চার বছরে দুই কমিশনারকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার অভিযোগ; নিচের স্তরেও ‘ম্যানেজ’ খরচ— নথিতে ২০১৭ সালের VAT নোটিশ বাতিল, কমিশনারকে আদালতে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।
খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার বটিয়াঘাটার গোপাল বিড়ি ফ্যাক্টরিকে ঘিরে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পাশাপাশি উঠেছে গুরুতর ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ। কারখানাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ব্যবসা ও উৎপাদন সচল রাখতে সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত অর্থ দিতে হয়। এমনকি গত চার বছরে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের দায়িত্বে থাকা দুই কমিশনারকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। তবে গোপাল বিড়ি ও খুলনা ভ্যাট প্রশাসনের সম্পর্কের ইতিহাসে এমন কিছু নথি রয়েছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের বিরোধ এত দীর্ঘস্থায়ী কেন?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে উচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়।
হাইকোর্টে টেকেনি VAT-এর নোটিশ
২০১৭ সালে গোপাল বিড়ি ফ্যাক্টরী লিমিটেডের বিরুদ্ধে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট একটি VAT-সংক্রান্ত নোটিশ জারি করে।
বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্টে। Writ Petition No. 11803 of 2017-এর রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ওই নোটিশের বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২২ জুন ২০১৭ গোপাল বিড়ির কাছে VAT-সংক্রান্ত দাবি জানিয়ে ওই নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নোটিশে VAT Act 1991-এর Section 55(1) এবং Section 37(3) একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়।
আদালত জানায়, এভাবে দুই ধারার বিধান একসঙ্গে প্রয়োগের সুযোগ নেই। প্রথমে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় VAT-এর দায় নির্ধারণ করতে হবে, এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় penal ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
ফলে আদালত ওই নোটিশকে আইনগত কর্তৃত্ববিহীন এবং আইনগত ফলহীন ঘোষণা করে বাতিল করে।
এটি শুধু একটি মামলার রায় নয়; রাজস্ব প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের ওপর উচ্চ আদালতের সরাসরি হস্তক্ষেপ।
আদালতে হাজির হয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন তৎকালীন কমিশনার
মামলাটির আরেকটি দিক আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
২০১৭ সালে সংশ্লিষ্ট নোটিশটি জারি করেছিলেন তৎকালীন Commissioner, Customs, Excise & VAT Commissionerate, Khulna K.M. Ohidul Alam।
মামলার শুনানির পর্যায়ে আদালত তাকে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হতে নির্দেশ দেয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে আগের আদালতের আদেশ ভুলভাবে পড়ে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
আদালত তার বয়স বিবেচনায় ক্ষমা গ্রহণ করে।
অর্থাৎ গোপাল বিড়ির সঙ্গে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের বিরোধের ইতিহাসে অন্তত একটি ঘটনা রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট কমিশনারের সিদ্ধান্ত আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আদালতে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছে।
তাহলে ঘুষের অভিযোগ কোথায়?
এখানেই বর্তমান অভিযোগটির গুরুত্ব।
কারখানাসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত চার বছরে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের দায়িত্বে থাকা দুই কমিশনারকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের দাবি, কমিশনার পর্যায়ে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি নিচের স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বিভিন্ন সময় নিয়মিত অর্থ দিতে হয়।
অভিযোগের ভাষায়—
‘উপরে একবার, নিচে নিয়মিত।’
তবে কে কত টাকা নিয়েছেন, কখন নিয়েছেন এবং বিনিময়ে কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে— এসব বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে, এই অভিযোগ কি শুধুই একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অসন্তোষ, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কোনো প্রশাসনিক ও আর্থিক সমঝোতা?
উত্তর পেতে হলে কাগজপত্রে যেতে হবে।
গোপাল বিড়ির দুই BIN
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যেও গোপাল বিড়ির একাধিক নিবন্ধিত ব্যবসায়িক পরিচয় পাওয়া যায়।
| প্রতিষ্ঠান | BIN |
|---|---|
| Gopal Biri Factory Ltd. | 000076059-0801 |
| Gopal Biri Factory Ltd. | 000076262-0802 |
এনবিআরের Audit BIN List-এ 000076262-0802 নম্বরের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ধনপোতা, ফকিরহাট, বাগেরহাট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ গোপাল বিড়ির রাজস্ব কার্যক্রম অনুসন্ধান করতে হলে শুধু বটিয়াঘাটার কারখানাকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান করলে চলবে না। কোন BIN-এর অধীনে কী ধরনের কার্যক্রম হয়েছে এবং কোন সময়ে কোন রাজস্ব অফিস তার দায়িত্বে ছিল— সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
২০২৫ সালেও মামলা
গোপাল বিড়ি ও সরকারের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি শুধু ২০১৭ সালের ঘটনায় আটকে নেই।
সুপ্রিম কোর্টের ২০২৫ সালের বিভিন্ন Cause List-এ Gopal Biri Factory Limited বনাম Government of Bangladesh and others নামে Writ Petition No. 705/2025-এর তথ্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ প্রায় এক দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব প্রশাসনের আইনি বিরোধের ধারাবাহিকতা রয়েছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— ২০২৫ সালের মামলাটি কেন হয়েছে?
