Headlines

শ্যামপুর-ডেমরায় ‘সমঝোতা’ ও ঘুষের অভিযোগঃ নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ভবন, ভ্যাট কোথায়?

ঢাকার শ্যামপুর ও ডেমরা ভ্যাট বিভাগের আওতায় দ্রুত বাড়ছে বহুতল ভবন, মার্কেট, শপিং কমপ্লেক্স, গুদাম, কারখানা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা। জমির ওপর একের পর এক ভবন উঠছে, প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ হচ্ছে, ভবিষ্যতে দোকান বা ফ্লোর স্পেস বিক্রি কিংবা ভাড়া দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। কিন্তু এসব নির্মাণ প্রকল্পের বিপরীতে ভ্যাট প্রশাসনের তদারকি ও রাজস্ব আদায়ের চিত্র নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

অভিযোগ রয়েছে, শ্যামপুর ও ডেমরা ভ্যাট বিভাগের আওতাধীন কিছু নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক প্রকল্পকে নিয়মিত নজরদারি, পরিদর্শন ও ভ্যাট-সংক্রান্ত যাচাইয়ের বাইরে রাখতে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা গড়ে উঠেছে। অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ হলো— কিছু প্রকল্পের মালিক বা নির্মাণসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নিয়মিত বা প্রকল্পভিত্তিক ঘুষ নেওয়ার বিনিময়ে প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নির্মাণের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ লেনদেনের তথ্য ভ্যাট প্রশাসনের কাছে যথাযথভাবে না তোলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

নির্মাণাধীন ভবনই কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের আকার, নির্মাণ ব্যয়, ফ্লোর স্পেস, ভবিষ্যৎ বিক্রয় বা ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট supply/service-এর প্রকৃতি— সবকিছুই রাজস্ব প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

NBR-এর VAT নির্দেশনায় নির্মাণ, house building, land ও property-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম VAT কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসার জন্য BIN নিবন্ধনের বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের সংশোধিত বিধানে developer বা real estate developer-এর সংজ্ঞার আওতা বিস্তৃত করা হয়েছে। নিজের জমি কিংবা অন্যের জমিতে developer-এর মতো কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এর আওতায় আসতে পারে।

ফলে প্রশ্ন হচ্ছে— শ্যামপুর ও ডেমরা এলাকায় যে বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণাধীন, সেগুলোর কতগুলো ভ্যাট প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির আওতায় রয়েছে?

‘সমঝোতা’র অভিযোগ কীভাবে কাজ করে?

অভিযোগের ধরন অনুযায়ী, কোনো কোনো প্রকল্পে নিয়মিত পরিদর্শন না করা, প্রকল্পের প্রকৃত আকার বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পর্কে নথি না চাওয়া, রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল না দেখা কিংবা সম্ভাব্য ভ্যাট liability নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিনিময়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এটি শুধু কোনো ব্যবসায়ীর ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা নয়; বরং রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে একটি সম্ভাব্য ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা’ তৈরি হওয়ার অভিযোগ।

অর্থাৎ ব্যবসায়ী ভ্যাট কম দেখাবেন বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভ্যাটের আওতায় আসবেন না— আর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বিষয়টি দেখেও নীরব থাকবেন। বিনিময়ে কর্মকর্তা পাবেন অনৈতিক আর্থিক সুবিধা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নঃ শত শত ভবনের হিসাব কোথায়?

শ্যামপুর ও ডেমরা ভ্যাট বিভাগের কাছে ফলোআপ নিউজ জানতে চায়—

  • বর্তমানে তাদের আওতায় কতটি রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে?
  • এর মধ্যে কতটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করছে?
  • ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কতটি নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক প্রকল্প পরিদর্শন করা হয়েছে?
  • এসব পরিদর্শনের কতগুলোতে ভ্যাট-সংক্রান্ত অসঙ্গতি পাওয়া গেছে?
  • কতটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ভ্যাট পরিশোধের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
  • কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, অডিট বা তদন্ত হয়েছে?
  • এসব নির্মাণ প্রকল্প থেকে মাসে ও বছরে কত টাকা VAT আদায় হয়েছে?
  • কোন কোন বড় প্রকল্পের BIN থাকলেও VAT return-এ কার্যক্রমের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম?
  • কোনো বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণাধীন থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের VAT payment প্রায় শূন্য বা অত্যন্ত কম থাকার ঘটনা আছে কি না?

