এটি কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী ছিলো না, বরং এটি ছিলো আধ্যাত্মিকতার মোড়কে আবৃত এক অত্যাধুনিক অপরাধী সংগঠন। এই ধ্বংসাত্মক যাত্রার কেন্দ্রে ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বিকৃত মানসিকতা জাপানকে এক চরম বিনাশের দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। সেই ব্যক্তির নাম শোকো আসাহারা। ১৯৫৫ সালে জাপানের এক দরিদ্র পরিবারে চিজুও মাৎসুমোতো নামে তার জন্ম। জন্ম থেকেই তিনি এক চোখে সম্পূর্ণ অন্ধ এবং অন্য চোখে আংশিক দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। সাধারণ এক ভেষজ ওষুধ বিক্রেতা এবং যোগব্যায়াম শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করলেও, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজেকে ‘শোকো আসাহারা’ হিসেবে পুনর্গঠিত করেন এবং ঘোষণা করেন যে তিনি হিমালয়ের গুহায় কঠোর তপস্যার মাধ্যমে পরম জ্ঞান লাভ করেছেন।

আসাহারা এমন এক সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন যা জাপানের তরুণ ও শিক্ষিত সমাজকে খুব দ্রুত আকৃষ্ট করতে শুরু করে। ১৯৮৪ সালে যখন তিনি ‘ওম শিনরিকিও’ বা ‘ওম সুপ্রিম ট্রুথ’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার প্রচারিত দর্শনে ছিলো হিন্দুধর্মের শিবের উপাসনা, বৌদ্ধধর্মের ধ্যান এবং খ্রিস্টধর্মের মহাপ্রলয়ের অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ। তিনি নিজেকে যিশু খ্রিস্টের পরবর্তী অবতার এবং জাপানের একমাত্র প্রকৃত আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে দাবি করতে থাকেন। তবে তার এই সংগঠনের সবথেকে বিস্ময়কর দিকটি ছিলো এর সদস্য তালিকা। ওম শিনরিকিও সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের ভিড় ছিলো না; এটি ছিলো জাপানের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ। আসাহারা সুকৌশলে জাপানের যান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ক্লান্ত এই উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের মনে এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন।
১৯৯০ সাল নাগাদ আসাহারার উন্মাদনা এক নতুন মাত্রা পায়। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২৪ জন অনুসারীকে নিয়ে ‘শিনরি পার্টি’ গঠন করে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু জাপানের সাধারণ মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তার দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই প্রত্যাখ্যানই ছিলো ওম শিনরিকিও-র মরণকামড় দেওয়ার শুরুর বিন্দু। আসাহারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে এই কলুষিত পৃথিবীকে ভোটের মাধ্যমে নয়, বরং রক্তের মাধ্যমে ‘শুদ্ধ’ করতে হবে। তিনি তার অনুসারীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে খুব শীঘ্রই একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে এবং কেবল তারাই সেই মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা পাবে। এখান থেকেই শুরু হয় ‘পোয়া’ (Poa) নামক সেই ভয়ঙ্কর ধর্মীয় বিধানের অপব্যবহার। আসাহারার বিকৃত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ওম শিনরিকিও-র আদর্শের পরিপন্থী হয় বা পাপের পথে চলে, তবে তাকে হত্যা করার অর্থ হলো তাকে নরকবাস থেকে বাঁচিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ, খুন করাকে তারা এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করতে শুরু করল।