সেই মামলার মূল petition, order এবং সংশ্লিষ্ট রাজস্ব নথি বিশ্লেষণ করলে হয়তো বর্তমান বিরোধের একটি বড় অংশ পরিষ্কার হতে পারে।
কারখানায় শ্রমিক ১,৫০০
গোপাল বিড়ির বিরুদ্ধে বা পক্ষে প্রশাসনিক লড়াইয়ের বাইরে রয়েছে আরেকটি বড় বাস্তবতা— শ্রমিক।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের LIMA ডাটাবেজে বটিয়াঘাটার নারায়ণপুরে গোপাল বিড়ি ফ্যাক্টরী লিমিটেডের একটি ইউনিটে ১ হাজার ৫০০ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০ পুরুষ এবং ৩০০ নারী শ্রমিক।
প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি রেকর্ডে ৬৫০ শ্রমিকের তথ্যও রয়েছে।
অর্থাৎ গোপাল বিড়িকে ঘিরে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু মালিকপক্ষের ওপর পড়ে না; এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবিকা জড়িত।
শ্রমিকদের অভিযোগও কম নয়
২০২৪ সালের অক্টোবরে গোপাল বিড়ির শ্রমিকদের চার দফা দাবিতে কর্মবিরতির খবর প্রকাশিত হয়। শ্রমিকরা দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছিলেন।
একই সময়ে নারায়ণপুরে গোপাল বিড়ি ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধনের খবরও প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ একদিকে রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ, অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া— সব মিলিয়ে গোপাল বিড়ি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।
আসলে কত টাকা রাজস্ব?
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গোপাল বিড়ির গত ১০ বছরের—
- VAT assessment
- VAT demand
- আদায়কৃত রাজস্ব
- বকেয়া
- audit report
- inspection report
- মামলা ও notice
- appeal
- আদালতে বাতিল হওয়া assessment বা notice
এসব তথ্য পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে, বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ওপর রাজস্ব চাপ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
আর যদি দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট কমিশনারের সময়ে হঠাৎ বিশাল অঙ্কের demand, পরবর্তীতে তা কমে যাওয়া, মামলা প্রত্যাহার, assessment পরিবর্তন কিংবা অস্বাভাবিক সমন্বয় হয়েছে—তাহলে ঘুষের অভিযোগ যাচাইয়ের একটি শক্ত নথিভিত্তিক পথ তৈরি হবে।
প্রশ্ন এখন অনেক
| অনুসন্ধানের প্রশ্ন | কেন গুরুত্বপূর্ণ |
|---|---|
| গত চার বছরে দুই কমিশনার কারা? | অভিযোগের সময়সীমা নির্ধারণ |
| তাদের সময়ে গোপাল বিড়ির assessment কত? | আর্থিক পরিবর্তন বোঝা |
| কত টাকা আদায় হয়েছে? | প্রকৃত রাজস্ব চিত্র |
| কতগুলো audit হয়েছে? | নজরদারির মাত্রা |
| কতগুলো মামলা/notice হয়েছে? | প্রশাসনিক চাপের চিত্র |
| কতগুলো মামলা আদালতে গেছে? | বিরোধের ধারাবাহিকতা |
| কতগুলো notice আদালতে বাতিল হয়েছে? | প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা |
| কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের নথি কী বলে? | ‘ম্যানেজ’ অভিযোগ যাচাই |
| শ্রমিকদের মজুরি ও সুবিধা কী? | অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব |
তদন্তের দাবি
গোপাল বিড়ির বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ যেমন গুরুতর, তেমনি কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ প্রকাশ করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাই প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ নথিভিত্তিক তদন্ত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত গত কয়েক বছরে গোপাল বিড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব VAT ও আবগারি নথি পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে অভিযোগে যেসব কমিশনার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম আসছে, তাদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও জানতে হবে— তারা সত্যিই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বা ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’ হিসেবে অর্থ দিয়েছে কি না। দিয়ে থাকলে কাকে, কখন, কত এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
কারণ একটি প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টির রহস্য কাটছে না—
গোপাল বিড়ির কাছ থেকে সরকারি রাজস্ব নেওয়া হয়েছে, নাকি সরকারি অফিস ‘ম্যানেজ’ করার নামে অন্য কোনো অর্থনীতি তৈরি হয়েছে?
২০১৭ সালের আদালতের রায় দেখিয়েছে, গোপাল বিড়ির বিরুদ্ধে রাজস্ব প্রশাসনের অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আদালতে টেকেনি। ২০২৫ সালেও নতুন মামলা দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যদি গত চার বছরে দুই কমিশনারকে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আর একটি কারখানার সাধারণ কর-বিরোধ থাকে না।
তখন এটি হয়ে দাঁড়ায়—
রাজস্ব প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক— এই তিন পক্ষের সম্পর্কের ভেতরে তৈরি হওয়া একটি বড় প্রশ্ন।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর বের করার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—অভিযোগ নয়, নথি।
