
যশোরে ইন্সপেক্টরদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, তদারকিতে উপপরিচালক পারভীন আখতার।
নিজস্ব অনুসন্ধান | FollowUpNews
যশোরে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। বড় বড় চালানও ধরা পড়ছে। কিন্তু অভিযানের পরও যদি মাদকের সরবরাহ বন্ধ না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে— মাদক নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, নাকি শুধু মাদক উদ্ধার হচ্ছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই রাতে যশোরের হামিদপুর এলাকায় একটি প্রাইভেটকারের গোপন চেম্বার থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। অভিযানে দুইজনকে আটক করা হয়। ডিএনসির উপপরিদর্শক মদন মোহন সাহা অভিযানের তথ্য জানান এবং তার করা মামলার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ৩০ আগস্ট যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় পুলিশ ২৭ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে একজনকে আটক করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালিত হয় এবং চালানের উৎস ও গন্তব্য শনাক্তে তদন্ত চলছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে—
একই জেলায় এত বড় বড় চালান আসছে কোথা থেকে?
কারা সরবরাহ করছে?
কোন রুট ব্যবহার হচ্ছে?
মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে এসব রুট ও কারবারিদের বিষয়ে কতটা গোয়েন্দা তথ্য থাকে?

সরকারি তালিকায় কারা আছেন?
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, যশোরের সরকারি ওয়েবসাইটের কর্মকর্তাদের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে জেলা কার্যালয়ে তিনজন কর্মকর্তা প্রকাশ্যে তালিকাভুক্ত আছেন। তারা হলেন—উপপরিচালক পারভীন আখতার এবং পরিদর্শক নাজমুল হোসেন খান ও মাহাবুবা জেসমিন রুমা।
বর্তমান কর্মকর্তাদের তালিকা
| নাম | পদবি | সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত যোগাযোগ/পরিচয় |
|---|---|---|
| পারভীন আখতার | উপপরিচালক | জেলা কার্যালয়ের প্রধান; সরকারি তালিকায় উপপরিচালক |
| নাজমুল হোসেন খান | পরিদর্শক | যশোর জেলা কার্যালয় |
| মাহাবুবা জেসমিন রুমা | পরিদর্শক | যশোর জেলা কার্যালয় |
সরকারি সিটিজেন চার্টারেও পারভীন আখতারকে উপপরিচালক এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তালিকায় নাজমুল হোসেন খান বা মাহাবুবা জেসমিন রুমা বর্তমানে যথাক্রমে ক এবং খ সার্কেলের দায়িত্বে আছেন।
প্রকাশিত অভিযানের কয়েকটি তথ্য
| তারিখ | স্থান | উদ্ধার | সংশ্লিষ্ট DNC কর্মকর্তা |
|---|---|---|---|
| ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | যশোর | ১০,০০০ পিস ইয়াবা | নাজমুল হোসেন খান—প্রতিবেদন অনুযায়ী |
| ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | রাজাপুর, যশোর-মাগুরা মহাসড়ক | ৪২ বোতল বিদেশি মদ | নাজমুল হোসেন খান—প্রতিবেদন অনুযায়ী |
| ৯ মার্চ ২০২৬ | যশোর | ২,২৭০ পিস ট্যাপেন্টাডল | রাফিজা খাতুন—প্রতিবেদন অনুযায়ী |
| ২ মে ২০২৬ | মনোহরপুর ও শংকরপুর | ৬,২০০ পিস ট্যাপেন্টাডল | মদন মোহন সাহা—প্রতিবেদন অনুযায়ী |
| ৪ জুলাই ২০২৬ | হামিদপুর | ৩০,০০০ পিস ইয়াবা | মদন মোহন সাহা |
| ৬ জুলাই ২০২৬ | যশোর | ট্যাপেন্টাডল ও রেক্টিফায়েড স্পিরিট | DNC টিম |
| ৫ আগস্ট ২০২৬ | শার্শা | ৬,০০০ পিস ইয়াবা | রাফিজা খাতুন—প্রতিবেদন অনুযায়ী |
| ২২ আগস্ট ২০২৬ | রাজাপুর/বারান্দীপাড়া | ১৯ কেজি গাঁজা | DNC কর্মকর্তাদের নামে প্রতিবেদন |
| ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ঝুমঝুমপুর | ২৭,০০০ পিস ইয়াবা | পুলিশের অভিযান |
৩০ হাজার পিস ইয়াবার ঘটনায় মদন মোহন সাহার নাম সরাসরি অভিযানের সঙ্গে যুক্ত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ২৭ হাজার পিস ইয়াবার ঘটনাটি ছিল পুলিশের অভিযান; তাই সেটিকে DNC-এর অভিযান হিসেবে দেখানো যাবে না।
ইন্সপেক্টরদের কাছে FollowUpNews-এর প্রশ্ন
একজন ইন্সপেক্টরের সাফল্য শুধু কতটি মামলা করেছেন বা কত পিস মাদক উদ্ধার করেছেন— এ দিয়ে বিচার করলে মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।
বরং জানতে হবে—
দায়িত্বাধীন এলাকায় মাদক স্পট কয়টি?
চিহ্নিত মাদক কারবারি কয়জন?
তাদের মধ্যে কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে?
গ্রেপ্তারের পর কতজন আবার একই অপরাধে জড়িয়েছে?
বড় চালানের কতটি উৎস শনাক্ত হয়েছে?
কতটি ঘটনায় মূল হোতা ধরা পড়েছে?
মাদকের অর্থের উৎস বা লেনদেনের বিষয়ে কতটি তদন্ত হয়েছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
একই এলাকায় নিয়মিত মাদক পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার গোয়েন্দা কার্যক্রম কতটা কার্যকর?
৩০ হাজার ইয়াবা: বাহক ধরা পড়লেই কি অভিযান সফল?
হামিদপুরের অভিযানে প্রাইভেটকারের ড্যাশবোর্ড ও রানিং বোর্ডে তৈরি গোপন চেম্বার থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়। দুইজনকে আটক করা হয় এবং গাড়ি ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত অনুসন্ধানের জায়গা আরও গভীরে।
চালানটি কোথা থেকে এসেছে?
কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল?
এর আগে একই রুট ব্যবহার করা হয়েছে কিনা?
আটক ব্যক্তির মোবাইল ফোনের তথ্য কী বলছে?
অর্থের লেনদেন কোথায়?
মূল সরবরাহকারী শনাক্ত হয়েছে কি?
বাহক আটক আর মাদক সিন্ডিকেট ধ্বংস— দুটি এক জিনিস নয়।
উপপরিচালক পারভীন আখতারের তদারকির প্রশ্ন