মাউন্ট ফুজির পাদদেশে নির্জন কামিকুইশিকি গ্রামে ওম শিনরিকিও গড়ে তুলেছিলো তাদের বিশাল এক গোপন সাম্রাজ্য। সেখানে ‘সাত্যান-৭’ (Satyan-7) নামক এক অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি তৈরি করা হয়েছিলো যার নির্মাণ খরচ ছিল প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাইরে থেকে এটিকে একটি সাধারণ ধর্মীয় উপাসনালয় মনে হলেও, এর ভেতরে দিনরাত কাজ করতেন জাপানের প্রথম সারির জৈব-রসায়নবিদরা। আসাহারার নির্দেশে তারা সেখানে সিন্থেটিক সারিন গ্যাস, ভিএক্স (VX) নার্ভ এজেন্ট এবং অ্যানথ্রাক্সের মতো মারণাস্ত্র তৈরির গবেষণা চালাচ্ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিলো কেবল ধর্ম প্রচার নয়, বরং একটি সমান্তরাল সরকার গঠন করা। এই উদ্দেশ্যে আসাহারা তার দলের মধ্যে ‘মন্ত্রিসভা’ তৈরি করেছিলেন, যেখানে বিজ্ঞান থেকে শুরু করে গোয়েন্দা বিভাগ—সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা প্রধান নিয়োগ করা হয়েছিলো।
এই মারণ-উন্মাদনার প্রথম বড় শিকার হয়েছিলেন টোকিও-র আইনজীবী সুত্সুমি সাকামোতো। ১৯৮৯ সালে সাকামোতো যখন ওম শিনরিকিও-র বিরুদ্ধে একটি গণমামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আসাহারার নির্দেশে এক রাতে সাকামোতো, তার স্ত্রী এবং তাদের এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকে অপহরণ করে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। তাদের দেহগুলো ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ড্রামে ভরে জাপানের বিভিন্ন পার্বত্য এলাকায় পুঁতে দেওয়া হয়েছিলো। প্রায় ছয় বছর ধরে পুলিশ এই নিখোঁজ রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে আসাহারার সংগঠন ততদিনে একটি প্রশিক্ষিত ঘাতক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
১৯৯৪ সাল নাগাদ এই গোষ্ঠীর অস্ত্রভাণ্ডার কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে ৫ লক্ষ একরের একটি বিশাল খামার (Banjawarn Station) ক্রয় করে সেখানে ইউরেনিয়াম খনির সন্ধান শুরু করে এবং সারিন গ্যাসের পরীক্ষা চালায়। জাপানের ভেতরেও তারা ‘টেস্ট রান’ হিসেবে ১৯৯৪ সালের জুন মাসে মাৎসুমোতো শহরে রাতের অন্ধকারে একটি রেফ্রিজারেটর ট্রাক থেকে সারিন গ্যাস ছড়িয়ে দেয়। সেই ঘটনায় ৮ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৫০০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ একে সার কারখানার দূষণ বা ব্যক্তিগত শত্রুর কাজ বলে মনে করলেও, পর্দার আড়ালে আসাহারা তখন তার চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি জানতেন পুলিশ খুব শীঘ্রই তাদের সদর দপ্তরে হানা দিতে পারে, আর তাই নজর ঘোরানোর জন্য তিনি বেছে নিলেন জাপানের হৃদপিণ্ড—টোকিও সাবওয়ে। আসাহারার সেই বিকৃত মস্তিস্কের লক্ষ্য ছিলো এমন এক আতঙ্ক তৈরি করা যা জাপান রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেবে এবং তাকে একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে ঘোষণা করার পথ প্রশস্ত করবে।

১৯৯৫ সালের ২০শে মার্চ, সোমবার। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজার কিছু সময় বাকি। টোকিও-র সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কাছে এটি ছিলো সপ্তাহের আরো একটি ব্যস্ত শুরু। কিন্তু কাসুমিগাসেকি স্টেশনের দিকে ধেয়ে আসা পাঁচটি পাতাল রেল ট্রেনের ভেতরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা ছিল না। ওম শিনরিকিও-র পাঁচজন উচ্চপদস্থ সদস্য—যাদের মধ্যে চিকিৎসক এবং পদার্থবিদও ছিলেন—তাদের হাতে থাকা খবরের কাগজে মোড়ানো প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো ট্রেনের মেঝেতে নামিয়ে রাখেন। প্রতিটি ব্যাগে ছিলো প্রায় ৬০০ মিলিলিটার তরল সারিন। ট্রেনগুলো যখন স্টেশনে থামার উপক্রম করে, তখন তারা ছাতার ধারালো ডগা দিয়ে ব্যাগগুলো ফুটো করে দিয়ে দ্রুত নেমে যান।
শুরু হয় এক অবর্ণনীয় নারকীয় দৃশ্য। সারিন গ্যাস অত্যন্ত উদ্বায়ী হওয়ায় দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে ট্রেনের কামরাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে যাত্রীরা শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করেন, অনেকের চোখ অন্ধকার হয়ে আসে এবং নাক-মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে। টোকিও-র সেই ব্যস্ত পাতাল রেল স্টেশনগুলো নিমেষেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়ছিলেন অনেকে। এই ভয়াবহ হামলায় সরাসরি ১৪ জন প্রাণ হারান এবং ৫,৫০০-এরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। তাদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যান অথবা স্নায়বিক বৈকল্যের শিকার হন। জাপানের মতো সুরক্ষিত এবং সুশৃঙ্খল একটি দেশে এই স্তরের সন্ত্রাসবাদ ছিলো অকল্পনীয়।
