কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সংকটাপন্ন পরিবেশগত এলাকা (ECA) এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি খাসজমি অবৈধ দখল ও জালিয়াতির মাধ্যমে বেহাত হওয়ার চাঞ্চল্যকর ইতিহাস উঠে এসেছে বিভিন্ন তদন্তে। আদালতের কড়া নির্দেশনা ও প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান সত্ত্বেও পর্দার আড়ালের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে সৈকত এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় আজ বিপন্ন।

জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)-এর নথিপত্রে বিধি লঙ্ঘন, নকশা বহির্ভূত নির্মাণ এবং অবৈধ দখলদার হিসেবে বারবার নাম উঠে এসেছে দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি মাঝারি ও বড় বিলাসবহুল হোটেলের।
তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে বিতর্কিত তালিকায় থাকা প্রধান হোটেল ও তাদের নেপথ্যের মালিকদের সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছেঃ
১. হোটেল সাইমন (Sayeman Beach Resort)
-
- অভিযোগ: সমুদ্রসৈকতের সংরক্ষিত এলাকার (ECA) ভেতরে উচ্চতা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের নির্ধারিত বাউন্ডারি শর্ত ভঙ্গের দায়ে এই হোটেলের বর্ধিত অংশ নথিতে চিহ্নিত।
- মালিকানা: হোটেলটির মালিক সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পরিবার। বর্তমানে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হিসেবে এটি পরিচালনা করছেন তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল।
২. হোটেল সী গাল (Seagull Hotel)
-
- অভিযোগ: ঝাউবীথি ও সৈকতের একেবারে কাছাকাছি সীমানা প্রাচীর ও অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে মূল জোন আইনের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
- মালিকানা: এটি সী গাল হোটেলস লিমিটেড-এর অধীনে পরিচালিত। এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাসুম ইকবাল।
৩. ওশেন প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট (Ocean Paradise)
-
- অভিযোগ: কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নকশা বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ফ্লোর বা বর্ধিত অংশ অবৈধভাবে নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
- মালিকানা: দেশের অন্যতম শীর্ষ ও প্রাচীন করপোরেট প্রতিষ্ঠান এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এই হোটেলের মূল অংশীদার। বর্তমানে এর পরিচালক হিসেবে অন্যতম প্রধান দায়িত্বে আছেন ব্যবসায়ী মোঃ আব্দুল কাদের মুন্সী।
৪. লং বিচ হোটেল (Long Beach Hotel)
-
- অভিযোগ: হোটেল-মোটেল জোনের পরিবেশগত ছাড়পত্র না নিয়ে বর্জ্য নিষ্কাশন বা ইটিপি (ETP) প্ল্যান্ট ছাড়া সমুদ্র দূষণ এবং নির্দিষ্ট জোনিং শর্ত ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
- মালিকানা: এই হোটেলটির মালিকানায় রয়েছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গ্রুপ উর্মি গ্রুপ ও লতিফ ট্রাভেলস সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ, যার অন্যতম শীর্ষ পরিচালক ব্যবসায়ী আসাফ উদ দৌলা সিনহা।
৫. হোটেল সী প্রিন্সেস (The Sea Princess Hotel)
-
- অভিযোগ: সরকারি খাসজমির দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্তের সুনির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ করে স্থাপনা সম্প্রসারণের দায়ে প্রশাসনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
- মালিকানা: ঢাকা ও কক্সবাজারভিত্তিক একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের যৌথ মালিকানাধীন বোর্ড অব ডিরেক্টরস এটি পরিচালনা করেন।
৬. হোটেল সী পার্ক ও লাগুনা বিচ রিসোর্ট (Hotel Sea Park & Laguna Beach Resort)
-
- অভিযোগ: পরিবেশ অধিদপ্তরের (DoE) আইন অমান্য করে কোনো প্রকার তরল বর্জ্য শোধনাগার (ETP) না রেখে বছরের পর বছর মানববর্জ্য সাগরে ফেলে পরিবেশ দূষণের দায়ে এদেরকে জরিমানা ও অবৈধ ক্যাটাগরিতে সিলগালা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- মালিকানা: স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং আবাসিক হোটেল-মোটেল জোনের একাধিক উপ-কমিটির সাথে যুক্ত মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এগুলো।
৭. মেরিন ইকো রিসোর্ট (Marine Eco Resort)
-
- অভিযোগ: পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকার ভেতর ইকো-ট্যুরিজমের নামে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার আস্তানা হিসেবে ব্যবহারের দায়ে সম্প্রতি এই রিসোর্টে র্যাবের বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়।
- মালিকানা: স্থানীয় প্রভাবশালী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাতায় তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রের সদস্য কাজী জাফর সাদেক রাজু এই রিসোর্টের মালিক।
৮. সুগন্ধা জোনের অবৈধ হোটেল ও হাঁড়ি রেস্তোরাঁ
-
- অভিযোগ: সুগন্ধা পয়েন্টের প্রধান সড়ক ও সৈকত লাগোয়া খাসজমি রাতারাতি জবরদখল করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি।
- মালিকানা: জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ তালিকায় থাকা এই ২১টি অবৈধ স্থাপনার নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট ও ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী কতিপয় নেতা।
প্রশাসনের বক্তব্য:
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈকতের ইসিএ ও খাসজমি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসকল হোটেল বা রিসোর্ট পরিবেশ আইন ও নকশার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে সরকারি সম্পদ গ্রাস করেছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে ভিন্ন বাস্তবতা দেখতে পেয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈকতের ইসিএ ও খাসজমি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসকল হোটেল বা রিসোর্ট পরিবেশ আইন ও নকশার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে সরকারি সম্পদ গ্রাস করেছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে ভিন্ন বাস্তবতা দেখতে পেয়েছে।
