বিশেষ প্রতিনিধি | FollowUpNews
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকাশবন্দরভিত্তিক কাস্টমস স্টেশন ঢাকা কাস্টমস হাউস। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আমদানি ও রপ্তানি পণ্য এই কাস্টমস হাউসের মাধ্যমে ছাড় হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা, আন্ডার-ইনভয়েসিং, নিষিদ্ধ পণ্য ছাড় এবং দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ অনিয়ম কোনো একক পর্যায়ে নয়; বরং একটি চালান ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে একাধিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঘটতে পারে। তদন্তে বিভিন্ন মামলায় আমদানিকারক, C&F এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও এসেছে।
প্রথম ধাপঃ ঘোষণাপত্রেই শুরু হতে পারে অনিয়ম
একটি পণ্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আমদানিকারক বা তার C&F এজেন্ট বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট ও অন্যান্য নথি দাখিল করেন।
এই পর্যায়ে অতীতে যে ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এসেছে—
- পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখানো (Undervaluation)
- উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্যের নাম ব্যবহার
- জাল ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট
- পণ্যের প্রকৃত HS Code গোপন করা
এই তথ্যই পরবর্তী মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করে। তাই শুরুতেই ভুল বা জাল তথ্য থাকলে পুরো প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপঃ অ্যাসেসমেন্ট— সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পর্যায়
অ্যাসেসমেন্ট পর্যায়ে কাস্টমস কর্মকর্তা নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন—
- ঘোষিত HS Code গ্রহণযোগ্য কি না;
- পণ্যের মূল্য বাস্তবসম্মত কি না;
- কত শুল্ক ও কর নির্ধারণ হবে।
কাস্টমস বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই রাজস্ব সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদি এই পর্যায়ে ভুল HS Code বা কম মূল্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দুদকের একাধিক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের HS Code ব্যবহার করে চালান ছাড়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে কিছু ক্ষেত্রে আমদানিকারক, C&F এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় ধাপঃ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট— কোন চালান পরীক্ষা হবে?
সব চালান খুলে পরীক্ষা করা হয় না। রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (RMS) ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী চালানকে বিভিন্ন চ্যানেলে ভাগ করে।
যদি উচ্চ ঝুঁকির চালান যথাযথভাবে শনাক্ত না হয়, তাহলে তা সীমিত বা কোনো শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই ছাড় পেতে পারে। এ কারণে এই ধাপের কার্যকারিতা পুরো ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ ধাপঃ শারীরিক পরীক্ষা
রেড চ্যানেলে নির্বাচিত চালান খুলে পরীক্ষা করা হয়।
এই পর্যায়ে কর্মকর্তারা যাচাই করেন—
- ঘোষিত পণ্যই এসেছে কি না;
- পরিমাণ ঠিক আছে কি না;
- নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ পণ্য আছে কি না।
অতীতে ঢাকা কাস্টমস হাউস দিয়ে নিষিদ্ধ মেমোরি কার্ড ছাড়ের ঘটনায় তদন্তে প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে পণ্যটি কম শুল্ক ও জরিমানায় ছাড় পেল এবং কেন সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
পঞ্চম ধাপঃ Out of Charge
সব যাচাই ও শুল্ক পরিশোধ শেষে পণ্য ছাড়ের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
যদি আগের ধাপগুলোতে ভুল তথ্য, দুর্বল যাচাই বা অনিয়ম থেকে যায়, তাহলে এই অনুমোদনের মাধ্যমে সেই চালান কার্যত কাস্টমস এলাকা থেকে বের হয়ে যায়।
একটি চালানের সঙ্গে কত পক্ষ জড়িত?
বিশ্লেষকদের মতে, একটি চালান ছাড়ের সঙ্গে সাধারণত যুক্ত থাকে—
- আমদানিকারক;
- C&F এজেন্ট;
- মূল্যায়নকারী কর্মকর্তা;
- পরীক্ষাকারী কর্মকর্তা;
- তদারকি কর্মকর্তা;
- এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদন।
তাই কোনো অনিয়ম ঘটলে কেবল একটি পদ বা একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। প্রতিটি ধাপের সিদ্ধান্ত, নথি এবং অনুমোদনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
অতীতের মামলাগুলো কী বলছে?
দুদকের বিভিন্ন তদন্ত ও চার্জশিটে দেখা গেছে, কিছু মামলায় অভিযোগ ছিল যে কম শুল্কের HS Code ব্যবহার, জাল ইনভয়েস ও শিপিং নথি এবং ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আমদানিকারক, C&F এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলো আদালতের বিচারাধীন বা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে; তাই সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, তদন্ত ও মামলার অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
জবাবদিহি বাড়ানোর প্রস্তাব
রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির সুযোগ কমাতে প্রয়োজন—
- HS Code ও মূল্যায়নের স্বাধীন অডিট;
- অ্যাসেসমেন্ট ও এক্সামিনেশন রিপোর্টের নিয়মিত পর্যালোচনা;
- ঝুঁকিভিত্তিক চালান নির্বাচনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন;
- সংবেদনশীল দায়িত্বে নিয়মিত কর্মকর্তা বদলি;
- এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্রেইল সংরক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাস্টমসে অনিয়ম প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হলো কোনো একক কর্মকর্তার ওপর দোষ চাপানো নয়; বরং পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা।
