এ এক ভীষণ এবং গোপনীয় দরকষাকষি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সফটওয়্যার, অনুমোদিত সফটওয়্যার, ইএফডি/এসডিসি (ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস), মূসক চালান —সবই যেন শুভঙ্করের ফাঁকি। বাস্তবে শেষ কথা হয়ে ওঠে রাজস্ব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর মধ্যকার দরকষাকষি। জনগণকে জিম্মি করে চলা এ এক ভয়াবহ প্রক্রিয়া। এই দরকষাকষিতে উভয় পক্ষই লাভবান হয়, ঠকে জনগন। প্রশ্ন উঠেছে— ভোক্তার দেওয়া রাজস্ব ব্যবসায়ীর কাছে জমা থাকবে কেন? আর থাকলেও কেবল বিশ্বাসের ভিত্তিতে সেই অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা পড়বে —এমন নিশ্চয়তা কোথায়?

ঢাকা শহরে ভ্যাট প্রদান ও আদায়ের বাস্তবচিত্র নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ফলোআপ নিউজ এমন এক চিত্র পেয়েছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যবসায়ী, ভ্যাট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষক এবং কর পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃত ভ্যাট আদায়ের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর পারস্পরিক সমঝোতা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতি মাসে ভ্যাট কম দেখানো বা অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেয় —এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারে হাজারে। তাহলে কয়েক হাজার বা কয়েক দশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে নেয় —এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কি লাখে লাখে নয়?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, “আইন মেনে ব্যবসা করলেও যদি কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকে, তাহলে কোনো না কোনো অজুহাতে নোটিশ, অডিট, জরিমানা বা মামলা হবেই। অনেক সময় আইন নয়, সম্পর্কই বড় হয়ে দাঁড়ায়।”
একজন মাঝারি ব্যবসায়ী বলেন, “কাগজপত্রে সামান্য ভুল পেলেও সেটিকে বড় ইস্যু বানানো যায়। আবার চাইলে বড় ভুলও উপেক্ষা করা যায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গিয়ে দাঁড়ায় কীভাবে সমঝোতা হবে।”
আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, “সরকারকে যত টাকা দেওয়ার কথা, তার চেয়ে কম ভ্যাট দিয়ে কর্মকর্তাকে একটি অংশ দিয়ে দিলেই অনেক সময় বিষয়টি শেষ হয়ে যায়। এতে সরকার রাজস্ব হারায়, কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হন, ব্যবসায়ীও খরচ কমান। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও জনগণ। কিন্তু স্বচ্ছতা থাকলে ব্যবসায়ীর খুব বেশি লস হতো বলে আমি মনে করি না। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া রাজস্ব বিভাগের তাদের নিজেদের স্বার্থে টিকিয়ে রেখেছে। ”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাট এমন একটি কর, যা ব্যবসায়ীর নয়; এটি ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করা রাষ্ট্রের অর্থ। একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য বা সেবা কিনে ভ্যাট পরিশোধ করেন, তখন সেই অর্থ কার্যত সরকারের। ব্যবসায়ী কেবল সেটি সংগ্রহ করে নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এই অর্থ নিয়ে কোনো ধরনের দরকষাকষি বা অনিয়ম কেবল প্রশাসনিক দুর্নীতিই নয়, জনগণের অর্থ আত্মসাতেরও শামিল।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো— রাজস্ব সংগ্রহের বড় অংশই ব্যবসায়ীর হেফাজতে থাকে এবং পরবর্তীতে তা ঘোষণার ভিত্তিতে সরকারকে জমা দেওয়া হয়। যদি এই ঘোষণাপদ্ধতির ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকে, তাহলে কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর যোগসাজশে প্রকৃত ভ্যাট গোপন করার সুযোগ থেকে যায়।
যদিও এনবিআর গত কয়েক বছরে অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি), অনুমোদিত সফটওয়্যার এবং স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থাপনা চালু করেছে, অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, প্রযুক্তি ব্যবস্থার বাইরেও নানা উপায়ে সমঝোতার সুযোগ রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার ব্যবহারের পরও প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন, দ্বৈত হিসাব সংরক্ষণ কিংবা অঘোষিত লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা কিংবা বিভাগীয় প্রধানদের ভূমিকা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বদলি, পদায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষমতা উচ্চপর্যায়ে কেন্দ্রীভূত। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই একটি প্রভাববলয়ের মধ্যে পরিচালিত হয় বলে অনেকের ধারণা।
ভ্যাট-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনে করেন, কেবল মাঠপর্যায়ে অভিযান বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মকর্তাদের সম্পদের স্বচ্ছতা, ঘন ঘন রদবদল, ডিজিটাল নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং স্বাধীন জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যাটের প্রতিটি টাকা ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করা হয় রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য। কিন্তু সেই অর্থ যদি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর গোপন সমঝোতার উপকরণে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ সামগ্রিক জনসেবা।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা এই প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
ফলোআপ নিউজ-এর অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্যাট আদায়, ঘুষের অভিযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা, ইএফডি বাস্তবায়ন, আমদানি-রপ্তানি, বন্ড কমিশনারেট এবং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক প্রভাব —এসব বিষয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। তবে ফলোআপ নিউজ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক।
