নিজস্ব প্রতিবেদক | ফলোআপ নিউজ
রাজধানীর মিষ্টির বাজারে পরিচিত দুই নাম— বিক্রমপুর সুইটস ও প্রিমিয়ার সুইটস। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা এই দুই প্রতিষ্ঠানের পণ্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে পরিচিত। কিন্তু তাদের ব্যবসার আড়ালে ভ্যাট হিসাব, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, ওজন এবং খাদ্যমান নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।

এর মধ্যে বিক্রমপুর সুইটসের জিগাতলা শাখা/কারখানাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার সুইটসের বিরুদ্ধে ভ্যাট সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি আদালতের নথিতেও রয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নথিতে VAT Appeal No. 32/2016—Premier Sweets Limited বনাম Customs, Excise and VAT Appellate Tribunal and others নামে একটি মামলা রয়েছে। মামলাটি ২০১৬ সাল থেকেই আদালতের নথিতে রয়েছে এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একাধিকবার শুনানির তালিকায় এসেছে।
অর্থাৎ প্রিমিয়ার সুইটসের ক্ষেত্রে ভ্যাট নিয়ে প্রশ্নটি নিছক সাম্প্রতিক অভিযোগ নয়; বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
তবে এই মামলার মূল দাবির অঙ্ক, কোন করবর্ষের কী ধরনের ভ্যাট বিরোধ এবং সর্বশেষ রায় কী— এসব নির্ধারণ করতে মূল মামলার নথি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
জিগাতলায় বিক্রমপুরের আলাদা চিত্র
বিক্রমপুর সুইটসের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জিগাতলা।
সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (DIFE) অনলাইন রেকর্ডে ৬/সি, মনেশ্বর রোড, জিগাতলা, হাজারীবাগ, ঢাকা-১২০৯ ঠিকানায় “Bikrampur Sweets Store” নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে। সরকারি রেকর্ডে এর শিল্পখাত হিসেবে “মিষ্টান্ন কারখানা”, শ্রেণি A (কারখানা) এবং মোট শ্রমিক ১৬ জন উল্লেখ রয়েছে।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ জিগাতলার প্রতিষ্ঠানটি যদি কেবল একটি খুচরা দোকান না হয়ে উৎপাদনকারী কারখানাও হয়, তাহলে সেখানে উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়, মজুত, বিক্রয়, শাখায় সরবরাহ এবং ভ্যাট হিসাব —সবগুলো বিষয় একসঙ্গে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
আসল প্রশ্ন: উৎপাদন কত, বিক্রি কত?
জিগাতলা কারখানায় প্রতিদিন কত কেজি বা কত টাকার মিষ্টি উৎপাদন হয়?
কতটুকু বিভিন্ন শাখায় পাঠানো হয়?
কতটুকু সরাসরি কারখানা বা দোকান থেকে বিক্রি হয়?
সেই বিক্রয়ের কত অংশ EFD/চালান/হিসাবের মধ্যে আসে?
এবং শেষ পর্যন্ত কত টাকার বিক্রয় ভ্যাট রিটার্নে প্রদর্শিত হয়?
এই তথ্যগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে সেখানেই বেরিয়ে আসতে পারে কথিত কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির হিসাব।

একই মিষ্টি, ভিন্ন নাম— দামেও ভিন্নতা?
অনুসন্ধানে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— একই ধরনের (উপাদানের) বা কাছাকাছি ধরনের মিষ্টিকে বিভিন্ন নামে বাজারজাত করে ভিন্ন ভিন্ন দাম নেওয়া হচ্ছে কি না।
এখানে শুধু দাম বেশি বা কম হওয়াই সমস্যা নয়।
প্রশ্ন হলো, পণ্যের উপাদান, ওজন, উৎপাদন খরচ ও মানে বাস্তব পার্থক্য কতটা?
একই ধরনের মিষ্টি যদি নাম পরিবর্তনের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দামে বিক্রি হয়, সেই মূল্য পার্থক্যের যৌক্তিক ভিত্তি কী?
