ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে গিয়ে যদি মনে হয় আপনি দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা স্থাপনায় ঢোকার চেষ্টা করছেন, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়ের বিষয়। রাজধানীর পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশের অভিজ্ঞতা অনেক দর্শনার্থী, সাংবাদিক ও সেবাপ্রত্যাশীর কাছে ঠিক এমনই।
ওয়াসা ভবনে ঢুকতে হয় একাধিক স্তরের নিরাপত্তা পেরিয়ে। পরিচয়পত্র যাচাই, প্রবেশ নিবন্ধন, নিরাপত্তা সদস্যদের প্রশ্ন, কোথায় যাবেন, কেন যাবেন— সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ, যা একটি সাধারণ সরকারি দপ্তরের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। ভবনের বিভিন্ন তলায়ও নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, কোনো কক্ষের নেমপ্লেটের ছবি তুলতে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন এসে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এত কঠোর নিরাপত্তার উদ্দেশ্য কী? কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাকি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে জনদৃষ্টি থেকে আড়াল করা?
আরও বড় প্রশ্ন হলো— যেখানে প্রবেশ এত কঠিন, সেখানে জবাবদিহিতা কতটা সহজ?
বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ে ঢাকা ওয়াসাকে ঘিরে নানা ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন, পানি সরবরাহের মান এবং সেবা নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা, গণমাধ্যম এবং উন্নয়ন অংশীদারদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ, জনসাধারণের অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যখন দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা থাকে— প্রতিষ্ঠানটি হবে আরও উন্মুক্ত, আরও স্বচ্ছ এবং গণমাধ্যমবান্ধব।
কিন্তু বাস্তব চিত্র কি তার উল্টো?
ওয়াসা ভবনে নিয়মিত যাতায়াতকারী একাধিক ব্যক্তির দাবি, বিভিন্ন তলায় এমন কিছু ব্যক্তি অবস্থান করেন, যাদের মূল কাজ সাংবাদিক বা আগন্তুকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। তবে এরা ঠিক কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মী, নাকি নিরাপত্তা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্য— তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।
এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, এই কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সূচনা সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খানের সময়ে হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়েও সেই সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। যদিও এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপত্তা কখনোই স্বচ্ছতার বিকল্প হতে পারে না। সাংবাদিকের ক্যামেরা যদি প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে ওঠে, অথচ দুর্নীতির অভিযোগ বছরের পর বছর উত্তরহীন থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে আসলে কাকে রক্ষা করা হচ্ছে? ভবনকে, নাকি ভবনের ভেতরের সংস্কৃতিকে?
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন প্রকাশ করে, প্রকল্প ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরে, সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় দ্রুত তথ্য সরবরাহ করে। কারণ তারা জানে, জনআস্থা অর্জনের একমাত্র পথ স্বচ্ছতা।
বাংলাদেশেও তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ কার্যকর রয়েছে। আইনটি নাগরিককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় যদি একটি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহই সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটি শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, সুশাসনের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
ঢাকা ওয়াসা কোটি কোটি মানুষের করের অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্রকল্প, প্রতিটি ব্যয়, প্রতিটি নিয়োগ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত। নিরাপত্তা প্রয়োজন, কিন্তু নিরাপত্তার আড়ালে যদি জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, তবে সেটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
ঢাকা ওয়াসার নতুন নেতৃত্বের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পানি সরবরাহ উন্নত করা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের চারপাশে গড়ে ওঠা অস্বচ্ছতার দেয়াল ভেঙে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ জনগণের প্রতিষ্ঠান কখনো দুর্গ হতে পারে না; সেটি হতে হবে উন্মুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব।
