকারিতে কেক-পেস্ট্রি তৈরির কথা সরাসরি ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে—

নিজস্ব বেকারি থাকলে সেই উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য কী কী অনুমোদন প্রয়োজন?

ব্যবহৃত ময়দা, বাটার, মার্জারিন, দুধ, ক্রিম ও অন্যান্য কাঁচামালের উৎস কী?

কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে কিনা?

উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের তাপমাত্রা ও মেয়াদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জানা দরকার।

বিএসটিআইয়ের কাজ শুধু বাজারে গিয়ে জরিমানা করা নয়। সংস্থাটির কাঠামোতেই পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন এবং বাধ্যতামূলক পণ্যের তদারকির ব্যবস্থা রয়েছে।

তাই বড় প্রশ্ন হচ্ছে—

কক্সবাজারের বড় হোটেলগুলোর নিজস্ব উৎপাদিত বা পরিবেশিত খাদ্যপণ্যের ওপর বিএসটিআই কতটা নিয়মিত নজরদারি করে?

কোন হোটেলে কবে অভিযান হয়েছে?

কোন কোন পণ্যের নমুনা নেওয়া হয়েছে?

কতগুলো পণ্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে?

কতগুলো পণ্য মানসম্মত পাওয়া গেছে?

কোন হোটেলের নিজস্ব উৎপাদন ইউনিটের বৈধ লাইসেন্স আছে?

কোন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে হোটেলগুলো দই, মিষ্টি, পানি, বেকারি পণ্য বা অন্যান্য খাদ্য কিনছে?

হোটেলে একটি পণ্য পাওয়া গেলেই সেটি হোটেলের নিজস্ব উৎপাদিত— এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না।

তাই অনুসন্ধানে প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর আলাদা করতে হবে—

ধাপ যা যাচাই করতে হবে
হোটেলে পণ্যটি সত্যিই পরিবেশন করা হচ্ছে কি না
পণ্যটি হোটেল নিজে তৈরি করছে নাকি বাইরে থেকে কিনছে
উৎপাদনকারী/সরবরাহকারীর BSTI লাইসেন্স, মেয়াদ ও পণ্যের অনুমোদন

এরপর সন্দেহজনক হলে নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করাই হবে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ।

অভিযোগ নয়, পরীক্ষাই শেষ কথা

কক্সবাজারের কোনো বড় হোটেলের নাম এসেছে বলেই সেই হোটেল মানহীন খাবার পরিবেশন করছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বরং এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য  একটি সরল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—

“যে খাবারের জন্য একজন পর্যটক বড় অঙ্কের টাকা দিচ্ছেন, সেটি আসলে কতটা মানসম্মত?”

বিএসটিআইয়ের অভিযান যদি বাজারের ছোট দোকানে লাইসেন্সবিহীন বা অনিয়মিত পণ্য খুঁজে পায়, তাহলে পর্যটননির্ভর বড় হোটেলগুলোর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার আওতায় আছে কিনা— সেটি জানা জরুরি।

বিশেষ করে মিষ্টি দই, টক দই, লাচ্ছি, আইসক্রিম, কেক, পেস্ট্রি, ব্রেড, জুস, বোতলজাত পানি, মসলা, ঘি, বাটার, মেয়োনিজ ও অন্যান্য প্রস্তুত খাদ্য— এসব পণ্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ও মান যাচাই করা গেলে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে খাদ্য নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

কারণ পাঁচ তারকা হোটেলের বিল যতই বড় হোক, খাবারের মান নিয়ে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।