বাজারে প্রকাশিত তথ্যেও বিক্রমপুরের বিভিন্ন মিষ্টির দামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে তাদের কলাবাগান শাখায় কাশ্মীরি চমচম, চমচম, ক্ষীর মালাই, গাজর মণ্ডা, গোলাপজাম, মালাইকারী ও কেক সুইটসের দাম কেজিপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬২০ টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছিল। যদিও এখন দাম আরও অনেক বেশী।
এ ধরনের তথ্য অবশ্যই ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ নয়। কিন্তু পণ্যের নাম, ওজন, বিক্রয়মূল্য এবং বিলিং পদ্ধতি পাশাপাশি যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
ভ্যাটের হিসাবেই আসল রহস্য
একটি মিষ্টির দোকানে প্রতিদিনের বিক্রয়ের বড় অংশ নগদ হতে পারে। পাশাপাশি কার্ড, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন অর্ডার এবং কর্পোরেট অর্ডারও থাকতে পারে।
তাই শুধু ভ্যাট রিটার্ন দেখলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
জিগাতলা শাখা বা কারখানার ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচটি তথ্য পাশাপাশি বসানো দরকার—
উৎপাদন → শাখায় সরবরাহ → প্রকৃত বিক্রয় → হিসাবভুক্ত বিক্রয় → প্রদেয়/পরিশোধিত ভ্যাট।
এই পাঁচটি স্তরের মধ্যে কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, সেটিই অনুসন্ধানের মূল বিষয়।
বিশেষ করে যদি উৎপাদনের পরিমাণ এবং শাখাগুলোতে সরবরাহের পরিমাণের সঙ্গে ঘোষিত বিক্রয়ের হিসাব না মেলে, তাহলে সেটি ভ্যাট কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অডিট-ইঙ্গিত হতে পারে।
পণ্যের মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন
ভ্যাটের হিসাবের বাইরে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এখন সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ১২ আগস্ট ২০২৬ গেন্ডারিয়ায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযানে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার অ্যান্ড বেকারির একটি কারখানাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
প্রকাশিত অভিযানের তথ্যে বলা হয়, সেখানে পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অপরিষ্কার ছিল। লেবেল ছাড়াই দই, মিষ্টি ও রসগোল্লা মজুত ও বিক্রি করা হচ্ছিল এবং তেলাপোকার উপস্থিতিও পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি অপরাধ স্বীকার করায় জরিমানার অর্থ আদায় করা হয়।
এটি অবশ্যই জিগাতলা শাখার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগের প্রমাণ নয়।
কিন্তু একই ব্র্যান্ডের বিভিন্ন উৎপাদন ও বিক্রয়কেন্দ্র নিয়ে নিয়মিত খাদ্যমান পরীক্ষা কতটা হচ্ছে, সেই প্রশ্নকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনে।
একবার অভিযান নয়, নিয়মিত স্যাম্পল টেস্ট চাই
ভোক্তাদের পক্ষ থেকে এখন যে দাবি উঠছে, তা হলো— শুধু অভিযোগের পর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা যথেষ্ট নয়।
বিক্রমপুর সুইটস ও প্রিমিয়ার সুইটসের বিভিন্ন শাখা এবং উৎপাদনকেন্দ্র থেকে নিয়মিত ও আকস্মিক নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হোক।
পরীক্ষা হতে পারে—
- দুধ ও ছানার মান;
- মিষ্টিতে ব্যবহৃত রং;
- অনুমোদিত ও অননুমোদিত উপাদান;
- মাইক্রোবায়োলজিক্যাল নিরাপত্তা;
- সংরক্ষণ পদ্ধতি;
- প্যাকেটজাত পণ্যের লেবেল;
- উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য;
- ওজনের যথার্থতা।
এবং পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হলে ক্রেতারাও জানতে পারবেন তারা আসলে কী কিনছেন।
প্রিমিয়ার সুইটস: আদালতে ভ্যাট বিরোধ
প্রিমিয়ার সুইটসের ক্ষেত্রে ভ্যাট সংক্রান্ত প্রশ্নের একটি নথিভুক্ত দিক হলো VAT Appeal No. 32/2016।
সুপ্রিম কোর্টের cause list-এ মামলাটি “Premier Sweets Limited vs Customs, Excise and VAT Appellate Tribunal and others” হিসেবে রয়েছে। ২০১৬ সালের নথিতেও মামলাটি পাওয়া যায় এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও এটি আদালতের শুনানির তালিকায় এসেছে।
২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবরের cause list-এ মামলাটি ২৭ অক্টোবর শুনানির জন্য নির্ধারিত ছিল। আবার ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত cause list-এও মামলাটি “For Hearing” হিসেবে দেখা যায়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— মামলা থাকা এবং ভ্যাট ফাঁকি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
তাই মামলার মূল আদেশ, ভ্যাট দাবির নোটিশ, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আদালতের আদেশ সংগ্রহ করেই চূড়ান্ত আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা উচিত।
তাহলে নজরদারি কোথায়?
