
চুকনগরে মানুষ জড়ো হয়েছিলো বাঁচার জন্য। ভারতের দিকে পালিয়ে যাওয়ার আশায় হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু একত্র হয়েছিল। কিন্তু আশ্রয়ের পথ পরিণত হয়েছিলো মৃত্যুর উপত্যকায়। গুলির শব্দে আকাশ ভারী হয়েছিলো, ভদ্রা নদীর জল মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো—এমন স্মৃতি আজও ইতিহাসের বুক থেকে মুছে যায়নি।
আর তার পরদিনই ডাকরা। আবারও পালাতে থাকা মানুষ। আবারও আতঙ্কে দিশেহারা পরিবার। আবারও ধর্মীয় পরিচয় অনেকের জন্য হয়ে উঠেছিলো মৃত্যুদণ্ডের কারণ। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় সংঘটিত সেই হত্যাযজ্ঞ শুধু কিছু মানুষকে হত্যা করেনি; হত্যা করেছিলো নিরাপত্তার অনুভূতি, প্রতিবেশী সম্পর্কের বিশ্বাস, মানুষের মানুষের প্রতি আস্থার একটি অংশকেও।
প্রশ্ন জাগে—দুই দিনে, মাত্র ৫০ কিলোমিটারের ব্যবধানে কেন এমন দুটি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ঘটলো? ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি নির্মম সত্য সামনে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বহু হিন্দু পরিবার বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলো। তারা শুধু যুদ্ধের শিকার হয়নি; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতন, উচ্ছেদ ও হত্যার মুখোমুখি হয়েছিলো।
এ কথা বলা ইতিহাসকে বিকৃত করা নয়; আবার এটাও সত্য নয় যে পুরো কোনো জনগোষ্ঠী বা বর্তমান প্রজন্মের ওপর দায় চাপানো যায়। অপরাধীদের নাম অপরাধীর নামেই উচ্চারণ করতে হবে— পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও সংশ্লিষ্ট অপরাধী চক্র।
চুকনগর এবং ডাকরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ১৯৭১ শুধু স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; এটি অসংখ্য ব্যক্তিগত শোকের ইতিহাসও। এমন সব মায়ের ইতিহাস, যারা সন্তানের অপেক্ষায় দরজা খোলা রেখেছিলেন। এমন সব শিশুর ইতিহাস, যারা আর বাড়ি ফিরেনি। এমন সব পরিবারের ইতিহাস, যাদের নাম হয়তো কোনো স্মৃতিফলকে লেখা হয়নি।
যখন আমরা স্বাধীনতার ইতিহাস বলি, তখন শুধু বিজয়ের পতাকা নয়, রক্তমাখা পথগুলোকেও মনে রাখতে হয়। কারণ ভুলে যাওয়া ইতিহাস কখনো কখনো দ্বিতীয়বার মানুষকে হত্যা করে।
চুকনগর ও ডাকরা আজ নীরবে প্রশ্ন তোলে— আমরা কি শুধু সংখ্যা মনে রাখবো, নাকি মানুষের আর্তনাদও মনে রাখবো?
