ফলোআপনিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান Apex Footwear Limited ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিটির মুনাফা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ব্যবসায়িক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ট্যাক্স রিটার্ন ও আর্থিক নথি পর্যালোচনায় আরও জানা যায়, একই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২০ কোটি ৭ লাখ ৯১ হাজার ১৬৬ টাকা কর পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ, নিট মুনাফার অর্ধেকেরও বেশি অংশ কর বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা গেছে।
Apex Footwear Limited বাংলাদেশের জুতা শিল্পের অন্যতম অগ্রদূত। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি বর্তমানে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা ও জাপানসহ ৪০টির বেশি দেশে জুতা রপ্তানি করে। কোম্পানির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এপেক্সের রয়েছে ১৩৫টি আন্তর্জাতিক ক্রেতা (Global Customers) এবং দেশজুড়ে ২৬০টি নিজস্ব সেলস পয়েন্ট।
তবে বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণ ও কোম্পানি-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ডিলারভিত্তিক বিক্রয় কেন্দ্রসহ এপেক্স ব্র্যান্ডের মোট আউটলেট সংখ্যা ৫৫০টিরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোম্পানির খুচরা উপস্থিতি দেশের সবচেয়ে বড় জুতা বিক্রয় নেটওয়ার্কগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রপ্তানি আয়ের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এপেক্স ফুটওয়্যারের রপ্তানি আয় প্রায় ৬৬৩ কোটি টাকা ছিল বলে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও রপ্তানি কার্যক্রম থেকে মুনাফা অত্যন্ত কম ছিল।

এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানির মোট বিক্রয় আয় দাঁড়ায় প্রায় ১,৩৬৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে স্থানীয় বাজার ও রপ্তানি—উভয় খাতেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এপেক্সের টার্নওভার ছিল প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা, কিন্তু ওই প্রান্তিকে নিট মুনাফা ছিল মাত্র ১ কোটি টাকার কিছু বেশি। এতে বোঝা যায়, বিক্রয় বাড়লেও ব্যয়, সুদ ও করের চাপ মুনাফাকে সংকুচিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এপেক্স ফুটওয়্যারের কম মুনাফার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকঋণের সুদ ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং করের চাপ। প্রকাশিত আর্থিক তথ্যে দেখা যায়, পূর্ববর্তী অর্থবছরে কোম্পানির আয়কর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল এবং সুদ ব্যয়ও উচ্চ পর্যায়ে ছিল।
কোম্পানিটি বর্তমানে গাজীপুরের শফিপুরে আধুনিক উৎপাদন কারখানা পরিচালনা করছে এবং সেখানে হাজারো শ্রমিক কর্মরত আছেন। বিভিন্ন সূত্রে কর্মীর সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জুতা শিল্পের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। তবে সর্বশেষ আর্থিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বড় বিক্রয় ও বড় রপ্তানি থাকা সত্ত্বেও মুনাফা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপেক্সের মতো বৃহৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিক্রয় প্রবৃদ্ধিকে টেকসই মুনাফায় রূপান্তর করা।
রাষ্ট্রের জন্য অবশ্য কোম্পানিটি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ করদাতা প্রতিষ্ঠান। ২০২৬ সালে ২০ কোটির বেশি কর পরিশোধের তথ্য সেটিই নির্দেশ করে। এখন দেখার বিষয়, আগামী অর্থবছরে এপেক্স ফুটওয়্যার বাড়তি বিক্রয় ও রপ্তানিকে কতটা কার্যকরভাবে নিট মুনাফায় পরিণত করতে পারে।