বিক্রমপুর সুইটসের একাধিক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান/শাখার তথ্য সরকারি DIFE ডাটাবেসেও পাওয়া যায়। যেমন টিকাটুলী, খিলক্ষেত, লালমাটিয়া, আদাবর ও অন্যান্য এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত অস্তিত্ব রয়েছে।
অর্থাৎ এটি ছোট একটি একক দোকানের গল্প নয়।
শাখা যত বেশি, উৎপাদন ও সরবরাহের চেইন যত বড়, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য নিরাপত্তা তদারকির প্রয়োজনও তত বেশি।
তাই সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের কাছে প্রশ্ন—
বিক্রমপুর সুইটস্-এর কারখানা ও শাখার গত কয়েক বছরের বিক্রয় কত?
কত টাকার ভ্যাট প্রদর্শিত ও পরিশোধ করা হয়েছে?
EFD তথ্যের সঙ্গে রিটার্নের মিল আছে কি?
কোনো ভ্যাট অডিট বা তদন্ত হয়েছে কি?
কোনো দাবিনামা বা বকেয়া রয়েছে কি?
আর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—
কতবার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে?
কী কী পণ্যের নমুনা নেওয়া হয়েছে?
পরীক্ষার ফল কী?
অভিযোগের ভিত্তিতে জরিমানা ছাড়া নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা কী?
কোটি কোটি টাকার প্রশ্নটি কোথায়?
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়; বরং সেই সংখ্যাটি বের করার পদ্ধতি।
জিগাতলা কারখানায় উৎপাদন কত, বিভিন্ন শাখায় সরবরাহ কত, প্রকৃত বিক্রয় কত, হিসাবের বিক্রয় কত এবং তার বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট কত— এই হিসাব মিললেই বোঝা যাবে কথিত কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা।
একইভাবে প্রিমিয়ার সুইটসের VAT Appeal No. 32/2016-এর মূল নথি বিশ্লেষণ করলে জানা যাবে, সেই মামলায় রাষ্ট্র কত টাকা দাবি করেছিল এবং বিরোধের প্রকৃতি কী ছিল। এখন তাদের চর্চা কী?
অভিযোগের সত্যতা নথিতে প্রমাণিত হলে সেটি শুধু একটি মিষ্টির দোকানের অনিয়ম নয়— এটি ভোক্তার অর্থ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব— তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করবে।
আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তবুও নিয়মিত অডিট ও স্যাম্পল টেস্টের মাধ্যমে সেটি পরিষ্কার হওয়া উচিত।
কারণ ভোক্তার জানার অধিকার আছে—
যে মিষ্টির জন্য তিনি টাকা দিচ্ছেন, সেটি আসলে কতটা নিরাপদ; যে দাম দিচ্ছেন, সেটি কতটা যৌক্তিক; আর যে ভ্যাট তার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, তার কতটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কোষাগারে যাচ্ছে।
ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