ঘুষের অভিযোগের তদন্তে নথিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, তবে

একই কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করছেন না,
প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে রিটার্নের তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে,
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিকভাবে কম VAT দিচ্ছেন, মোটেও দিচ্ছেন না,
এবং একই কর্মকর্তার অধিক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—

তাহলে সেটি আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক গাফিলতি হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।

তখন প্রশ্ন উঠবে: কেন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত যাচাই করা হয়নি?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে আসে— কোনো অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা ‘সমঝোতা’ হচ্ছে কিনা।

FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু

এই অনুসন্ধানে শ্যামপুর ও ডেমরা ভ্যাট বিভাগের আওতাধীন সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ভবনগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে—

প্রকল্পের নাম → মালিক/ডেভেলপার → ঠিকানা → BIN → নির্মাণাধীন ফ্লোর সংখ্যা → সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ব্যবহার → VAT return → VAT payment → সর্বশেষ পরিদর্শনের তারিখ → পরিদর্শন কর্মকর্তার নাম → কোনো audit/assessment হয়েছে কি না

—এই তথ্যগুলো পাশাপাশি বসানো হবে।

এরপর দেখা হবে, ভবনের দৃশ্যমান বাস্তবতা আর ভ্যাট রিটার্নের কাগজের হিসাবের মধ্যে কতটা পার্থক্য।

যদি দেখা যায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ভবনগুলো ভ্যাট প্রশাসনের নথিতে কার্যত ‘অদৃশ্য’, তখন সেটি শুধু কর ফাঁকির প্রশ্ন নয়— রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি তৈরি করবে।

যদি একাধিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিয়ম, একই ধরনের কর্মকর্তার নিষ্ক্রিয়তা এবং একই ধরনের আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে শ্যামপুর-ডেমরা ভ্যাট বিভাগের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের অভিযোগটি হবে অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। এবং বিষয়টি দুদক বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে আমলযোগ্য করে তোলা হবে।

বিষয়টি কতটা গুরুতরো তা নিচের প্রতিষ্ঠান তিনটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অনুসন্ধান চালালে আরো পরিষ্কার হবে।

১. Oishi Eden Square — পাইটী, ডেমরা
ডেভেলপার: Oishi Housing & Developments Limited
প্রকল্প: 16-storied + 2 basement
ধরন: Commercial Cum Apartment Building
নাম: Oishi Eden Square
এলাকা: Paity/Paiti, Demra, Dhaka
একটি structural engineering firm’s project list-এ এটিকে “Construction Ongoing or running” হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং RAJUK approval design-এর কথা উল্লেখ আছে।

২. M.S. Tower — সারুলিয়া, ডেমরা
মালিক: Mr. Jabed Hossain
প্রকল্প: 10-storied + 1 basement
ধরন: Commercial Cum Apartment Building
ঠিকানা: Dag No. 1184, Mouza Gop Dakkin, Hajinagar, Sarulia, Demra
প্রকল্পটিকেও একই engineering firm’s তালিকায় “Construction Ongoing or running” বলা হয়েছে।

৩. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ RAJUK-সংক্রান্ত lead — মাটুয়াইল
মালিক: Zahirul Islam Gong
প্রকল্প: 14-storied, 1 basement + ground + 13
ধরন: Commercial Building
এলাকা: Mouza Matuail, Demra, Dhaka

প্রশ্ন হচ্ছে—

শ্যামপুর-ডেমরা ভ্যাট বিভাগের আওতায় থাকা নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ভবনগুলোর কতগুলোতে taxable construction supply হচ্ছে, সেই supply-এর বিপরীতে কত VAT আদায় হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্পগুলো কখন কখন পরিদর্শন করেছেন?