এই ঘটনার পর জাপান সরকার আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি। হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মাউন্ট ফুজির পাদদেশে অবস্থিত সংগঠনের প্রধান কার্যালয়ে হানা দেয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় কয়েক টন রাসায়নিক উপাদান, যা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা সম্ভব ছিলো। তল্লাশি অভিযানে উদ্ধার হওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, আসাহারার পরিকল্পনা ছিলো হিরোশিমার ধাঁচে টোকিও-তে আকাশপথ থেকে সারিন গ্যাস ছড়িয়ে দিয়ে এক বিশাল গণহত্যা চালানো। মে মাসে পুলিশ অবশেষে সদর দপ্তরের একটি গোপন কুঠুরি থেকে শোকো আসাহারাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় এই তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরুকে অত্যন্ত ভীত ও বিমর্ষ অবস্থায় পাওয়া যায়, যা তার প্রচারিত ‘অজেয়’ ইমেজের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো।
আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দুর্ভাগ্যজনক তথ্য হলো, আসাহারার এই বিষাক্ত প্রভাব কেবল জাপানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তদন্তে উঠে আসে যে রাশিয়ার পতনের পর সেখানে ওম শিনরিকিও অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিলো। প্রায় ৩০,০০০ রাশিয়ান সদস্য আসাহারার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে এই গোষ্ঠীটি রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম, এমনকি একটি হেলিকপ্টার পর্যন্ত কেনার চেষ্টা করেছিলো। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করা। ওম শিনরিকিও কোনো সাধারণ ধর্মের নামে চলা গোষ্ঠী ছিলো না; এটি ছিলো একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সমৃদ্ধ ‘কাল্ট’, যারা আধুনিক বিজ্ঞানের চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অন্ধকার উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিলো।
আাসাহারার বিচার প্রক্রিয়া ছিলো জাপানের ইতিহাসে দীর্ঘতম। প্রায় ২৩ বছর ধরে চলা এই বিচার পর্বে আসাহারা অধিকাংশ সময় নিশ্চুপ ছিলেন অথবা অসংলগ্ন কথা বলতেন। অবশেষে ২০১৮ সালের ৬ই জুলাই, টোকিও ডিটেইনশন সেন্টারে শোকো আসাহারা এবং তার আরো ১২ জন অনুসারীর মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়। আসাহারার মৃত্যুর সাথে সাথে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তার বিষাক্ত আদর্শ কি পুরোপুরি মুছে গেছে? উত্তরটি কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, ওম শিনরিকিও মৃত নয়, বরং তা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে আজও টিকে আছে। ‘আলেফ’ (Aleph) এবং ‘হিকারি নো ওয়া’ (Hikari no Wa) নামক উত্তরাধিকারী গোষ্ঠীগুলো আজও জাপানে সক্রিয়। জাপানি গোয়েন্দা সংস্থা পিএসআইএ (PSIA)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাপানে এখনো প্রায় ১৬০০-এর বেশি মানুষ এই মতাদর্শের সাথে যুক্ত। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই গোষ্ঠীগুলো সরাসরি প্রচারের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ছদ্মবেশী যোগব্যায়াম ক্লাসের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করছে। যদিও তারা দাবি করে যে তারা আসাহারার সহিংস পথ ত্যাগ করেছে, তবুও জাপানি কর্তৃপক্ষ আজো তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি বজায় রেখেছে। ওম শিনরিকিও-র ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যখন উচ্চশিক্ষিত মেধা অন্ধ বিশ্বাসের সাথে হাত মেলায়, তখন তা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।
