বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই টানাপোড়েনপূর্ণ হোক, সীমান্তের দুই পাশে সাধারণ মানুষের জীবন এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক বন্ধনে জড়িয়ে আছে। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ কিংবা রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়; কিন্তু বাজারের হিসাব অন্য কথা বলে। বাংলাদেশের একজন মুসলমান ভোক্তা যেমন ভারতের একজন হিন্দু কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজ খেয়ে জীবনযাপন সহজ করেন, তেমনি ভারতের বহু মানুষ বাংলাদেশের শ্রম, পণ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবে দুই দেশের কোটি কোটি মানুষ একে অপরের তুলনামূলক সস্তা শ্রমের সুফল ভোগ করছে।

এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ পেঁয়াজ। বাংলাদেশে যখন পেঁয়াজের সংকট তৈরি হয়, তখন দ্রুত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। প্রশ্ন হলো, এত কম দামে ভারত কীভাবে বাংলাদেশে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারে? শুধু উর্বর জমি বা ভালো আবহাওয়া নয়, এর পেছনে বড় কারণ হলো কৃষি খাতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের উপস্থিতি এবং তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়। চাষাবাদ, ফসল সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ ও পরিবহন—প্রতিটি ধাপে শ্রমের খরচ যদি কম হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামও কমে আসে।
একই চিত্র কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বাংলাদেশে যখন বাজারে কাঁচা মরিচের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছে যায়, তখন ভারত থেকে মরিচ আমদানি শুরু হয়। অবাক করার বিষয় হলো, সেই মরিচ উৎপাদন, ক্ষেত থেকে সংগ্রহ, প্যাকেটজাতকরণ, ট্রাকে করে সীমান্তে আনা, শুল্ক ও পরিবহন ব্যয় যোগ হওয়ার পরও অনেক সময় স্থানীয় বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে শ্রমের খরচ এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ও পুষিয়ে দিতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি একটি কৃষিপণ্য শত শত কিলোমিটার দূর থেকে সীমান্ত পার হয়ে এসে স্থানীয় বাজারের চেয়েও কম দামে বিক্রি হতে পারে, তাহলে উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাশ্রয় কোথায়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তরটি হলো— শ্রমের মূল্য। কৃষকের পাশাপাশি ক্ষেতমজুর, পরিবহন শ্রমিক, গুদামকর্মী, প্যাকেজিং শ্রমিক —সবার শ্রমের সম্মিলিত মূল্য যত কম, উৎপাদন ব্যয়ও তত কম থাকে।
এটি শুধু ভারতের ক্ষেত্রে নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও একই অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ বাংলাদেশের কারখানার শ্রমিকদের তুলনামূলক কম মজুরির কারণে অপেক্ষাকৃত কম দামে পোশাক কিনতে পারেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশের শ্রম বিশ্ববাজারকে সস্তা পোশাক দিচ্ছে, আবার বাংলাদেশ ভারতীয় কৃষকের সস্তা উৎপাদনের সুফল পাচ্ছে। এক অর্থে দুই দেশই একে অপরের শ্রম থেকে উপকৃত হচ্ছে।
তাহলে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির আড়ালে অর্থনীতির বাস্তবতা কী বলছে?
বাস্তবতা হলো, একজন ভারতীয় হিন্দু কৃষক যখন কম দামে পেঁয়াজ উৎপাদন করেন, তখন তার সেই শ্রমের সুফল ভোগ করেন বাংলাদেশের মুসলমান ভোক্তা। আবার বাংলাদেশের মুসলমান শ্রমিক যখন কম মজুরিতে পোশাক তৈরি করেন, তখন সেই পোশাক ভারতের বাজারেও পৌঁছে যায়, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান —সব ধর্মের মানুষ তা ব্যবহার করেন। অর্থনীতি মানুষের ধর্ম দেখে না; সে দেখে উৎপাদন, দক্ষতা, ব্যয় ও বাজার।
এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়। সীমান্তের দুই পাশে সাধারণ মানুষ পরস্পরের শত্রু নন; বরং তারা একই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের অংশ। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক উসকানি যতই বাড়ুক, প্রতিদিনের বাজারে একজনের শ্রম অন্যজনের জীবনের ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা হয়তো তা অনুভব করি না, কিন্তু প্রতিটি আমদানিকৃত কৃষিপণ্য, প্রতিটি রপ্তানিকৃত পোশাক, প্রতিটি সীমান্ত বাণিজ্য —এই আন্তঃনির্ভরতারই প্রমাণ।
তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। যদি কোনো দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে, তাহলে শ্রমিকের আয় বাড়ে না, জীবনমানের উন্নয়ন ধীর হয়ে যায় এবং উৎপাদনশীলতার পরিবর্তে কম মজুরিই প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফলে উভয় দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সস্তা শ্রম নয়, দক্ষ শ্রম, উন্নত প্রযুক্তি, কৃষির আধুনিকীকরণ এবং উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— যে মানুষটির ঘামে আপনার রান্নাঘরের পেঁয়াজ, মরিচ বা পোশাকের দাম কমে, তিনি কোন ধর্মের, তা কি বাজার জানে? বাজারের উত্তর স্পষ্ট: না। বাজার শুধু জানে, সীমান্তের দুই পাশে কোটি কোটি মানুষের শ্রম একে অপরের জীবনকে সাশ্রয়ী করে তুলছে। হয়তো এ কারণেই বলা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পরস্পরের ধর্মে নয়, বরং পরস্পরের শ্রমে বেঁচে আছে।