পারভীন আখতারকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো দুর্নীতি বা মাদক কারবারির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে অভিযুক্ত করার মতো যাচাই করা প্রমাণ FollowUpNews-এর হাতে নেই।
কিন্তু তিনি জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক। সরকারি সিটিজেন চার্টারেও তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে।
তাই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়— প্রাতিষ্ঠানিক।
জেলায় বড় বড় মাদকের চালান ধরা পড়ছে।
একাধিক সার্কেল ও মাঠকর্মী কাজ করছেন।
তাহলে জেলা পর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থায় কী ধরনের পর্যালোচনা হচ্ছে?
কোন এলাকায় মাদক বেড়েছে?
কোন ইন্সপেক্টরের এলাকায় বারবার মাদক পাওয়া যাচ্ছে?
কোন কর্মকর্তা বেশি বড় চালান ধরছেন?
কোথায় শুধু খুচরা মাদকসেবী বা বাহক ধরা পড়ছে?
আর কোথায় মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে?
এই তথ্যগুলো প্রকাশ করা হলে ডিএনসির কর্মদক্ষতার প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।
যশোর DNC-এর বর্তমান কর্মচারী তালিকা
সরকারি ওয়েবসাইটে যশোর জেলা কার্যালয়ের কর্মচারী প্রোফাইলে মোট ২৬টি এন্ট্রি দেখানো হয়েছে। অফিসার হিসেবে আছেনঃ
| নাম | পদবি |
|---|---|
| মো. এস.এম জাহিদুল ইসলাম | হিসাবরক্ষক |
| ব্রজেন্দ্র নাথ গাইন | উপ-পরিদর্শক |
| মোছাঃ রাফিজা খাতুন | উপ-পরিদর্শক |
| মদন মোহন সাহা | উপ-পরিদর্শক |
| শাহরিয়ার হোসেন | উপপরিদর্শক |
| মোঃ হাফিজুর রহমান | সহকারী উপ-পরিদর্শক |
| দিন্দার | সহকারী উপ-পরিদর্শক |
| মোঃ মন্জুরুল বাসার | সহকারী উপ-পরিদর্শক |
| মোঃ আব্দুর রশিদ | সহকারী উপপরিদর্শক |
| কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন | অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর |
মাঠ পর্যায়ের নারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান
যশোর DNC-এর কর্মচারী তালিকায় রাফিজা খাতুন উপপরিদর্শক হিসেবে রয়েছেন এবং সরকারি তালিকায় তার পদটি নিশ্চিত করা যায়।
তার নামে সাম্প্রতিক বিভিন্ন মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে মাহাবুবা জেসমিন রুমা সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় পরিদর্শক হিসেবে আছেন।
কোনো নারী কর্মকর্তা বা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রচারিত অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়া সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং অভিযোগ ঘিরে তদন্ত হওয়া দরকার—
- অভিযোগকারীর পরিচয় ও বক্তব্য;
- লিখিত অভিযোগ;
- বিভাগীয় তদন্তের নথি;
- মামলা/জিডি;
- আদালতের নথি;
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য;
- এবং কর্তৃপক্ষের লিখিত জবাব।
এসব ছাড়া কাউকে “বিতর্কিত” বা “যোগসাজশে জড়িত” হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না।

প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত একটাই
যশোরে অভিযান হচ্ছে।
মাদক উদ্ধার হচ্ছে।
বড় চালানও ধরা পড়ছে।
কিন্তু একই সময়ে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্কও সক্রিয় থাকছে।
তাই FollowUpNews-এর প্রশ্ন—
মাদক ধরা পড়ছে, কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কি?
আর যদি নিয়ন্ত্রণ না হয়, তাহলে শুধু মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে জেলা পর্যায়ের তদারকি— পুরো ব্যবস্থাকেই জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরী বলে মনে করে যশোরের নাগরিক সমাজ।
